বাংলাদেশ রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (ক্যারেজ অ্যান্ড ওয়াগন) তাসরুজ্জামান বাবু যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল ইনোভেশন ইনস্টিটিউটের সম্মানজনক ‘গ্লোবাল ডিস্টিংগুইশড ইনোভেটর অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’ অর্জন করেছেন। একই আয়োজনে প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ রেলওয়েও পেয়েছে ‘ডিস্টিংগুইশড ইনোভেশন বাই পাবলিক সেক্টর’ পদক।
উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে কার্যকর সমাধানে রূপ দেওয়ার স্বীকৃতি হিসেবে প্রকৌশলী তাসরুজ্জামান এবং তাঁর কর্মক্ষেত্র বাংলাদেশ রেলওয়েকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। গ্লোবাল ইনোভেশন ইনস্টিটিউটের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, বিশ্বের ২৬টি দেশ থেকে জমা পড়া ১ হাজার ৪৭৬টি উদ্ভাবনী উদ্যোগ থেকে যাচাই-বাছাই শেষে ৮টি ক্যাটাগরিতে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে ১০০ জন বিজয়ী নির্বাচন করা হয়। এর মধ্যে ডিস্টিংগুইশড ইনোভেটর ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত ৩০ জন উদ্ভাবকের একজন হলেন তাসরুজ্জামান।
অন্যদিকে, ‘ডিস্টিংগুইশড ইনোভেশন বাই পাবলিক সেক্টর’ ক্যাটাগরিতে বিশ্বের ১৩টি সরকারি প্রতিষ্ঠান পদক পেয়েছে। এ তালিকায় বাংলাদেশ রেলওয়ের পাশাপাশি রয়েছে কিয়োটো ইউনিভার্সিটি, দুবাই মিউনিসিপ্যালিটি, কাতারের মিনিস্ট্রি অব ইন্টেরিয়রসহ বিভিন্ন দেশের আরও সরকারি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ থেকে ব্যক্তি পর্যায়ে তাসরুজ্জামান এবং প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রথমবারের মতো এ পদক অর্জন করল। চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে সৌদি আরবের রিয়াদে বিজয়ীদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে পদক তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।
গ্লোবাল ইনোভেশন ইনস্টিটিউট উদ্ভাবন ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন কার্যক্রম পরিচালনাকারী একটি আন্তর্জাতিক পেশাগত প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর জিডিআই অ্যাওয়ার্ডসের মাধ্যমে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জনখাতে উদ্ভাবনী অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। বিশ্বজুড়ে উদ্ভাবনচর্চায় সম্পৃক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে এ পদকটি মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে আরব বিশ্বে উদ্ভাবননীতি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হওয়ায় গালফভুক্ত দেশগুলোর সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এ পদক অর্জনের প্রতিযোগিতা বিশেষভাবে চোখে পড়ে।
বাংলাদেশ রেলওয়েতে দায়িত্ব পালনকালে স্বল্প ব্যয়ে দেশীয় প্রযুক্তি ও স্থানীয় কারিগরি দক্ষতা ব্যবহার করে একাধিক প্রকৌশলভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়নের মাধ্যমে গত বছর আলোচনায় আসেন তাসরুজ্জামান। তাঁর উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবনের মধ্যে রয়েছে রেলের ইঞ্জিন ও কোচ ঘোরানোর জন্য অটোমেটেড টার্নটেবিল, দীর্ঘস্থায়ী হুইলসেট গাইড, রেল দুর্ঘটনার পর কোচ ও লোকোমোটিভ উদ্ধারকাজে ব্যবহারের জন্য রি-রেইলিং ইকুইপমেন্টস এবং কোচের শিডিউল মেরামতে ব্যবহারের জন্য ইলেকট্রিক লিফটিং জ্যাক স্থাপন। এর বাইরে আরও কিছু প্রকৌশলভিত্তিক উন্নয়নমূলক উদ্যোগও তিনি বাস্তবায়ন করেছেন।
এসব উদ্ভাবনের ফলে আমদানিনির্ভরতা কমেছে, সরকারি ব্যয় সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে, স্থানীয় সক্ষমতা বেড়েছে এবং তুলনামূলক অনুন্নত লালমনিরহাট রেল বিভাগে কাজের পরিবেশ ও সেবার মান উন্নত হয়েছে। তাঁর উদ্ভাবিত অটোমেটেড টার্নটেবিলটি বিশেষভাবে আলোচিত। এটি দেশের একমাত্র স্বয়ংক্রিয় রেলওয়ে টার্নটেবিল, যার মাধ্যমে লালমনিরহাট রেল বিভাগের ট্রেনের ইঞ্জিন ও কোচ ঘোরানো হয়।
ব্রিটিশ আমলে নির্মিত লালমনিরহাটের টার্নটেবিলটি নব্বইয়ের দশকে অচল হয়ে যাওয়ার পর থেকে দীর্ঘদিন ওই বিভাগের ট্রেনগুলো উল্টোমুখীভাবে, অর্থাৎ লংহুডে চলাচল করত। নতুন অটোমেটেড টার্নটেবিল চালুর পর প্রায় ৩৫ বছর পর ট্রেনগুলো আবার সম্মুখবর্তী ইঞ্জিন দিয়ে, অর্থাৎ শর্টহুডে চলাচল করতে পারছে। এর ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমেছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট সময় পরপর কোচ ঘোরানোর সুযোগ তৈরি হওয়ায় কোচের চাকার ক্ষয়ও কমছে, যা সরকারি অর্থ সাশ্রয়ে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
গ্লোবাল ইনোভেশন ইনস্টিটিউটের এ পদক ছাড়াও প্রকৌশলী তাসরুজ্জামান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি পেয়েছেন। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের স্টেভি অ্যাওয়ার্ডসের দুটি আলাদা আসরে তিনি একটি গোল্ড ও দুটি সিলভার পদক অর্জন করেন। স্টেভি অ্যাওয়ার্ড ফর টেকনোলজি এক্সিলেন্সে তিনি জেনারেল মোটরস ও ফোর্ড মোটর কোম্পানির মতো ফরচুন ৫০০ প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ‘লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ ক্যাটাগরিতে গোল্ড এবং ‘বেস্ট এমপ্লয়ি অব দ্য ইয়ার’ ক্যাটাগরিতে সিলভার পদক পান।
এর আগে একই বছর এশিয়া-প্যাসিফিক স্টেভি অ্যাওয়ার্ডসে ‘মোস্ট ইনোভেটিভ টেকনোলজি লিডার অব দ্য ইয়ার’ ক্যাটাগরিতে গুগল ও অ্যামাজনের মতো প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবকদের সঙ্গে সহবিজয়ী হিসেবে সিলভার পদক অর্জন করেন তিনি। এ ছাড়া জাতিসংঘ শিল্প উন্নয়ন সংস্থা বা ইউএনআইডিও থেকে এসডিজি ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডের স্বীকৃতিসনদ পেয়েছেন। তাঁর উদ্ভাবিত অটোমেটেড টার্নটেবিলের জন্য ২০২৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেলপথ মন্ত্রণালয় তাঁকে শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবক পদকে ভূষিত করে।
মো. তাসরুজ্জামান ৩৫তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ রেলওয়েতে সহকারী যান্ত্রিক প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। এর আগে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা চাঁপাইনবাবগঞ্জে। শিক্ষাজীবনে তিনি রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক এবং ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
পরবর্তী সময়ে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নে প্রদত্ত এডিবি-জেএসপি স্কলারশিপ নিয়ে তিনি জাপানের ন্যাশনাল গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজ বা গ্রিপ্স থেকে পাবলিক পলিসিতে আরেকটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি প্রেষণে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা টেক ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডিতে অধ্যয়নরত।