১৯৯৬ সালের ২০ মে সেনাপ্রধান জেনারেল নাসিম রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। সে সময় দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসন চলছিল। প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন সাবেক বিচারপতি হাবিবুর রহমান। তার এই অভ্যুত্থান দেশ ও জাতিকে বিস্মিত করে। দেশের মানুষ ১২ জুন জাতীয় নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছিল। এমন সময়ে তার এই বিদ্রোহ দেশকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে।
প্রশ্ন হলো কেন এই বিদ্রোহ? রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস ১৮ মে নির্বাহী আদেশে মেজর জেনারেল গোলাম হেলাল মোর্শেদ, জিওসি ১১ পদাতিক ডিভিশন ও বৃগেডিয়ার জেনারেল মিরন হামিদুর রহমান, অতিরিক্ত মহাপরিচালক, বিডিআরকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠান। জেনারেল নাসিম এই আদেশ মেনে নিতে পারেননি। তিনি ১৯ মে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেন এবং এই আদেশ প্রত্যাহারের চাপ দেন। রাষ্ট্রপতি তার আদেশ প্রত্যাহার না করলে পরিণতি ভালো হবে না বলে সতর্ক করেন।
জেনারেল নাসিম ১৯৯৪ সালে সেনাপ্রধান জেনারেল নুরুদ্দীন অবসরে গেলে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পান। সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেয়ার পূর্বে তিনি ডিজিএফআই (ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স) এর মহাপরিচালক ছিলেন। গোয়েন্দা সংস্থায় কর্মরত অবস্থায় তিনি রাজনৈতিক দল এবং দেশি/বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন। গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে তার সব ক্ষেত্রে অবাধ যাতায়াত ছিল। তিনি সামরিক/বেসামরিক অসংখ্য কর্মকর্তার ফোনকল রেকর্ড করতেন। এভাবে প্রায় ১৫টি ক্যাসেট রেকর্ড করেন। তিনি সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেয়ার পরও ডিজিএফআইএর ওপর তার প্রভাব রয়ে যায়। মেজর জেনারেল ইমাম এবং পরবর্তীতে মেজর জেনারেল আব্দুল মতিন ডিজিএফআইএর মহাপরিচালক হওয়ার পর জেনারেল নাসিম এর ঘনিষ্ঠ অফিসারদের ওপর নজরদারি বাড়ায় এবং এক পর্যায়ে আওয়ামী নেতাদের সঙ্গে জেনারেল নাসিম, মেজর জেনারেল হেলাল মোর্শেদ ও আরো অনেকের সম্পৃক্ততা পেতে থাকে।
আওয়ামী লীগ ও জামায়াত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে মিলিতভাবে করা আন্দোলনে দেশে এক অরাজকতা সৃষ্টি করে। তারা পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ করে বিএনপি সরকারের পাচ বছর মেয়াদের মধ্যে ১৭৩ দিন হরতাল ডাকে। মাঝে মাঝে সপ্তাহজুড়ে হরতাল ও অবরোধের ডাক দিতে থাকে। বিএনপি এক পর্যায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রস্তাবনা মেনে নিয়ে ১৫ ফেব্রুয়ারি ইলেকশন দিয়ে সরকার গঠন করে। ১৫ ফেব্রুয়ারি ইলেকশনের দিন আওয়ামী লীগ সারা দেশে নৃশংসতা চালিয়ে ১৯ জনকে পিটিয়ে হত্যা করে। তাদের স্লোগান ছিল ‘ভোট দিতে যাবে যারা লাশ হয়ে ফিরবে তারা।’ তাদের এই আচরণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক শিষ্টাচারে নতুন নৃশংসতার জন্ম দেয়। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি জুন মাসের মাঝামাঝি ইলেকশন আয়োজনের ব্যবস্থা রেখে মার্চের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্ল্যান নিয়ে এগোতে থাকে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ মারমুখী আন্দোলন ও অসহযোগিতার পরেও আওয়ামী লীগের কাছে তথ্য ছিল যে তারা ইলেকশনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। তাদের ও বিএনপির প্রাপ্ত আসন সংখ্যা খুব কাছাকাছি হবে এবং একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
জেনারেল নাসিমের তৎপরতা শুরু
জেনারেল নাসিম ও তার সংশ্লিষ্টরা পরিস্থিতি পাল্টানোর জন্য অস্থির হয়ে ওঠে। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস প্যারেডকে টার্গেট করে এগোতে থাকে। তার টার্গেট ছিল ২৬ মার্চ রাতে বিদ্রোহ ঘোষণা করে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে নিয়ে আওয়ামী লীগের জন্য একতরফা ইলেকশনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবেন। সে সময় ব্যর্থ হলেও বিদেশি প্রভুদের সহায়তায় মইন ইউ আহমেদকে দিয়ে ১/১১ এর সরকার গঠন করে ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ এর ইলেকশনে আওয়ামী লীগ তা করে নিতে সমর্থ হয়। ২৫ মার্চ সকালের মধ্যে ডিজিএফআই জেনারেল নাসিমের সম্পূর্ণ প্ল্যান জেনে ফেলে। ডিজি, ডিজিএফআই মেজর জেনারেল আব্দুল মতিন প্রধান মন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে অফিসে দেখা করে জেনারেল নাসিমের প্ল্যান তাকে জানান। প্রধান মন্ত্রী ডক্টর খন্দকার মোশাররফসহ কয়েকজন সিনিয়র নেতাকে তেজগাঁও অফিসে ডেকে পাঠান। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় পার্লামেন্ট অধিবেশন ডাকা হয় এবং ওই রাতেই তত্ত্বাবধায়ক বিল পাস করার সিদ্ধান্ত হয়। সারারাত পার্লামেন্ট চলে এবং গভীর রাতে বিলটি পাস হয়। ২৬ মার্চ যথারীতি মেজর জেনারেল ইমামের নেতৃত্বে স্বাধীনতা দিবসের প্যারেড সম্পূর্ণ হয়। প্যারেডের দিন জেনারেল নাসিমকে অত্যন্ত বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। তার অভ্যুত্থান প্ল্যান ভেস্তে যায়। ৩০ মার্চ খালেদা জিয়া পার্লামেন্ট ভেঙে দেন এবং ৩১ মার্চ বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। ডিজিএফআইএর গোয়েন্দা তৎপরতা এবং খালেদা জিয়ার বিচক্ষণ ও সাহসী পদক্ষেপ দেশকে জেনারেল নাসিমের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করে। এত কিছুর পরও জেনারেল নাসিম ও তার আওয়ামী দোসরদের তৎপরতা অব্যাহত থাকে। যার প্রকাশ ঘটে ২০ মে এর বিদ্রোহ দিয়ে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ডিজিএফআইএর সারা দেশের তৎপরতা আরো বাড়ানো হয়। জেনারেল নাসিমের ঘনিষ্ঠ অফিসারদের কঠোর পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখা হয়। ১২ জুন জাতীয় ইলেকশনের আগে আরো একটি অভ্যুত্থানের চেষ্টা হতে পারে এমন তথ্য ও আলামত ডিজিএফআইএর হাতে আসতে থাকে। জেনারেল নাসিমের পক্ষে মেজর জেনারেল হেলাল মোর্শেদ আওয়ামী নেতা ক্যাপ্টেন তাজুল ইসলাম (অব.), আমীর হোসেন আমু ও আরো অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে দেন। তিনি প্রায় প্রতি সপ্তাহে বগুড়া হতে ঢাকায় এসে আওয়ামী নেতাদের সঙ্গে বসতে থাকেন। এর মধ্যে মেজর জেনারেল হেলাল মোর্শেদ ও বৃঃ জেনারেল মিরন হামিদকে বাধ্যতামূলক অবসর হতে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করাতে ব্যর্থ হলে জেনারেল নাসিম ১৯ মে রাতে মেজর জেনারেল মতিন, ডিজি, ডিজিএফআই ও মেজর জেনারেল সুবিদ আলী ভূঁইয়া (পিএসও, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ)-কে সেনাবাহিনীতে প্রত্যাবর্তন পরবর্তী লগ এরিয়া, ঢাকা সেনানিবাসে সংযুক্তির আদেশ জারি করেন। তার এই আদেশটি ছিল অবৈধ। কারণ তিনি সরকারি প্রজ্ঞাপন ছাড়া তাদের সেনাবাহিনীতে ফেরত আনতে পারেন না। মেজর জেনারেল মতিন ওই রাতেই সব পরিচালক ও কয়েকজন অফিসারকে ডিজিএফআই সদর দফতর, ৩২, ক্যান্টনমেন্ট বাজার, ঢাকা সেনানিবাসে ডেকে পাঠান। তখন রাত ১টা ৩০ মিনিট। আমিও সেখানে ডাক পেলাম। আমি সে সময়ে একটি বুরোর জি-এসও-২ (কর্ড) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। আমাদের কাছে তথ্য ছিল সকাল হলে মেজর জেনারেল মতিন ও সুবিদ আলী ভুঁইয়াকে গ্রেফতার করা হবে।
নাসিমের প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ
আমরা রাতের ভেতর অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র বের করে অফিসের সব গেট সিল করে বিভিন্ন ভবনের ছাদে অস্ত্রসহ পাহারা বসালাম। মেজর জেনারেল মতিন ও সুবিদ আলীকে সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে সেনানিবাস থেকে বের করে সরাসরি বঙ্গভবনে নিয়ে যায়। এ কাজে দুটি কার ও একটি জীপ ব্যবহার করি। আমরা শহিদ জাহাঙ্গীর গেটে বাধার আশঙ্কা করছিলাম। যাহোক সেখানে কোনো বাধা পাইনি। পরে শোনা যায় সকাল ৮টার সময় শহিদ জাহাঙ্গীর গেট সিল করে সব চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। সকাল ৮টা ৩০ মিনিটের মধ্যে বঙ্গভবনে পৌছে যাই। নয়টার সময় রাষ্ট্রপতি, মেজর জেনারেল মতিন, মেজর জেনারেল সুবিদ আলী ও সামরিক সচিব মেজর জেনারেল রুহুল আলমকে অফিসে ডেকে পাঠান। তারা দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করেন। রাষ্ট্রপতি প্রধান উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধান এবং প্রতিরক্ষা সচিবকে বঙ্গভবনে ডেকে তাদের পরামর্শ চান। নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধান এবং প্রতিরক্ষা সচিব জেনারেল নাসিমকে বরখাস্ত করে নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগের পরামর্শ দেন। প্রধান উপদেষ্টা পুরো বিষয়টি রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের বিষয় মন্তব্য করে কোনো পরামর্শ ছাড়াই দ্রুত বৈঠক শেষ করে চলে যান।
মেজর জেনারেল হেলাল মোর্শেদ, জিওসি ১১ পদাতিক ডিভিশন, বগুড়া, মেজর জেনারেল আয়েনউদ্দিন, জিওসি ১৯ পদাতিক ডিভিশন, ঘাটাইল ও মেজর জেনারেল ইব্রাহিম, জিওসি ৫৫ পদাতিক ডিভিশন, যশোর জেনারেল নাসিমকে সমর্থন দেন। মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান, নবম পদাতিক ডিভিশন, সাভার রাষ্ট্রপতির পক্ষে থাকেন। ঢাকা ও মিরপুর সেনানিবাসের সব বৃগ্রেড ও অন্যান্য ইউনিটসমূহ রাষ্ট্রপতিকে সমর্থন জানাই। শুধুমাত্র লে. কর্নেল আনিসের নেতৃত্বে ৩০ ই বেঙ্গল জেনারেল নাসিমকে সমর্থন দেন। জেনারেল নাসিম ডিজিএফআইএর ডিজি থাকাকালীন লে. কর্নেল আনিস তার পিএস ছিলেন। আমাদের কাছে ১১ ও ১৯ পদাতিক ডিভিশনের ঢাকা অভিমুখী আগমনের খবর আসতে থাকে। মেজর জেনারেল ইমাম জেনারেল নাসিমকে বরখাস্ত করে রাষ্ট্রপতিকে নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগের পরামর্শ দেন। জেনারেল নাসিম বারবার মেজর জেনারেল ইমামকে ফোন দিয়ে সমর্থন চান।
নাসিমের দ্বিতীয় চেষ্টা ব্যর্থ
মেজর জেনারেল ইমাম তাকে এড়িয়ে চলেন। রাষ্ট্রপতি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে থাকেন। বেলা ১টা ৩০ মিনিটের দিকে অভ্যুত্থান চলাকালীন জেনারেল নাসিমের সঙ্গে আওয়ামী নেতা ক্যাপ্টেন তাজুল (অব.) এর কথোপকথনের একটি রেকর্ড রাষ্ট্রপতিকে শোনানো হয়। জেনারেল নাসিমকে রাষ্ট্রপতিকে গালি দিয়ে হত্যা ও উৎখাত করার কথা বলতে শোনা যায়। জেনারেল নাসিম আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ও তাকে সমর্থন জানিয়ে মিছিল বের করতে বলেন। এক পর্যায়ে তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি এনামুল হক শামীমকে কর্মীদের নিয়ে রমনা ও বঙ্গভবনের আশপাশে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে স্লোগানসহ মিছিল করতে দেখা যায়। অনেক বোঝানোর পরে দুপুর আড়াইটার দিকে রাষ্ট্রপতি জেনারেল নাসিমকে বরখাস্ত করে তৎকালীন সিজিএস মেজর জেনারেল মাহবুবকে সেনাপ্রধান নিয়োগের সিদ্ধান্ত দেন। বিষয়টি মেজর জেনারেল ইমামকে জানানো হয় এবং তাকে এক স্কোয়াড্রন ট্যাংক বঙ্গভবনের সুরক্ষায় পাঠানোর জন্য বলা হয়। জেনারেল নাসিম সেনা সদরে অফিসারদের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়ে তাকে সমর্থনের অনুরোধ করেন। অফিসাররা তার বিদ্রোহের কারণকে মেনে নেয় না এবং তাকে সমর্থন দেয় না। তিনি সামরিক অপারেশন পরিদফতরের গৃড-১ স্টাফ লে. কর্নেল ইশতিয়াককে সব ফরমেশনকে ঢাকার উদ্দেশ্যে আগমনের সিগনাল দিতে বলেন। লেফটেনান্ট কর্নেল ইশতিয়াক বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে দেরি করতে থাকেন। মেজর জেনারেল মাহবুবকে সেনাপ্রধান নিয়োগের বিষয়টি ডিজিএফআইয়ের মাধ্যমে জানানো হলে তিনি সম্মিলিত সামরিক হসপিটাল ঢাকা সেনানিবাসে জেনারেল নূরুদ্দীনকে দেখতে যাওয়ার কথা বলে সেনাসদর হতে বের হয়ে ১৪ স্বতন্ত্র ইঞ্জিনিয়ার্স বৃগেডে আসেন এবং সেখান হতে বৃগেড জেনারেল আব্দুর রহিমের সহযোগিতায় সেনাবাহিনীর সব ফরমেশনের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে বিদ্রোহ দমনে ভূমিকা রাখেন। বেলা ৩টার দিকে জাতির উদ্দেশে রাষ্ট্রপতির ভাষণ রেকর্ড করে টিভি ও রেডিওতে প্রচার করা হয়।
নাসিমের সব চেষ্টা ব্যর্থ
সাভার সেনানিবাস থেকে ৯ আর্টিলারি বৃগেড, ৭১ ও ৮১ পদাতিক বৃগেডসমূহকে ঢাকার টিভি ও রেডিও স্টেশন, আরিচা ফেরিঘাট, জয়দেবপুর চৌরাস্তাসহ বিভিন্ন পয়েন্টে ব্লক দিতে পাঠানো হয়। তাদের কাজ ছিল রেডিও ও টেলিভিশন কেন্দ্র দখলে রাখা এবং ১১, ১৯ ও ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের ঢাকা আগমনকে রুখে দেয়া। নরসিংদী ও জাজিরা থেকে সব ফেরিকে দ্রুত আরিচা ও মাওয়া ফেরিঘাটে ফেরত আনা হয়। এ সব ব্যবস্থায় জেনারেল নাসিম ধীরে ধীরে হতাশ ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তাকে নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধান আত্মসমর্পণের পরামর্শ দেন। তিনি বিকাল অবধি জেদ করে তার অফিসে অবস্থান করতে থাকেন। তাকে বোঝানোর জন্য তার স্ত্রী ও সন্তানদের অফিসে পাঠানো হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি আত্মসমর্পণ করেন এবং তাকে লে. কর্নেল ওয়াসীমের নেতৃত্বে গার্ড দিয়ে অফিস হতে নিয়ে সেনাসদর অফিসার মেসের ভিআইপি আবাসনে আন্তরীণ রাখা হয়। বিকাল আনুমানিক পাচটার দিকে মেজর মোর্শেদের নেতৃত্বে এক স্কোয়াড্রন ট্যাংক বঙ্গভবন ঘিরে ফেলে। আমরা মেজর মোর্শেদ ও তার সঙ্গে আসা মেজর সামসুদ্দীনকে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। রাষ্ট্রপতি তার নিরাপত্তার ব্যাপারে আশ্বস্ত হন এবং সকলকে ধন্যবাদ জানান। ১১, ১৯ ও ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের জিওসিদের তাদের নিজ নিজ ডিভিশনে নতুন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল মাহবুবের আদেশে গৃহান্তরীন করা হয়। ১১ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল হেলাল মোর্শেদ অভ্যুত্থান জুড়ে অত্যন্ত আগ্রাসী ছিলেন। তাকে গ্রেফতার করে বগুড়া সেনানিবাসের অফিসার মেসে গার্ড দিয়ে রাখা হয়। এ কাজে নেতৃত্ব দেন বৃগেডিয়ার জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল)। সেনানিবাস থেকে বের হওয়া সৈন্যরা নিজ নিজ সেনানিবাসে ফেরত যেতে শুরু করে।
আব্দুল মতিনের পরিকল্পনায় কু ব্যর্থ
মেজর জেনারেল আব্দুল মতিনের নেতৃত্বে ডিজিএফআইয়ের সঠিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জেনারেল নাসিমের সব প্ল্যান ব্যর্থ করে রক্তপাত ছাড়াই অভ্যুত্থানকে ব্যর্থ করে দেয়া হয়। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। তখন ইলেকট্রনিক, পৃন্ট ও সোশাল মিডিয়া এত শক্তিশালী ছিল না। এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে সে সময় শফিক রেহমান সম্পাদিত জনপ্রিয় সাপ্তাহিক যায়যায়দিনের একটি কভার স্টোরি প্রকাশ করা হয়েছিল। সাংবাদিক আবদাল আহমেদ (বর্তমানে প্রধান তথ্য কর্মকর্তা), সাংবাদিক লে. আবু রুশদ (অব.) এবং আরো অনেকে ডিজিএফআই হতে ক্যাসেটগুলো সংগ্রহ করে কয়েক হাজার কপি করে জীবনের ঝুকি নিয়ে দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দেন এবং দেশের মানুষ আওয়ামী লীগ ও জেনারেল নাসিমের ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পারে।
সেনা কু-এর সঙ্গে আওয়ামী সম্পৃক্ততা
আওয়ামী কুচক্রী ও তাদের দোসররা ২০ মের অভ্যুত্থানে ব্যর্থ হলেও ১২ জুন পার্লামেন্ট ইলেকশন পরবর্তী জাতীয় পার্টির সমর্থনে সরকার গঠনের পর এই রাষ্ট্রদ্রোহীদের বিচার হতে দেয় না। মেজর জেনারেল মতিন, ১৯ পদাতিক ডিভিশনের নেতৃত্বে একটি তদন্ত বোর্ড হয় এবং সেই তদন্ত বোর্ড রাষ্ট্রদ্রোহীদের যে শাস্তির সুপারিশ করে তা আওয়ামী সরকার বাস্তবায়ন না করে তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়। ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেনও হয়েছিল আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্রের। পরবর্তীতে ১৬ বছরের আওয়ামী দুঃশাসনের সময় তাদের অনেককে রাষ্ট্রীয় পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। লাখো প্রাণের বিনিময়ে আমাদের অর্জিত স্বাধীনতাকে যারা বিদেশি প্রভুদের হাতে তুলে দিতে চায় ওরা দেশ ও জাতির শত্রু। এদের কখনো ক্ষমা করতে নেই।
লেখক-

লে. কর্নেল মো. সামসুজ্জামান খান, পিএসসি, জি+ (অব.) : রাজনীতিবিদ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।