কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার মঙ্গলবাড়িয়া, কুমারপুর, নারান্দী ও হোসেন্দী গ্রামজুড়ে এখন লিচুর উৎসব। গাছভর্তি লালচে টসটসে লিচু আর বেচাকেনার ব্যস্ততায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর লিচুর ফলনও হয়েছে বেশ ভালো। এতে চারটি গ্রাম থেকে প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার লিচু বিক্রির সম্ভাবনা দেখছে উপজেলা কৃষি বিভাগ।
পাকুন্দিয়ার মঙ্গলবাড়িয়া বহু বছর ধরেই “লিচু গ্রাম” হিসেবে পরিচিত। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাশের কুমারপুর, নারান্দী ও হোসেন্দী গ্রামেও বাণিজ্যিকভাবে লিচু চাষের বিস্তার ঘটেছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চারটি গ্রামে বর্তমানে প্রায় ১২ হাজার লিচু গাছ রয়েছে। কম খরচে অধিক লাভ হওয়ায় দিন দিন লিচু চাষে আগ্রহ বাড়ছে স্থানীয় কৃষকদের।
স্থানীয়দের দাবি, এখানকার লিচুর স্বাদ, ঘ্রাণ, রস ও রঙ অন্য যেকোনো এলাকার লিচু থেকে আলাদা। রসে টইটম্বুর ও মধুর মতো মিষ্টি হওয়ায় দেশজুড়ে রয়েছে এর ব্যাপক চাহিদা। ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতিদিন পাঠানো হচ্ছে এসব লিচু। এমনকি দেশের গণ্ডি পেরিয়েও বিদেশে যাচ্ছে পাকুন্দিয়ার বিখ্যাত এই ফল।
প্রতি বছরের মে-জুন এলেই পুরো এলাকা যেন লাল রঙে সেজে ওঠে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে লিচু সংগ্রহ, বাছাই ও বিক্রির ব্যস্ততা। গাছের ডালে ডালে থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা গোলাপি আভাযুক্ত পাকা লিচু দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা।
বর্তমানে আকার ও মানভেদে প্রতি ১০০ লিচু বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায়। গত এক সপ্তাহ ধরে জমে উঠেছে বেচাকেনা, যা চলবে আরও অন্তত দুই সপ্তাহ।
গাজীপুর থেকে পরিবার নিয়ে লিচু কিনতে আসা সোহেল মিয়া বলেন, “ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর অনেক ভিডিও দেখেছি। তাই পরিবার নিয়ে চলে এসেছি। এখানে এসে বুঝলাম, বাস্তবে লিচু আরও সুন্দর আর সুস্বাদু।”
আরেক ক্রেতা সবুজ মিয়া বলেন, “প্রতি বছরই এখানে লিচু কিনতে আসি। এবার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছি। নিজ হাতে গাছ থেকে লিচু পেড়ে খাওয়ার মজাই আলাদা।”
লিচু চাষি মো. শামীম মিয়া বলেন, “আমাদের এলাকার লিচুর স্বাদ, রস, ঘ্রাণ ও রং একে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। একবার কেউ এই লিচু খেলে বারবার খেতে চাইবে। এ বছর ফলন ভালো হয়েছে, আশা করছি ভালো লাভ হবে।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নূরে-ই-আলম বলেন, “পাকুন্দিয়ার চারটি গ্রামে বহু বছর ধরে লিচুর আবাদ হয়ে আসছে। অনেক পুরনো লিচু গাছ রয়েছে এসব এলাকায়। বিশেষ করে মঙ্গলবাড়িয়ার লিচু দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে। এ বছর চারটি গ্রাম থেকে প্রায় ১২ কোটি টাকার লিচু বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।”
লিচুর টক-মিষ্টি স্বাদ আর লাল রঙের সৌন্দর্যে এখন প্রাণ ফিরে পেয়েছে পাকুন্দিয়ার চার গ্রাম। স্থানীয়দের স্বপ্ন—একদিন আন্তর্জাতিক বাজারেও আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে মঙ্গলবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী এই লিচু।