ঢাকা | রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্ব রাজনীতির নতুন কেন্দ্র মস্কো-বেইজিং

author
রাজু আলীম

প্রকাশিত : ২১ মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১২
ad003
এক সময় আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্র ছিল ওয়াশিংটন। বৈশ্বিক সংকট, যুদ্ধ, বাশিজ্য কিংবা ডিপ্লোম্যাটিক সমঝোতার বড় সিদ্ধান্তগুলো শেষ পর্যন্ত গিয়ে ধামত হোয়াইট হাউসের দরজায়। বিনয় ২০২৬ সালের বিশ্ব রাজনীতি সেই পুরনো বাস্তবতা থেকে দ্রুত সরে যাচ্ছে। এখন বিশ্ব এমন এক অস্বস্তিকর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে আমেরিকা এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি হলেও ডিপ্লোম্যাটিক কেন্দ্রীয়তা ক্রমশ সরে যাচ্ছে বেইজিংয়ের দিকে। আর গত গত এক এক সপ্তাহের ঘটনা প্রবাহ যেন সেই পরিবর্তনের প্রতীকী প্রকাশ। প্রথমে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফর, এরপর তার ঠিক পরই রুশ প্রেসিডেন্ট তুাদিমির পুটিনের চায়না সফর- এই ধারাবাহিকতা শুধু ডিপ্লোম্যাটিক ক্যালেন্ডারের ঘটনা নয়। বরং এটি নতুন বৈশ্বিক শক্তি-সমীকরণের স্পষ্ট বার্তা।

চায়না এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে তারা একই সঙ্গে আমেরিকার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে, আবার রাশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবেও থাকতে পারে। আরো অরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিকেই এখন কোনো না কোনোভাবে বেইজিংয়ের দরজায় যেতে হচ্ছে। এই বাস্তবতাই বিশ্লেষকদের মুখে একটি নতুন বাক্য তুলে এনেছে-'সবকার্ড এখন চায়নার হাতে।'

পুটিনের এবারের সফরকে কেবল দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ সফরের সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প বেইজিং ছেড়ে যাওয়ার মাত্র এক দিন পর পুটিনের সফরের ঘোষণা আসে। অর্থাৎ চায়না খুব সচেতনভাবেই বিশ্বকে একটি প্রতীকী ব্যার্তা দিয়েছে। সেই বার্তা হলো- বিশ্ব রাজনীতির দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি, ওয়াশিংটন ও মস্কো- দুই পক্ষকেই এখন বেইজিংয়ের সঙ্গে হিসাব করেই চলতে হচ্ছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প চায়না সফরে গিয়েছিলেন মূলত অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক কিছু সমঝোতার আশায়। বিশেষ করে ইরান সংকট, বাণিজ্য এবং তাইওয়ান ইসুতে তিনি চায়নার কাছ থেকে কিছু ইতিবাচক অবস্থান আশা করেছিলেন। কিন্তু সফরের পর পরিষ্কার হয়েছে, বেইজিং ট্রাম্পকে খুব বেশি কিছু দেয়নি। বরং চায়না এমন এক অবস্থান নিয়েছে, যেখানে তারা আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে, কিন্তু একই সঙ্গে ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গেও কৌশলগত দূরত্ব তৈরি করছে না।

এই জায়গাটিই এখন চায়নার সবচেয়ে বড় শক্তি। তারা আর স্নায়ু যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের মতো কেবল একটি 'উদীয়মান অর্থনীতি' নয়। বরং, তারা এখন এমন এক শক্তি, যারা প্রতিদ্বন্দ্ব ব্লকগুলোর মধ্যেও যোগাযোগের কেন্দ্র হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় ভাষায় এটিকে বলা যায় 'কেন্দীয় মধ্যস্থতাকারী শক্তি'। আর বেইজিং ঠিক সেটিই হতে চাইছে।

রাশিয়ার জন্য এই সম্পর্ক আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রাশিয়াকে কার্যত চায়নার ওপর নির্ভরশীল করে ফেলেছে। জ্বালানি রফতানি থেকে প্রযুক্তি আমদানি-সব ক্ষেত্রেই এখন মস্কোর জন্য চায়না অপরিহার্য। আগে রাশিয়া নিজেকে চায়নার তুলনায় শক্তিশালী সামরিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখাতে পারত। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই ভারসাম্য বদলে গেছে। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক প্রয়াণ-সবদিক থেকেই এখন চায়না এগিয়ে।

এই কারণেই চ্যাথাম হাউসের গবেষক টিমোথি এশের মন্তব্যটি এত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, 'সব কার্ডই এখন চায়নার হাতে' কথাটি কেবল অলঙ্কার নয়; বরং বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার নির্যাস।

কারণ পুটিন এখন এমন এক অবস্থানে আছেন, যেখানে তাকে যুদ্ধ চালাতে অর্থনৈতিক সহায়তা দরকার, প্রযুক্তিগত সহায়তা দরকার, বিকল্প বাজার দরকার এবং ডিপ্লোম্যাটিক সমর্থনও সরকার। এই চারটি ক্ষেত্রেই চায়না এখন রাশিয়ার সবচেয়ে বড় ভরসা। বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তি, দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তিএবং শিল্প সরঞ্জামের ক্ষেত্রে রাশিয়ার নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে।

অন্যদিকে চায়নাও রাশিয়াকে পুরোপুরি হারাতে চায় না। কারণ রাশিয়া এখন চায়নার জন্য কয়েকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, রাশিয়া চায়নার জন্য বিশাল জ্বালানি উৎস। দ্বিতীয়ত, আমেরিকা-বিরোধী বৈশ্বিক ভারসাম্যে রাশিয়া চায়নার প্রয়োজনীয় আশীদার। তৃতীয়ত, ইওরেশীয় তরাজনীতিতে মস্কো এখনো সামরিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।

কিন্তু এই সম্পর্কের মধ্যেও ক্ষমতার ভারসামা যে বদলে গেছে, সেটা এখন স্পষ্ট। আগে রাশিয়া-চায়না সম্পর্ককে 'সম মর্যাদার অংশীদারত্ব' বলা হতো। এখন সেটি ক্রমশ চায়নার নেতৃত্বাধীন কৌশলগত অংশীদারত্বে' রূপ নিচ্ছে।

এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা গেছে জ্বালানি আলোচনাতেও। 'পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া-২' পাইপ লাইন প্রকল্প নিয়ে মদ্ধ্যে যতটা আগ্রহী, বেইজিং ততটা প্রকাশ্যে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। কারণ চায়না জানে, রাশিয়ার বিকল্প বাজার সীমিত। ইওরোপিয়ান বাজার প্রায় হারিয়ে ফেলার পর চায়নার প্রয়োজন রাশিয়ার অনেক বেশি। ফলে দর কষাকষির ক্ষমতাও এখন বেইজিংয়ের হাতে।

তবেএই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত অন্য জায়গায়। সেটি হলো চায়নার নতুন ডিপ্লোম্যাটিক চরিত্র নির্মাণ। বেইজিং এখন নিজেকে এমন এক 'নিরপেক্ষ পরাশক্তি' হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে, যারা কারো আনুষ্ঠানিক সামরিক মিত্রা নয়, কিন্তু সবার সঙ্গে কাজ কাজ করতে সক্ষম।

ইরান-ইসরেল-গ্রামেরিকা সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই অবস্থান আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ হরমুজ প্রণালিতে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্তদের একটি হবে চায়না। তানের শিল্প অর্থনীতি বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে মিডল ইস্টে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চায়নার জন্য বড় ঝুঁকি।

এ কারণে চায়না প্রকাশ্যে 'শান্তি', 'মধ্যস্থতা' এবং 'স্থিতিশীলতা'র কথা বলছে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা ইরান বা রাশিয়াকেও ছাড়ছে না। এই দ্বৈত কৌশলই এখন বেইজিংয়ের ডিপ্লোম্যাটিক দক্ষতার মূল জায়গা।

অন্যদিকে ওয়াশিংটনের জন্য এটি উদ্বেগের কারণ। কারণ, আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক রাজনীতিকে 'মিত্র বনাম প্রতিপক্ষ' কাঠামোয় দেখেছে। বিনা চায়না সেই কাঠামো ভেঙে দিচ্ছে। তারা একই সঙ্গে সউদি আরবের সঙ্গেও সম্পর্ক রাখছে, আবার ইরানের সঙ্গেও। তারা রাশিয়ার অংশীদার, কিন্তু ইওরোপের সঙ্গেও বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। তারা আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু একই সঙ্গে আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনৈতিক অংশীদারদের একটি।

এই বহুমাত্রিক কৌশলই চায়নাকে অন্যদের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে।
সি চিন পিং ও পুটিনের যৌথ বিবৃতিও সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ। তারা 'জঙ্গলের কাইন' এবং 'একক আধিপত্য' নিয়ে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, সেটি মূলত আমেরিকা-কেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বার্তা। বিশেষ করে ট্রাম্পের 'গোল্ডেন ডোম' ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রকল্পের সমালোচনা করে তারা স্পষ্ট করতে চেয়েছেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে বেইজিং ও মস্কোর অভিন্ন উদ্বেগ রয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- চায়না ও রাশিয়া এখন আর শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে কথা বলছে নাঃ তারা বিকল্প বিশ্ব ব্যবস্থার ভাষাও তৈরি করছে। 'বহুমেরু বিশ্ব', 'সমতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক', 'একক অধিপত্যের বিরোধিতা'-এই শব্দগুলো এখন তাদের যৌথ রাজনৈতিক অভিধানের অংশ।

অবশ্য, এই ভাষার মধ্যেও বাস্তব রাজনীতি আছে। কারণ 'বহুমেরু বিশ্বা'র কথা বললেও বাস্তবে চায়না নিজেই নতুন কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হচ্ছে। পার্থক্য শুধু এটুকু, তারা আমেরিকার মতো প্রকাশ্যে সামরিক জোটের বদলে অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং কৌশলগত নির্ভরতার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করছে।

এই বাস্তবতায় ট্রাম্পের বেইজিং সফর এবং পুটনের পরবর্তী সফদা একটি প্রতীকী চিত্র তৈরি করেছে। এক দিকে আমেরিকা অন্য দিকে রাশিয়া- দুই জনকেই এখন বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে হচ্ছে। আর চায়না সেই অবস্থানকে ব্যবহার করছে নিজের বৈশ্বিক মর্যাদা আরো শক্তিশঙ্গী করার জন্য।

বিশ্ব ব্যবস্থা এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাড়িয়ে, যেখানে পুরনো একমেরু কাঠামো ভেঙে যাচ্ছে, কিন্তু নতুন কাঠামো এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই চায়না নিজেকে 'অপরিহার্য শক্তি' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে। তারা সরাসর যুদ্ধ চায় না প্রকাশ্য সামরিক সংঘাতও চায় না; বরং তারা এমন এক বিশ্ব চায়, যেখানে সব বড় শক্তিকে কোনো না কোনোভাবে বেইজিংয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হবে। 

পুটিনের সফর সেই বাস্তবতাকেই আরো স্পষ্ট করেছে। হয়তো বড় কোনো চুক্তি হয়নি, নতুন কোনো নাটকীয় যোষণ আসেনি। কিন্তু অন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সব সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঘোষণাপত্র নয়ঃ অনেক সময় প্রতীকই সবচেয়ে বড় বার্তা দেয়। আর এই সফরের সবচেয়ে বড় প্রতীকী বার্তা হলো- আজকের বিশ্বে বেইজিংকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা কারো নেই।

এই পরিবর্তিত বাস্তবতার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো- চায়না এখন আর কেবল অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখছে না; বরং তারা ধীরে ধীরে বৈশ্বিক রাজনৈতিক ভাষাও নির্ধারণ করতে শুরু করেছে। এক সময় আন্তর্জাতিক সংকটের বয়ান তৈরি হতো ওয়াশিংটনে, এখন সেই বয়ান তৈরির প্রতিযোগিতায় বেইজিংও সমান শক্তিশালী পক্ষ। 'বহুমেরু বিশ্ব', 'পারস্পরিক সম্মান', 'অভ্যন্তরীণশ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা', 'উইন-উইন সহযোগিতা-এই শব্দগুলো শুধু ডিপ্লোম্যাটিক অলংকার নয়। এগুলো চায়নার বিকল্প বিশ্ব দর্শনের অংশ। আর সেই দর্শনের লক্ষ্য হলো- পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন অন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈতিক ও রাজনৈতিক একচেটিয়ত্বকে চ্যালেঞ্জ করা।

এই জায়গাটিতেই আমেরিকার জন্য সবচেয়ে বড় সংকট তৈ তৈরি হচ্ছে। কারণ আমেরিকার সামরিক শক্তি এখনো বিশাল, প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। বিনা সমস্যা হচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাবের কাঠামোতে। ইরাক যুদ্ধ, আফগানিস্তান, ইউক্রেন সংকট এবং সাম্প্রতিক মিড ইস্টে সংঘাত- সব মিলিয়ে আমেরিকার নিয়ম-ভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থা'র ধারণা এখন অনেক দেশের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো ক্রমশ এমন এক শক্তিকে খুজছে, যারা পশ্চিমা শর্ত ছাড়া অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশীদারত্ব দিতে পারে। চায়না সেই শূন্যস্থানটিই পূরণ করার চেষ্টা করছে।

রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও সেই বৃহত্তর কৌশলের অংশ। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাশিয়া যত বেশি বিচ্ছিন্ন হয়েছে, চায়না তত বেশি সতর্ক কৌশল নিয়েছে। তারা কখনো সরাসরি রাশিয়ার যুদ্ধকে সমর্থন করেনি, আবার পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ভাষাও গ্রহন করেনি। বরং, চায়না পুরো সময়টাতে নিজেদের এমনভাবে অবস্থান করিয়েছে, যাতে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলেও তারা লাভবান হতে পারে, আবার ভবিষ্যতে শান্ত আলোচনার ক্ষেত্রেও নিজেদের 'গ্রহণযোগ্য মধ্যস্থতাকারী' হিসেবে তুলে ধরতে পারে।

এখানেই বেইজিংয়ের কৌশলগত ধৈর্য অন্যদের থেকে আলাদা। ওয়াশিংটন যেখানে দ্রুত ফলাফল চায়, চায়না সেখানে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্মাণে বিশ্বাস করে। 'বেল্ট এন্ড রোড', আফুকায় বিনিয়োগ, মিড ইস্টে মধ্যস্থতা, বৃকস সম্প্রসারণ কিংবা সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা-সবকিছুই আসলে একই বৃহৎ প্ল্যানের অংশ। সেই পাঠান হলো এমন একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, যেখানে পশ্চিমা জোটের বাইরে থেকেও দেশগুলো নিজেদের নিরাপদ ও লাভবান মনে করে।

পুটিনের এবারের সফর সেই বার্তাও দিয়েছে, রাশিয়া এখন কেবল সামরিক শক্তিরা ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারবেনা। তাদের অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার জন্য চায়নার প্রয়োজন। আর চায়না এই এই  নির্ভরডাকে খুব হিসাব করে ব্যবহার করছে। তারা রাশিয়াকে বাচিয়ে রাখতে চায়, কিন্তু এতটা শক্তিশালীও হতে দিতে চায় না মস্কো আবার স্বাধীন ভূরাজনৈতিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। ফলে সম্পর্ক যতই 'বন্ধুত্বপূর্ণ বলা হোক, বাস্তবে এটি এখন অসম অংশীদারত্বের দিকে এগোচ্ছে।

একই সঙ্গে এই সফর ইওরোপের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। কারণ ইওরোপীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে ভেবেছিল, চায়নার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেও রাশিয়াকে আলানা করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, চায়না রাশিয়াকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবেই সবেই দেখছে। ফলে ইওরোপ এখন হৈত সংকটে পড়েছে এক দিকে নিরাপত্তার জন্য আমেরিকার ওপর নির্ভরতা অন্য দিকে অর্থনীতির জন্য চাংলার বাজারের প্রয়োজন।

এই জটিল বাস্তবতাই বর্তমান বিশ্বকে 'নতুন স্নায়ু যুদ্ধ' বলার চেয়ে আরো জটিল করে তুলেছে। কারণ স্নায়ু যুদ্ধের সময় ব্লকগুলো স্পষ্ট ছিল। এখন সম্পর্কগুলো অনেক বেশি আন্তঃনির্ভরশীল। আমেরিকা ও চায়না প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু তারা একে অপরের বড় অর্থনৈতিক অংশীদারও। চায়না ও রাশিয়া ঘনিষ্ঠ, বিল্ব তারা আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট নয়। ইওরোপ আমেরিকার মিত্র, বিলয় তারা চায়নার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতেও রাজি নয়।

এই বহুমাত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার কেন্দ্রেই এখন বেইজিং নিজেকে স্থাপন করছে। আর সি চিন পিং সম্ভবত এ কারণেই এত আহাবিশ্বাসী। তিনি জানেন, আমেরিকার মতো চায়নাকে কেউ একঘরে করতে পারছে না। বরং, প্রতিদ্বন্দ্বীরাও এখন বেইজিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।

তবেএই উত্থানের মধ্যেও চায়নার সামনে বড় ঝুঁকি রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আগের মতো নেই, জনসংখ্যাগত সংকট বাড়ছে, পশ্চিমা প্রযুক্তি-নির্ভরতা পুরোপুরি কাটেনি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা উত্তেজনাও বাড়ছে। তাইওয়ান প্রশ্ন এখনো সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য সংঘাতের কেন্দ্র। দক্ষিণ চায়না সাগরেও উত্তেজনা রয়েছে। অর্থাৎ, চায়নার উত্থান যত দ্রুত হয়েছে, এর বুকিও তত গভীর।

তবু বর্তমান মুহূর্তে একটি বিষয় পরিষ্কার- বিশ্ব রাজনীতির কেন্দীয় মঞ্চে এখন চায়না ছাড়া কোনো সমীকরণ সম্পূর্ণ হয় না। ট্রাম্পের সফর সেটি দেখিয়েছে, পুটিনের সফর সেটিকে আরো দৃশ্যমান করেছে। এক সময় ওয়াশিংটন ছিল সেই রাজধানী, যেখানে সবাইকে যেতে হতো। এখন বেইজিংও সেই তালিকায় স্থায়ীভাবে যোগ হয়েছে।

আর এ কারণেই পুটিনের সফর শুধু রাশিয়া-চায়না সম্পর্কের বিষয় নয়। এটি আসলে এক নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার প্রতীক, যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্র ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে। ইতিহাসের ঢাকা এখন এমন এক দিকে ঘুরছে, যেখানে বেইজিং আর কেবল অংশগ্রহণকারী নয়। বরং খেলাটির অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক।

লেখক-


রাজু আলীম: কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া-ব্যক্তিত্ব
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT