চাঁদাবাজি আজ একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। সড়ক পরিবহন থেকে বাজার, ফুটপাত থেকে ঠিকাদারি, ময়লা বাণিজ্য থেকে রাজনৈতিক প্রভাব—সবখানেই যেন চাঁদাবাজির এক অদৃশ্য সাম্রাজ্য বিস্তৃত। সরকার দেশব্যাপী চাঁদাবাজদের তালিকা করছে, অভিযান চালাচ্ছে, গ্রেপ্তার করছে—এটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধু গ্রেপ্তার করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কারণ চাঁদাবাজির শেকড় এখন রাজনীতি, প্রশাসন, প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।
তবে এই আলোচনার সবচেয়ে ভয়ংকর এবং স্পর্শকাতর দিকটি হলো—সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজির বিস্তার। এটি শুধু একটি অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্রের বিবেককে অপমান করার নামান্তর। কারণ সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা, যাকে বলা হয় রাষ্ট্রের “চতুর্থ স্তম্ভ”। অথচ সেই পবিত্র পেশার আড়ালে যখন দুর্বৃত্তরা চাঁদাবাজি, দালালি, ব্ল্যাকমেইল এবং প্রভাব বিস্তারের ব্যবসা শুরু করে, তখন শুধু সাংবাদিকতা নয়—পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
আজ বাস্তবতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও অসংখ্য নামসর্বস্ব পত্রিকা, অনলাইন পোর্টাল ও কথিত টিভি চ্যানেলের পরিচয়ে একদল ব্যক্তি ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের অনেকেই শুদ্ধভাবে বাংলা ভাষায় একটি আবেদনপত্র পর্যন্ত লিখতে পারেন না, সংবাদ লেখার মৌলিক ধারণাও জানেন না, অথচ গলায় প্রেসকার্ড ঝুলিয়ে নিজেদের “সম্পাদক”, “প্রকাশক”, “স্টাফ রিপোর্টার” কিংবা “ব্যুরোচিফ” পরিচয় দিয়ে বেড়ান। তাদের প্রধান কাজ সাংবাদিকতা নয়—ভয় দেখানো, প্রভাব খাটানো এবং অর্থ আদায় করা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বাস্তবতা দেশের মানুষ প্রতিদিন দেখলেও মূলধারার গণমাধ্যম এ বিষয়ে কার্যত নীরব। প্রশ্ন জাগে—কেন? কেন জাতীয় টেলিভিশনগুলোতে সাংবাদিক নামধারী চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দেখা যায় না? কেন প্রথম সারির পত্রিকাগুলো এই অপরাধচক্রের মুখোশ উন্মোচনে আগ্রহী নয়? এই নীরবতার পেছনে কি শুধুই ভয়, নাকি এর ভেতরে আরও গভীর কোনো স্বার্থ জড়িত?
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনও এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। জাতীয় প্রেসক্লাব, রিপোর্টার্স ইউনিটি কিংবা বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের আশপাশে এমন বহু মানুষের আনাগোনা দেখা যায়, যাদের সাংবাদিকতার সঙ্গে বাস্তব কোনো সম্পর্ক নেই। কোথায় কাজ করেছেন, কী লিখেছেন, কোন সংবাদমাধ্যমে পেশাগত অবদান রেখেছেন—কোনো তথ্য নেই। অথচ তারা প্রভাবশালী, ক্ষমতাবান এবং অনেক ক্ষেত্রে সংগঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বলয়েও সক্রিয়।
প্রশ্ন হলো—একটি পেশাজীবী সংগঠনে অপেশাদার, বিতর্কিত এবং সুবিধাবাদী মানুষ কীভাবে জায়গা পায়? এর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, সাংবাদিকতার ভেতরেও দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি এবং তোষামোদির এক বিপজ্জনক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে, তখন এক শ্রেণীর তথাকথিত সাংবাদিক সেই দলের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে ওঠেন। তারা সংবাদকর্মী কম, রাজনৈতিক কর্মী বেশি। ফলে সত্য, নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব ধীরে ধীরে নির্বাসিত হয়।
এ কারণেই আজ সাংবাদিকতার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমছে। মানুষ এখন আর সহজে কাউকে সাংবাদিক হিসেবে সম্মান করতে চায় না। কারণ তারা জানে না—সামনে দাঁড়ানো মানুষটি সত্যিকার অর্থে সংবাদকর্মী, নাকি কোনো চাঁদাবাজ চক্রের সদস্য। এই অবিশ্বাস একটি জাতির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ গণমাধ্যমের প্রতি আস্থা ভেঙে গেলে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের আরেকটি করুণ বাস্তবতা হলো—দেশের বহু গণমাধ্যম তাদের কর্মীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা দিতে পারে না। অনেক সাংবাদিক মানবেতর জীবনযাপন করেন। আবার একই সময়ে দেখা যায়, নাম না জানা সাপ্তাহিক বা অস্তিত্বহীন অনলাইন পোর্টালের মালিক পরিচয়ে কেউ কেউ বিলাসবহুল গাড়িতে চলাফেরা করছেন, অভিজাত জীবনযাপন করছেন, বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে উঠছেন। প্রশ্ন হলো—এই অর্থ কোথা থেকে আসে?
দুর্নীতি, অবৈধ লেনদেন, ব্ল্যাকমেইল, রাজনৈতিক তদবির এবং ক্ষমতাসীন মহলের সঙ্গে আঁতাত—এই অস্বচ্ছ অর্থনীতিই এক শ্রেণীর কথিত সাংবাদিককে রাতারাতি বিত্তবান করে তুলছে। তারা মূলত দুর্নীতিবাজদের সুরক্ষা দেয়, বিনিময়ে মাসোহারা পায়।
কখনো কোনো ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করে, কখনো সরকারি অফিসে গিয়ে কর্মকর্তাদের চাপ সৃষ্টি করে, আবার কখনো রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা আদায় করে। এভাবে সাংবাদিকতা ধীরে ধীরে জনসেবামূলক পেশা থেকে এক শ্রেণীর মানুষের জন্য প্রভাব ও অর্থ উপার্জনের অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে। এটি শুধু দুঃখজনক নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক নৈতিকতার জন্যও মারাত্মক হুমকি।
সবচেয়ে বড় সংকট হলো—যোগ্যতা ও নৈতিকতার প্রশ্নটি এখন প্রায় অনুপস্থিত। বাংলাদেশে সাংবাদিক হওয়ার জন্য কার্যকর কোনো জাতীয় মানদণ্ড নেই। কে সাংবাদিক পরিচয় দিতে পারবে, কী শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগবে, কী ধরনের প্রশিক্ষণ থাকতে হবে, কীভাবে পেশাগত জবাবদিহি নিশ্চিত হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা নেই বা থাকলেও কার্যকর নয়। ফলে যে কেউ একটি অনলাইন পোর্টাল খুলে বা নামসর্বস্ব পত্রিকার কার্ড বানিয়ে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করতে পারছে।
এটি বন্ধ করতে হলে এখনই কঠোর ও বাস্তবসম্মত সংস্কার জরুরি। প্রথমত, সাংবাদিকতার জন্য একটি জাতীয় নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পেশাগত যোগ্যতা, নৈতিক আচরণবিধি এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ভুঁইফোড় ও অস্তিত্বহীন গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। চতুর্থত, সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে হবে। কারণ সাংবাদিকতা কোনো রাজনৈতিক দলের মুখপত্র হওয়ার জন্য সৃষ্টি হয়নি; এটি জনগণের কণ্ঠস্বর হওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এখানে আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর আগেও আমি বহুবার বলেছি যে, চাটুকারিতা কোনো রাষ্ট্র, সরকার বা রাজনৈতিক দলের জন্য কখনোই কল্যাণকর নয়। ইতিহাস সাক্ষী—ক্ষমতাসীনদের চারপাশে যখন সত্যভাষীদের পরিবর্তে তোষামোদকারীরা জড়ো হয়, তখন ভুল সিদ্ধান্ত বাড়ে, দুর্নীতি বেড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সরকার জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম বাস্তবতায় এই “তোতা সংস্কৃতি” এখন এক মহামারিতে পরিণত হয়েছে।
অনেক সাংবাদিক আজ আর সত্য বলার সাহস করেন না। কারণ সত্য বললে বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়, রাজনৈতিক রোষানলে পড়তে হয়, চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে এক শ্রেণীর মানুষ ক্ষমতার প্রশংসাকেই সাংবাদিকতা মনে করছে। অথচ প্রকৃত সাংবাদিকতা হলো ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, দুর্নীতির মুখোশ উন্মোচন করা এবং জনগণের পক্ষে কথা বলা।
আজ রাষ্ট্রের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়; নৈতিক পুনর্গঠন। যদি রাষ্ট্রের বিবেকধারী শ্রেণীই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে সমাজে ন্যায়বিচার, সততা ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠা করা সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব হয়ে যাবে।
সুতরাং বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতি আমার জোরালো আহ্বান—সাংবাদিকতার নামে যারা চাঁদাবাজি, দালালি ও অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে, তাদের দ্রুত চিহ্নিত করুন। প্রকৃত সাংবাদিকদের সুরক্ষা দিন, ভুয়া সাংবাদিকদের আইনের আওতায় আনুন। প্রেসকার্ডকে যেন আর অপরাধের লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহার করা না যায়।
একই সঙ্গে প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ ক্ষুধার্ত, অনিরাপদ এবং অনিশ্চিত সাংবাদিকতা কখনো শক্তিশালী গণমাধ্যম গড়তে পারে না। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে—সাংবাদিকতা ধ্বংস হলে গণতন্ত্রও ধ্বংস হয়ে যাবে।
বাংলাদেশকে যদি সত্যিকার অর্থে একটি সভ্য, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হয়, তাহলে সাংবাদিকতার নামে চলা অনিয়ম, দুর্নীতি, দলীয়করণ এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে এখনই কঠোর অবস্থান নিতে হবে। অন্যথায় একদিন মানুষ শুধু রাজনীতিকদের নয়, গণমাধ্যমকেও ঘৃণা করতে শুরু করবে। আর সেটিই হবে একটি জাতির জন্য সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: [[email protected]](mailto:[email protected])