ঢাকা | সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভয়কে জয় করতেই ট্রাম্পের চায়না সফর

author
শাহীন রাজা

প্রকাশিত : ২০ মে, ২০২৬ দুপুর ৩:৩৩
ad003
পৃথিবীতে সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিশালী এবং আদিম চালক হচ্ছে, ভয়। নিজের নিরাপত্তা হারানোর ভয়। শত্রুর হাতে পরাজিত হওয়ার ভয়। কিংবা প্রতিযোগী রাষ্ট্রের শক্তি বেড়ে যাওয়ায় ভয়। গ্রিক ঐতিহাসিক থুসিডাইডিস তার গ্রন্থে এ কথাগুলোই তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন  ভয় কিভাবে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রকে অযৌক্তিক করে তোলে। এবং ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। ভয় যুক্তির সব আলো নিভিয়ে দেয়। এবং সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিণতির কল্পনা করতে বাধ্য করে।

থুসিডাইডিস তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, এথেন্সের শক্তির উত্থান এবং এর ফলে স্পার্টার মনে ভয় থেকে শুরু হয় পেলোপনেশীয় যুদ্ধ। স্পার্টা ছিল গৃসের তৎকালীন প্রধান স্থলশক্তি। একটি রক্ষণশীল এবং স্থিতাবস্থায় বিশ্বাসী রাষ্ট্র। অন্যদিকে এথেন্স ছিল এক উদীয়মান, গণতান্ত্রিক এবং সাম্রাজ্যবাদী নৌ-শক্তি। এথেন্স ধীরে ধীরে একটি সাম্রাজ্যে পরিণত হতে থাকে। সেই সঙ্গে তার প্রভাব বাড়তে শুরু করে। সেই সময় স্পার্টা এবং তার মিত্ররা নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কিত হয়ে যায়। এই ভয়ই স্পার্টাকে যুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়। স্পার্টার মিত্ররা এই ভয়কে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করে। অবশেষে স্পার্টা যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে বাধ্য হয়।

এই ভয় আজকের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই কাজ করে। একটি দেশ যখন আরেকটি দেশের পারমাণবিক শক্তি বা অর্থনৈতিক উত্থান দেখে, তখন তার মধ্যে ভয় জন্ম নেয়। সেই ভয় থেকেই সে আত্মরক্ষার নামে আগ্রাসী হয়ে উঠে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকার পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা ছিল এই ভয়েরই বহিঃপ্রকাশ। একবিংশ শতাব্দীর এই সময় চায়নার বাণিজ্যিক এবং সামরিক উত্থান আমেরিকার মধ্যে একই ভয় কাজ করছে! 

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভয় থেকেই চায়না সফর করেছেন। চায়নার বাণিজ্যিক আগ্রাসন, আমেরিকাকে ভীত করে তুলেছে। সেই সঙ্গে চায়নার সামরিক অস্ত্রের আধুনিকায়ন, আমেরিকা ক্রমশই শঙ্কিত। একমাত্র যুদ্ধই চায়নার এই অগ্রযাত্রা থামাতে পারে। তা-ই আমেরিকা সরাসরি চায়নার সঙ্গে যুদ্ধে না যেয়ে তার মিত্রদের ওপর হামলা করছে। আমেরিকা দেখতে চায় মিত্রদের ব্যাপারে চায়না কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখে। পাশাপাশি এই সুযেগে চায়নার সামরিক অস্ত্রের সক্ষমতাও দেখে নেয়া এবং চায়নার নেতৃত্বের  মানসিক অবস্থা বা শক্তিও দেখতে চায় আমেরিকা। এই দেখার জন্যই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি চায়না সফর করেছেন। সফর শেষে ট্রাম্প তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের মধ্যে চায়নাকে বার্তা দেয়ার চেষ্টা করেছে যে, তারাই শ্রেষ্ঠ। এটাও কিন্তু যুদ্ধের পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে মনস্তাত্ত্বিক কৌশল। 

এর আগে বিশ্ব রাজনীতিতে সোভিয়েত রাশিয়ার উত্থান ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল।  বিশেষ করে স্ট্যালিনের সময় এর ব্যাপকতা বৃদ্ধি পায়। বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকা প্রথম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। এশিয়া, আফৃকার বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে। এমনকি আমেরিকা সংলগ্ন ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতেও পরিবর্তন দেখা দেয়। 

১৯৬৩ কিউবা সংকটের সময় সোভিয়েত রাশিয়া কিউবার পাশে প্রত্যক্ষ অংশ নেয়ায় আমেরিকাকে পিছিয়ে যেতে হয়। এবং ক্যাস্ট্রোর শাসন বহাল থাকে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের যুদ্ধকালীন সোভিয়েত রাশিয়া পাশে দাড়িয়েছিল। না দাড়ালে হয়তো স্বাধীনতা পেতে আরো রক্তক্ষয় হতো। বিশেষ করে আমেরিকান সপ্তম নৌবহরের বিরুদ্ধে সোভিয়েত রাশিয়া তার নৌবহর পাঠানোয়, আমেরিকাকে তার সপ্তম নৌবহর ফিরিয়ে নিতে হয়েছিল। 

১৯৯১ সালের ডিসেম্বর মাসে সোভিয়েত ব্যবস্থা ভেঙে যায়। এই ভেঙে যাওয়ার পরই বিশ্বে আমেরিকা একক শক্তি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। বিশ্ব রাজনীতিতে একক মোড়ল আত্মপ্রকাশ পায়। তার ইচ্ছায় বিশ্ব পরিচালিত হতে থাকে। এমনকি রাশিয়ার ঘনিষ্ট মিত্র, ইনডিয়াও ক্রমশই আমেরিকার দিকে ঝুকতে থাকে। এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির বেড়াজালে ইনডিয়া আটকে যায়। 

১৯৯১ সালে সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙে যাওয়ার পর আমেরিকার  প্রতিদ্বন্দ্বী দ্বিতীয়  কোনো শক্তি আর দাড়ায়নি। দীর্ঘ সময় এককভাবে বিশ্ব রাজনীতিতে মাতব্বরি করেছে। তবে চায়না নিজেকে গুটিয়ে রেখে গুটিগুটি পায়ে সামনে এগুতে থাকে। এক দিন বিশ্ববাসীকে বিস্মিত করে চায়নার আত্মপ্রকাশ ঘটে। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়,  আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চায়না দাড়িয়ে গেছে। বিশের দশকে এসে চায়নার অবস্থান একদম আমেরিকার মুখোমুখি। আমেরিকা আর চায়নাকে অগ্রাহ্য করতে পারছে না। চায়না এখন বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি। 

এক সময় চায়নার মতোই বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকার প্রবেশ ঘটেছিল। বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে আমেরিকা থেকে স্প্যানিশ ফ্লু পৃথিবীতে ছড়িয়ে পরে। যা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ও প্রাণঘাতী ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি। ১৯১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল। এই মহামারিতে আনুমানিক ৫ কোটি থেকে ১০ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। অনেকের ধারণা স্প্যানিশ ফ্লুর উৎপত্তি স্থান স্পেন। আসলে তা নয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে, যুদ্ধে জড়িত দেশগুলো রোগটির খবর চেপে যায়। স্পেন এই যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকায়, তাদের সংবাদমাধ্যমে এই রোগের খবর খোলাখুলি ও বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করে। এর ফলে বিশ্ববাসীর ধারণা হয় যে রোগটি হয়তো স্পেন থেকেই ছড়িয়েছে। তাই একে ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ নামকরণ করা হয়। আসলে এই রোগের উৎপত্তি হয়েছিল আমেরিকা থেকে। তেমনি এই শতাব্দীর বিশ দশকে চায়না থেকে ‘করোনা ভাইরাস’ বিশ্বে ছড়িয়ে পরে। এই ভাইরাসের গোটা বিশ্ব ব্যবস্থা ওলটপালট হয়ে যায়। লাখো লোকের প্রাণহানি ঘটে। 

প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমেরিকার বিশ্ব রাজনীতিতে প্রবেশের সূচনা হয়। প্রথম মহাযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে  আমেরিকা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে। এক পর্যায়ে  বৃটেন এবং ফ্রান্সের অনুরোধে মিত্র শক্তির পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেয়। এবং যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। প্রথম এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ইরান-আমেরিকা বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ঘটনা। যে কোনো সময় বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। এই যুদ্ধে চায়না ইরানকে সহযোগিতা করলেও প্রকাশ্যে নিরপেক্ষ অবস্থান। বড় ঘটনা ঘটে গেলে চায়নার অবস্থান নিরপেক্ষ থাকবে কি না তা এখনই বলা যাবে না। 

যাই হোক বিবর্তিত বিশ্ব রাজনীতিতে চায়না হচ্ছে বাস্তবতা। এবং চায়না এশিয়ার মধ্যে অবস্থিত। প্রাথমিক পর্যায়ে এশিয়ার দেশগুলোতেই চায়না তার প্রভাব রাখার চেষ্টা করবে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। চায়না, বাংলাদেশের প্রতিবেশী মিয়ানমারের ওপারেই অবস্থান করছে। এ কারণে চায়নার কাছে বাংলাদেশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলে ইনডিয়া মহাসাগরে খবরদারি করা সহজ হবে। কেননা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইনডিয়া মহাসাগর নিয়ন্ত্রণে বঙ্গোপসাগর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া বর্তমানে ইনডিয়া মহাসাগর দিয়ে বিশ্বের চল্লিশ শতাংশের ওপর বাণিজ্য হয়। 

এই একই কারণে আমেরিকার কাছেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ দেশ, বাংলাদেশ। তাই অন্তর্র্বর্তী সরকার আমলে মিয়ানমারে প্রবেশে ‘হিউম্যান করিডোর’ প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। কিন্তু আমাদের সামরিক বাহিনীর তীব্র বিরোধিতার কারণে অন্তর্র্বর্তী সরকার এই উদ্যোগ থেকে পিছিয়ে যায়। সেই সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপিও এই প্রস্তাবনার বিরোধিতা করে থাকে। 

বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন শক্তি চায়নাকে আমরা দূরে ঠেলে রাখতে পারব না। তেমনি আমেরিকার সঙ্গেও বৈরী অবস্থান নেয়া ঠিক হবে না। এমন এক বিব্রতকর অবস্থায় সম্পর্কে একক সিদ্ধান্ত নেয়া কতটা সঠিক হবে তা বিবেচনা করতে হবে। এই বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে  আঞ্চলিক দেশগুলোর আলোচনার মধ্য দিয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। এত বড় দুই শক্তিধর দেশকে এককভাবে সামাল দেয়া কঠিন কাজ। 

যেহেতু এই অঞ্চলের দেশগুলো নিয়ে একটি আঞ্চলিক জোট ‘সার্ক’ বিদ্যমান। এই রকম এক পরিস্থিতিতে এই অঞ্চলের অস্তিত্বের কারণেই সার্ককে জোরদার করা প্রয়োজন। আঞ্চলিক এই জোটকে যদি শক্তিশালী করা যায় তাহলে বাইরের শক্তি এখানে মোড়লী করার ক্ষেত্রে চিন্তাভাবনা করবে। তা না হলে ছোট বা বড় যে দেশই হোক না কেন। এই দুই শক্তিকে মোকাবিলা করা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে যাবে। প্রয়োজনের কারণে আজকে হয়-তো সুসম্পর্ক রয়েছে। আগামীকাল নাও থাকতে পারে। কেননা সব সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র একই রকম। জাতি গোষ্ঠী, আদর্শ, ধর্ম যে পরিচয়েই নিজেদের উপস্থাপন করুক না কেন। দিন শেষে পরিচয় একটাই, সাম্রাজ্যবাদী!

লেখক-


শাহীন রাজা : সিনিয়র সাংবাদিক
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT