অধ্যাপক ডা. নিজামউদ্দিন আহমেদ। মূলত তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে প্যালিয়েটিভ কেয়ার বা প্রশমন সেবা। আজ ১৯ মে তাঁর জন্মদিন। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন ছাত্র ও অনুজ চিকিৎসক আতাউর রহমান।
১.
নির্দিষ্ট তারিখ মনে নেই, তবে ২০১২ সালের কোনো একটা দিন তা মনে আছে।
প্রতিদিনকার মতো সকালে পত্রিকাটা হাতে নিয়েছি। বিশদে পরে পড়ব, এখন কেবল একটু চোখ বুলিয়ে নিয়ে কাজে বেরিয়ে পড়ব; কিন্তু ঠিক প্রথম পৃষ্ঠার একটা শিরোনামে দৃষ্টি আটকে গেল। শিরোনামটি কৌতূহল-জাগানিয়া। বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিকের বেশ বড়সড় সেই প্রতিবেদনের সারকথা—‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বর্তমানে বিএমইউ) চিকিৎসকরা নির্ধারিত সময়ে হাসপাতালে আসেন না।’
সাংবাদিক এক এক করে বিশ্ববিদ্যালয়ের একেকটা বিভাগে যাচ্ছেন, অতঃপর সেই বিভাগের অধ্যাপক কিংবা শীর্ষ পদাসীন চিকিৎসকের খোঁজ করছেন এবং যাঁদের রুমে পাচ্ছেন না—তাঁদের ফোন করছেন। অপর প্রান্ত থেকে প্রায় সবাই নিজে থেকেই ব্যাখ্যা দিতে শুরু করেছেন—কার কেন কী কারণে দেরি হচ্ছে বা হয় হাসপাতালে আসতে।
সে কী ব্যাখ্যা একেকটা!
দেশের একমাত্র মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জাঁদরেল সব শিক্ষক আর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক—শ্রেণিকক্ষে কি নিজের চেম্বারে কত শত ছাত্র আর রোগীদের নমস্য তাঁরা, কিন্তু সাংবাদিকের প্রশ্নের মুখে এ কী বেহাল দশা একেকজনের! অফিস সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে না এসে অন্য আরেকটি বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করার কথা স্বীকার করে একজন অধ্যাপক তো এমনও বললেন যে, ‘আর এরকম হবে না!’
ততক্ষণে আমি বেশ উসখুস্ করতে শুরু করেছি, কারণ চিকিৎসাবিদ্যায় একটা সার্টিফিকেট আছে বলে এসব পড়ে অপমানিত বোধ করব নাকি আমপাঠক হিসেবে আমোদিত হবো—ঠিক বুঝে উঠতে পারি না।
যা-হোক, পড়তে পড়তে কেন যেন হঠাৎই মনে হলো, আচ্ছা এই সাংবাদিক সাহেব যদি ‘অমুক’ অধ্যাপক মহোদয়কে তাঁর রুমে খুঁজে না পান, তাহলে তাঁকেও তো নিশ্চয়ই ফোন করবেন—তিনিও কি অন্যদের মতো এমন মিইয়ে পড়বেন? ভেবে শঙ্কিত বোধ করতে শুরু করলাম।
অবশেষে দেখতে পাই তাঁর নামটিও আছে! নির্দিষ্ট কক্ষে না পেয়ে সাংবাদিক যথারীতি তাঁকেও ফোন করেছিলেন। জানতে চাওয়া হলো তাঁর হদিশ কিংবা বিলম্বের কারণ।
উত্তরে তিনি যে বাক্যটি বলেছিলেন আজো স্পষ্ট আমার চোখে ভাসে—‘আপনাকে বিলম্বের কৈফিয়ৎ দিতে আমি বাধ্য নই।’
আহ! তাঁর জবাবে যতটা না পুলকিত হই, তার চেয়ে বেশি আশ্বস্ত হই তাঁর সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণটি সঠিক হওয়ায়—যাক্ ভুল চিনি নি তাহলে!
এলিয়ে পড়া এই কর্তাভজা সমাজে নেতিয়ে পড়া অগণন লোকের ভীড়ে এমন শিরদাঁড়াযুক্ত দু-চারজন মানুষ কদাচিৎ চোখে পড়ে। কড়ে আঙুলে গোণা যায়। আত্মসম্মানবোধ বলে যে একটা জিনিস থাকা দরকার মানবচরিত্রে, এঁদের দেখে তা পুনরায় স্মরণে আসে।
কথাগুলো যাঁকে নিয়ে বলছি, এই লেখার শিরোনাম আর ছবিখানা দেখে পাঠকের ইতোমধ্যে বোঝা সারা—তিনি সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নিজামউদ্দিন আহমেদ। বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্যালিয়েটিভ কেয়ার সূচনার পুরোধা—এই পরিচয়ে ভাবীকাল তাঁকে জানবে বলে আমার স্থির বিশ্বাস।
(উল্লেখ করা প্রয়োজন, স্যার কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদিন সময়মতোই যেতেন। ‘সেন্টার ফর প্যালিয়েটিভ কেয়ার’ তখনো পূর্ণাঙ্গ বিভাগ হিসেবে স্বীকৃতি পায় নি, ওটা ছিল সে-সময় অ্যানেসথেশিয়া ডিপার্টমেন্টের অধীনে। হাজিরা খাতায় সই করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে তিনি প্রথমেই যেতেন ওই বিভাগে। কখনো-বা ক্লাসও নিতেন ওখানে। সেদিনও এমন কোনো কারণেই সাংবাদিক তাঁর খোঁজ পান নি।)

ফ্রেন্ড ফিলোসফার এন্ড গাইড ডা. সুরেশ কুমারের সাথে, কেরালার আইপিএম (ইনস্টিটিউট অব প্যালিয়েটিভ মেডিসিন)-এ কোনো এক অন্তরঙ্গ মুহূর্তে। দক্ষিণ ভারতে কমিউনিটি বেইজড প্যালিয়েটিভ কেয়ারের অগ্রপথিক বলে খ্যাত এই মানুষটির কাছেই অধ্যাপক ডা. নিজামউদ্দিনের প্যালিয়েটিভ কেয়ারে হাতেখড়ি।
২.
১৯ বছর আগের কোনো একদিন। ইন্টার্নশিপ শেষ করে আমি সংকল্প করি ‘থাকব না কো বদ্ধ ঘরে ...’। অতএব, ক-মাস পরেই এমবিবিএস-এর টাটকা সার্টিফিকেটখানা বগলদাবা করে এক বৃষ্টিমুখর দিনে চট্টগ্রাম থেকে মহানগর গোধূলি ট্রেনে চেপে বসি ঢাকার উদ্দেশ্যে। উচ্চশিক্ষার্থে লোকে ইউরোপ-আমেরিকা যায়। ততটা আমার সাহসে (এবং বিদ্যায়) কুলায় না। তাতে কী? ‘এলেম নতুন দেশে’ বৎ মুগ্ধতায় চারপাশে সবিস্ময়ে তাকাই এবং উচ্চশিক্ষা বাদে আর যা কিছু আছে স্বভাববশে সে-সবে ব্যস্ত হয়ে পড়ি যথারীতি।
এর মধ্যেই মাসখানেক পরে একদিন নাম লেখাই বারডেম হাসপাতালের কোনো একটা কোর্সে। সম্ভবত বেসিক লাইফ সাপোর্ট বা তেমন কিছু একটা। তিনদিনের কোর্স। ক্লাস নিচ্ছিলেন বারডেম আইসিইউ-এর সে-সময়কার প্রধান এবং একই হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকবৃন্দ। তৃতীয় অর্থাৎ শেষ দিনে বাইরে থেকে এলেন একজন অতিথি-শিক্ষক, তবে এই কদিন যাঁরা পড়িয়েছেন পোশাক-পরিচ্ছদে তাঁদের মতো কেতাদুরস্ত তিনি মোটেও নন, ছাইরঙা প্যান্টের ওপর না-গোঁজা একটা সাদা হাফ শার্ট আর পায়ে সাধারণ জুতো—এই ছিল তার পরনে তা এখনো আমার মনে আছে।
কিন্তু ভদ্রলোককে আমার ভালো লেগে গেল। কারণটা তাঁর সৌম্যদর্শন চেহারা বা নান্দনিক উপস্থাপন-দক্ষতা নয়, বরং অপাঠ্য (!) বহু বিষয় নিয়ে তাঁর বাৎচিত। ঘণ্টাখানেকের সেই ক্লাসে বিচিত্র প্রসঙ্গের সূত্র ধরে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা, চিকিৎসক সমাজ এবং আরো কিছু বিষয়ে ‘অ্রপ্রয়োজনীয়’ অনেক কথা তিনি বললেন। আগের দুটো দিনে বিস্তর প্রয়োজনীয় এবং ওজনদার সব আলাপ-সালাপে আমার মন আর মাথা দুটোই ভারী হয়ে উঠেছিল।
সিঙ্গারা-সমুচা কি পুলি-পাটিসাপ্টা পিঠা, স্বাদ তো লাগে আদতে তার ভেতরের ঝাল নয়তো সুমিষ্ট পুরটুকুর জন্য, বাইরের আবরণটা যদিও খুবই দরকারি ভেতরের বস্তুটাকে নিরাপদে ধরে আর মুড়ে রাখার জন্য—কিন্তু খেতে কি ওটা তত স্বাদের? আমারও তখন একই দশা, দুদিনের খটোমটো সব আলোচনায় হাঁপিয়ে উঠেছি, অতঃপর এই অধ্যাপকের কথাবার্তা আমাকে নাটোরের বনলতা সেনের মতো দু-দণ্ড শান্তি দিলো।
ক্লাসে সেদিন সবাই তাঁকে নানান প্রশ্ন করল, প্রশ্নোত্তর-আলোচনায় প্রত্যেকেই সাড়া দিলো—একমাত্র আমি বাদে। আমি কেবল শুনলাম। আর দেখলাম।
এবং বুঝলাম, লোকটার ঘটে (‘পেটে’ বলতে পারলে আরাম পেতাম, কিন্তু তাঁর সাথে আমার বয়সের পার্থক্যহেতু শব্দটা লিখতে সংকোচ হচ্ছে) বিদ্যার অধিক আরেকটা জিনিস অতিরিক্ত আছে, তার নাম ‘দর্শন’।
সে-ই আমার প্রথম নিজামউদ্দিন স্যারকে দেখা। পরিচয় এবং গভীর জানাশোনা তারও বহু পরে। সে-সবও কম কাকতালীয় আর মজার ঘটনা নয়।
৩.
গত দেড় যুগে ক্রমান্বয়ে ঘনিষ্টতা আর বিচিত্র প্রসঙ্গে গল্প-আলোচনার সুযোগে স্যারের সাথে বহু সময় কেটেছে আমার। একান্ত আর অন্তরঙ্গ সে-সব আলাপে তাঁকে নানাভাবে চিনেছি।
স্যার গল্প করতে ভালোবাসেন। এবং পারেনও কাজটা। কথা তো বহু লোকেই বলে, কিন্তু হৃদয়ের লেনাদেনা কজনের সাথেই-বা ঘটে। তাঁর মতো এমন আড্ডাপ্রিয় আর আমুদে মানুষ আমি কমই দেখেছি। এই সত্তরোর্ধ্ব বয়সে আজো তিনি এক্ষেত্রে সমান উৎসাহী। জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে দারুণ কৌতূহলী।
মানবসভ্যতার ইতিহাস কিংবা ডিকলোনাইজেশন থেকে শুরু করে সদ্য শোনা একটা ভালো গান নয়তো কবিতা-বই নিয়ে স্যারের সাথে দীর্ঘ আড্ডা দেয়া যায়। মন খুলে কথা বলা যায়।
স্যার এমন একটা মানুষ, যাঁর সাথে প্রায় সব বিষয়ে কথা বলতে পারি। আমি নই কেবল, তাঁর আশেপাশের অনেকের বেলাতেই কথাটা সত্য—সেই দলে তাঁর হাঁটু এমনকি গোড়ালির বয়সী ছাত্র-শুভার্থী থেকে তাঁর নিজের শিক্ষকদেরও কেউ কেউ আছেন।
তবে নিজেকে মেলেখুলে কথা তিনি বলেন খুব নির্দিষ্ট কিছু মানুষের সঙ্গে। এ-ছাড়া তিনি মগ্ন শ্রোতা। চুপচাপ শোনেন। আবার অনেকের সামনে কথা যখন বলেন, খুব অল্প কথায় গুছিয়ে নিজের বক্তব্যটা তুলে ধরতে পারেন অনায়াস দক্ষতায়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন একাধিক ঘটনার আমি প্রত্যক্ষ সাক্ষী।
এই তো সেদিনের ঘটনা—সদ্য প্রকাশিত একটা বইয়ের প্রকাশনা উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গেলাম স্যার আর আমি। বছর দশেক আগে মূল ভাষায় বইটা পড়ে তাঁর ভালো লেগেছিল বলে তিনি এর ওপর অনুবাদক ও অন্যদের কথা শুনতে আগ্রহী তিনি।
অনুষ্ঠান শুরুর আগে বিজ্ঞ সঞ্চালক নিতান্তই ঘটনাচক্রে স্যারের সাথে পরিচিত হলেন। দূর থেকে দুজনের সেই মিনিট কয়েকের আলাপ দেখেই আমার ধারণা হলো, স্যারকে নিশ্চয়ই তিনি মঞ্চে ডাকবেন। এবং এক পর্যায়ে ডাকলেনও।
বইটা নিয়ে কথা বললেন সেদিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত দেশের একাধিক মান্যজন। কেউ মন মাতালেন, কেউ আনন্দ যোগালেন, কেউ বেশুমার হাসালেন, কেউ বললেন প্রকাণ্ড সব জ্ঞানের কথা। সবাই ভালো বললেন, সন্দেহ নেই; কিন্তু মাত্র দুই থেকে তিন মিনিটে সবচেয়ে দার্শনিক আলাপটা করলেন স্যার। সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর। বইয়ের একটি বাক্য, যা তাঁর মাথায় গেঁথেছিল, তা বলে তিনি কথা শুরু করলেন (ওই একটি মাত্র বাক্য দিয়েই বইটার ওজন-উচ্চতার প্রমাণ মেলে) এবং মাত্র দুই থেকে তিন মিনিটে অনিত্য মানবজীবনের বহু দিক ছুঁয়ে গেলেন। শুরু করলেন আলোচ্য বইটি দিয়ে, শেষ করলেন প্যালিয়েটিভ কেয়ারে। নাড়া দিয়ে গেলেন হলভর্তি শ্রোতাদের ভাবনারাজ্যে।
স্যারকে চমকে দিয়ে যখন তাঁকে আহ্বান জানানো হলো, প্রায় সবাই তখন এদিক-ওদিক দেখছে—নাম ঘোষণা করা হলো লোকটা কে। আলোচক তালিকায় কিংবা সাহিত্য পরিমণ্ডলে তো এই নামে কেউ আছে বলে জানা নেই! কিন্তু তিনি যখন কথা বলছিলেন সবাই শুনছিলেন আক্ষরিক অর্থেই পিনপতন নীরবতায়। অনুষ্ঠান শেষ হতেই একে একে অনেকেই এলেন নিজেদের ভালো লাগার কথা জানাতে। কেউ-বা চাইলেন তাঁর ভিজিটিং কার্ড।
অনুষ্ঠান সঞ্চালকের ভূমিকায় যিনি সেদিন ছিলেন তিনি সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা সংস্থাটির মূল ব্যাক্তি, এবং নিজে একজন দুঁদে সম্পাদক বলে খ্যাত, স্যারের বক্তব্য শেষ হতেই তাঁকে উদ্দেশ করে তিনি মাইকে ঘোষণা করলেন—‘লোকে আগে বই লিখে তারপর প্রকাশক খোঁজে, আপনি বই লেখার আগেই প্রকাশক হাজির। আপনি লিখুন, আপনার বই আমরা ছাপব।’
কথাটা যিনি বললেন, তাঁর কাছে পাণ্ডুলিপি পাঠিয়ে লোকে কয়েক বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করে—যদি তাঁর মনঃপুত হয় এবং তিনি ছাপেন।
৪.
কতই তো মানুষ দেখি চারপাশে, অধিকাংশই বাঁচেন নিজের জন্যে—আরেকটু বৈষয়িক সমৃদ্ধি নয়তো প্রতিষ্ঠা কিংবা খ্যাতি কি সুনাম। এর মধ্যেও দু-চারজন ‘বেমানান’ মানুষ চোখে পড়ে সংসারে, যারা নিজেদের গোটা জীবন না হলেও জীবনের কোনো না কোনো কালপর্বে বেঁচে থাকেন কেবলই অন্যের জন্যে।
বিএমইউ-তে স্যারের অধ্যাপনাকালীন শেষ কয়েকটা বছর থেকে তাকে আমি মোটামুটি জানি। সেই থেকে এবং এখনকার সময়টা স্যার অনেকটাই বেঁচে আছেন পরার্থে। কাজ করে চলেছেন বর্তমান ও ভবিষ্যতের চেনা-অচেনা অগণিত মানুষকে একটা শান্তিপ্রদ, আরামদায়ক ও ভোগান্তিশূন্য মৃত্যুর ব্যবস্থা করার লক্ষ্যে।
দেখে ভালো লাগে, জীবনের সবকিছু সাথে নিয়েও তাঁর ইদানীংকার প্রায় সমস্ত ভাবনা, কাজ এবং বস্তুত গোটা জীবনটাই এ লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে—এর জন্যে দরকারি অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, লোকবল তৈরি এবং জনমানসে এই চেতনার বিস্তার।
কাজটা তিনি করছেন একরকম সর্বস্ব দিয়েই বলা যায়। অকাতরে দিয়ে চলেছেন সময়, শ্রম, অর্থ এবং নিজের সবটুকু মনোযোগ। অথচ তার সুযোগ ছিল এ-সময়ে দেশের একজন জেষ্ঠ্য অবেদনবিদ হিসেবে প্রচুর উপার্জনের। শুধু কোনো কর্পোরেট হাসপাতালের আইসিইউ-তে কনসালটেন্সি করলেই তো মাসে তাঁর কয়েক লক্ষ টাকা অর্থাগম হতো।
কিন্তু তিনি হাঁটলেন ঠিক একশ আশি ডিগ্রি উল্টো পথে। একাকী, প্রিয়জনবিচ্ছিন্ন, যান্ত্রিক মৃত্যুর বদলে তিনি তার জীবনের সবচেয়ে অভিজ্ঞতাঋদ্ধ ও পরিপক্ক সময়টা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন এমন একটা ব্যবস্থার প্রবর্তনে, যা প্রশান্তিময় এবং একটা মমতাবেষ্টিত মৃত্যুর নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম।
অতিধনী তিনি নন, তেমন অভিলাষও কখনো তার ছিল বলে জানি না, এমন নয় যে অঢেল অর্থ তার পকেটে কিংবা ব্যাংক একাউন্টে দূর ভবিষ্যতের জন্যে মজুত, কিন্তু অবসরোত্তর ভাতা বাবদে প্রাপ্ত অর্থের অনেকটাই তিনি ব্যয় করেছেন ঢাকার বছিলায় একটা সুপরিসর জমি কেনায়। অতঃপর অনাড়ম্বরে এবং একাধিক টিভি-ক্যামেরা আর বিস্তর হাততালি যোগে আয়োজিত কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন ছাড়াই ওটা তিনি দান করে দিয়েছেন পিসিএসবি-কে (প্যালিয়েটিভ কেয়ার সোসাইটি অব বাংলাদেশ)।
তাঁর স্বপ্ন—ওখানেই গড়ে উঠবে আইপিসিবি (ইনস্টিটিউট অব প্যালিয়েটিভ কেয়ার বাংলাদেশ), যেখানে চিকিৎসা পাবেন নিরাময়-সম্ভাবনাহীন রোগে আক্রান্ত মানুষ, সেইসাথে এখানে প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে এ-কাজে প্রয়োজনীয় দক্ষ চিকিৎসক, নার্স এবং স্বেচ্ছাসেবী।
শুধু একটাই তাঁর শর্ত—রোগীরা ওখানে চিকিৎসা পাবেন সম্পূর্ণ নিখরচায়। এবং বিত্তভেদে চিকিৎসার মানে কোনো তারতম্য করা যাবে না।
৫.
স্যার মনস্তত্ত্ব খুব ভালো বোঝেন।
নিজের চারপাশের মানুষগুলোকে মোটাদাগে তিনি খোলা বইয়ের মতো পড়তে পারেন বলে আমার ধারণা। একজন মানুষকে দেখে তার সম্বন্ধে যে বুঝতে পারছেন, সেটা আবার তাকে বুঝতে দেন না। কিন্তু এ নিয়ে তাঁর মধ্যে বিশেষ কোনো শ্লাঘা বা উচ্চবাচ্য নেই। সাধারণভাবে ব্যাপারটা বোঝাও যায় না বাইরে থেকে তাঁকে দেখে, আমি নিজেও প্রথম দিকে বুঝতাম না, দীর্ঘদিনের আলাপে ধাপে ধাপে কিছু কথার সূত্র ধরে বিষয়টা বোধগম্য হয় আমার কাছে।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস—সব ছেড়েছুঁড়ে স্যার যদি সাইকিয়াট্রি বা সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিস করতেন, সেখানেও দেশে একটা উল্লেখযোগ্য অবস্থান তাঁর থাকত।
প্রসঙ্গত একটা ঘটনা বলি। চেন্নাই এয়ারপোরর্টে অলস বসে আছি স্যারের সঙ্গে। বিচিত্র প্রসঙ্গে খুচরো আলাপ চলছে। কিন্তু এর মধ্যেই হঠাৎ একেবারে অপ্রাসঙ্গিকভাবে স্যার বললেন আমাকে—বরাবরের মতোই আস্তে করে নিচু স্বরে—‘শোনো আতাউর, যে নদীতে ডুবে মরতে পারবা না, সেই নদীতে নামবা না!’
ওটুকুই। এর বেশি একটা শব্দও নয়। কিন্তু আমিও ঠিক বুঝে গেলাম কোন প্রসঙ্গে স্যার কেন কথাটা বললেন। যদিও উপদেশ তিনি কখনোই দেন না। দিতে পছন্দও করেন না।
বেশ পরে আমার মনে হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রসঙ্গে এর চেয়ে সুন্দর একটা পরামর্শ কি উপদেশ তার জায়গা থেকে আমাকে এর চেয়ে মমতাপূর্ণ ভাষায় দেয়া সম্ভব ছিল না। ঘটনাটা স্যার নিশ্চয়ই ভুলেই গেছেন এতদিনে, তা-ই স্বাভাবিক, কিন্তু ‘আপনার সে আদেশ আমি ভুলি নি জনাব!’।
৬.
জগতের প্রায় শতভাগ লোকই আলাপ-বিলাপ করে সমস্যার ডালপালা-কাণ্ড-পাতা নিয়ে, বাকি যে একেবারেই নগণ্য-সংখ্যক লোক—তারাই কেবল বুঝতে পারে এর শেকড়টা কোথায়। তাই সমাধানটাও তারা বোঝে।
বোঝে বলেই ওদের নিস্তার নেই। গোড়া থেকে সমস্যাটা শেকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলতে হবে যে কাজটা করে, তার উদ্যোগ না নিয়ে তাই এ লোকগুলোর নিষ্কৃতি নেই। তার ফলে জীবনে কত দিকে যে তাকে ছাড় দিতে হয়, সে হিসেব কে রাখে।
এই ছাড়টা যিনি আনন্দের সাথে দিতে পারেন, হয়তো তার জীবনেই প্রাপ্তি ও প্রসন্নতা মেলে অশেষ। এই প্রসন্নতা তাঁর জীবনে আছে।
চিরপ্রসন্ন থাকুন, স্যার। জন্মদিনে এই আমাদের প্রার্থনা।
আতাউর রহমান