বাংলাদেশ সরকার অর্থ বছরের শুরুতে সারা বছরের আয়-ব্যয়ের জন্য একটি অর্থনৈতিক প্ল্যান করে যা পরবর্তী অর্থ বছর আসার আগ পর্যন্ত মেনে চলার চেষ্টা করা হয়। এই পরিকল্পিত আয়-ব্যয়ের হিসাবকেই বাজেট বলে। উল্লেখ্য, সরকারের আয়ের ইচ্ছেসমূহ জনগণের ব্যয়ের কারণ হয় অন্যদিকে সরকারের ব্যয়ের প্ল্যান জনগণের আয়ের কারণ হয়। সরকারের আয়ের খাত ও ব্যয়ের খাতসমূহ দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিছু বিষয় দেশকে কল্যাণমুখী দেশে পরিণত করে আবার কিছু বিষয় অকল্যাণ বয়ে আনে।
প্রথমেই জানা প্রয়োজন বাংলাদেশ সরকারের আয়-ব্যয়ের প্রধান খাতসমূহ। যেমন ২০২৫-২৬ সালের মোট বাজেট ব্যয় ধার্য করা হয়েছিল ৭,৯০,০০০ কোটি টাকা যা অর্জিত হবে নিম্নোক্ত ভাবে : মোট রাজস্ব আয় : ৫,৬৪,০০০ কোটি টাকা, কর ছাড়া আয় : ৪৬,০০০ কোটি টাকা, অভ্যন্তরীণ ঋণ : ১,২৫,০০০ কোটি, বৈদেশিক ঋণ : ১,০১,০০০ কোটি। অন্যদিকে ব্যয়ের খাতসমূহ হলো, পরিচালন ব্যয় (বেতন, ভর্তুকি, প্রণোদনা) : ৫,৬০,০০০ কোটি টাকা, সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ : ৯৫,৯০৮ কোটি টাকা, শিক্ষা : ৯৫,৬৪৪ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য : ৪১,৯০৮ কোটি টাকা।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ প্রতি বছর ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন করে, অর্থাৎ আয়ের চেয়ে ব্যয়ের প্রাক্কলন বেশি থাকে এবং এই ঘাটতি মিটানোর জন্য নির্ভর করে মূলত দেশিয় ও বিদেশি ঋণের ওপর। ঘাটতি পূরণের জন্য যেহেতু অতিরিক্ত শ্রম ও আয়ের ওপর নির্ভর না করে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করে তাই ইহা নিঃসন্দেহে বাজেটের একটি মন্দ দিক। আমাদের এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
এখন দেখা যাক গত কয়েক দিনের পত্রিকার উল্লেখযোগ্য খবর-
থানায় গিয়ে এসপি জানালেন তিনিও ছিনতাইয়ের শিকার, মসজিদে টিকটক ভিডিও : স্কুল ছাত্রীকে বহিষ্কার, মেগা প্রকল্পের ঋণের বোঝা এখন দেশের ২০ কোটি মানুষের ওপর : প্রধান মন্ত্রী, ধুকতে থাকা কারখানাগুলোর জন্য প্রণোদনা দেবে সরকার,- ইত্তেফাক অনলাইন, ১১ মে ২০২৬।
আমরা দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে চলছি : সড়ক পরিবহন মন্ত্রী, রূপগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবক দলের দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত ১২, ফাকা গুলিবর্ষণ, মা দিবসে জলকন্যার যৌথ প্রদর্শনী ‘সব নারীতেই মা’, রাতের আধারে শতবর্ষী পুকুর ভরাট, খবর পেয়ে মাটি বিক্রি করে দিল প্রশাসন, ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে খেলাপি ঋণের হার ৩০.৬ শতাংশ (৫.৫৭ লাখ কোটি টাকা) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, খেলাপি ঋণ নবায়নে আবার সুযোগ দিল বাংলাদেশ ব্যাংক- প্রথম আলো।
এ রকম অসংখ্য ভালো-মন্দ খবর আমাদের মাঝ দিয়ে চলে যায়। ইহা নিত্যদিনের ঘটনা। এই কয়েকটা খবর থেকে যা দেখা যায় জন নিরাপত্তার অভাব, আচরণের সমস্যা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক ও সামাজিক হানাহানি, আবেগি এবং স্নেহ ও ভালোবাসার কমতি নাই, ভূমির অবৈধ ব্যবহার, পরিবেশ দূষণ, ঋণ নিয়ে ফেরত না দেয়ার সংস্কৃতি ও পরবর্তীতে রাষ্ট্রকে জিম্মি করা। এখানে ভালোর চেয়ে মন্দ খবরসমূহই বেশি। অথচ আমাদের বাজেটের ব্যয়ের খাতে অগ্রাধিকার পাচ্ছে মূলত পরিচালনা ব্যয় ও নির্মাণ ব্যয় (উন্নয়ন) যদিও এটাকে অন্যায়ভাবে উন্নয়ন ব্যয় বলা হয়।
আবার এ কথাও সত্য দুর্নীতি ও সব নাগরিকদের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা না থাকায় ট্যাক্স ঠিক মতো আদায় হচ্ছে না। ট্যাক্স আদায় না হওয়ার কারণে ১৭ কোটি মানুষের জন্য ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট মানে প্রতিজনে সারা বছরের বাজেট হলো ৩৯,৫০০ টাকা, যা খুবই সামান্য। তাই আমরা পরে গেছি দরিদ্রের দুষ্ট চক্রে তাই প্রয়োজনীয় জায়গায় খরচ হচ্ছে না, আবার দুর্নীতিতে যা হবার তাও ব্যাহত হচ্ছে।
এ অবস্থা থেকে আমাদের উত্তরণ করতে হবে, অবশ্যই উত্তরণ করতে হবে! এ জন্য প্রয়োজন সাহসী ও দক্ষ নেতৃত্ব, প্রয়োজন দেশের সব মানুষের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা। ইহা কি অসম্ভব? অবশ্যই সম্ভব। তাই আমাদের বাস্তবায়ন করতে হবে ট্যাক্স গভরনেন্স।
উল্লেখ্য, ট্যাক্স গভর্নেন্স হলো এক জন নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরকারকে জমাকৃত ট্যাক্স রিটার্ন ফর্মের তথ্যের সঙ্গে যথাযথ উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ম্যাচিং করা। এই উৎসগুলো যেমন ন্যাশনাল আইডি, পাসপোর্ট, ব্যাংক, বীমা, সিডিবিএল, নিয়োগ কর্তা, লাইফ স্টাইল, ভূমি অফিস, সিটি কর্পরেশন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ অফিস, বিআরটিএ, ইমিগ্রেশন, স্কুল, হসপিটাল ইত্যাদি। আর এর জন্য প্রথম ধাপই হলো একটি স্বচ্ছ পেমেন্ট সিস্টেম, যার মাধ্যমে খুব সহজেই তথ্যের ম্যাচিং করা যায় কম্পিউটার সফটওয়্যার দিয়ে। লেনদেনের স্বচ্ছতা মানুষকে সত্যবাদী করে ও দুর্নীতি বন্ধ করে দেয়।
এভাবে আমরা বাজেটের আকার আরো অনেক বেশি বৃদ্ধি করতে সক্ষম হবো এবং ব্যয়ের অগ্রাধিকার খাতসমূহে পরিবর্তন আনতে পারব। উল্লেখ্য, বর্তমানে সবার আগে অগ্রাধিকার পায় বেতন, ভাতা ও দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ এবং কম গুরুত্ব পায় সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রসমূহ। অন্যদিকে ট্যাক্স গভর্নেন্স বাস্তবায়ন হলে দুর্নীতি ব্যাপকভাবে কমে যাবে এবং সবার নিকট থেকে সঠিকভাবে ট্যাক্স আদায় হবে ও মোট ট্যাক্স অনেক বেশি বেড়ে যাবে। তখন বেতন-ভাতা ও সুদের পরিবর্তে আমরা অধিক ব্যয় করতে সক্ষম হবো সামাজিক নিরাপত্তায়, শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে ও প্রতিরক্ষায়, যা এখন আমাদের জন্য দুঃস্বপ্ন তবে একান্ত প্রয়োজনীয়। এভাবে বাংলাদেশ একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র বাস্তবায়নের জন্য কল্যাণকর বাজেট প্রণয়ন করতে পারে।
মো. মশিউর রহমান : লেখক ও ব্যাংকার