পবিত্র ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীরা। পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে শুক্রবার সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছেড়ে দেশের সাতটি বিভাগের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়টি বিশেষ বাস।
তবে শুধু বাস ছাড়াই নয়, এবারের ঈদযাত্রাকে ঘিরে ক্যাম্পাসজুড়ে দেখা গেছে ভিন্ন এক আবেগঘন চিত্র। বাসের সীমিত আসন নিশ্চিত করতে অনেক শিক্ষার্থী বাস ছাড়ার প্রায় ১২ ঘণ্টা আগ থেকেই ক্যাম্পাসে এসে অপেক্ষা করেছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক, শান্ত চত্বর, সামাজিক অনুষদ ভবন, কাফেটিরিয়া ও আশপাশের এলাকায় শিক্ষার্থীদের ভিড় জমতে শুরু করে। কেউ ব্যাগ রেখে সিরিয়াল ধরে রেখেছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে মেতেছেন, আবার কেউ রাতভর অপেক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিশেষ এই বাস সার্ভিসের মাধ্যমে চট্টগ্রাম, রংপুর, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা হয়েছেন। প্রশাসনের প্রকাশিত রুট প্ল্যান অনুযায়ী খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে একটি করে এবং রংপুর ও চট্টগ্রাম বিভাগে দুটি করে মোট নয়টি বাস পরিচালিত হচ্ছে।
খুলনা বিভাগের ‘পদ্মা’ বাসটি পদ্মা সেতু হয়ে ফরিদপুর, মাগুরা ও যশোর অতিক্রম করে খুলনায় পৌঁছাবে। বরিশাল বিভাগের ‘তুরাগ’ বাস যাবে ভাঙ্গা, কাশিয়ানী, গোপালগঞ্জ ও পিরোজপুর হয়ে বরিশাল পর্যন্ত।
রংপুর বিভাগের জন্য রাখা হয়েছে দুটি বাস। ‘অনির্বাণ-২’ বাসটি গাজীপুর ও গাইবান্ধা হয়ে রংপুর যাবে। অন্যদিকে ‘ধূমকেতু’ বাসটি বগুড়া, গোবিন্দগঞ্জ, ঘোড়াঘাট, বিরামপুর, ফুলবাড়ী, দিনাজপুর ও সৈয়দপুর অতিক্রম করে রংপুরে পৌঁছাবে।
রাজশাহী বিভাগের ‘স্বপ্নচূড়া’ বাসটি ঢাকা, সিরাজগঞ্জ ও নাটোর হয়ে রাজশাহীতে যাবে। চট্টগ্রাম বিভাগের ‘গোমতি’ বাসটি কুমিল্লা, হাজীগঞ্জ, রামগঞ্জ ও নোয়াখালী রুটে চলাচল করবে। এছাড়া ‘উল্কা-৪’ বাসটি কুমিল্লা ও ফেনী হয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছাবে।
সিলেট বিভাগের ‘আড়িয়াল’ বাসটি নরসিংদী, ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার হয়ে সিলেটে যাবে। আর ময়মনসিংহ বিভাগের ‘প্রজন্ম’ বাসটি গাজীপুর, ভালুকা, ত্রিশাল ও নান্দাইল হয়ে ময়মনসিংহে পৌঁছাবে।
শুক্রবার সকাল আটটা থেকে নির্ধারিত সময়ে বাসগুলো গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। বাড়ি ফেরার আনন্দে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও, অনেককে আসন না পেয়ে দাঁড়িয়ে যাত্রা করতেও দেখা গেছে। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক অনেক বেশি কিন্তু বাসের সংখ্যা সীমিত। তবে, দাড়িয়ে ইদ যাত্রা শিক্ষার্থীদের কষ্টের চেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করছেন অনেকেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মুকিম হাসান বলেন, “সারা বছর পড়াশোনা ও একাডেমিক ব্যস্ততার কারণে পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়। তাই ঈদের সময় পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর আনন্দটাই আলাদা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস সার্ভিস থাকায় এবার বাড়ি ফেরা সহজ হয়েছে।”
অন্যদিকে বাসের সিট পেতে ১২ ঘণ্টা আগে অপেক্ষারত রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী স্বপ্নীল বলেন, “আমার বাসা অনেক দূরে, পঞ্চগড়। যদি আগে না আসি, তাহলে পরে এসে সিরিয়াল পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। তাই রাত জেগে হলেও অপেক্ষা করছি, যেন নিশ্চিতভাবে বাসে যেতে পারি।”
সার্বিক বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসক তারেক বিন আতিক বলেন, “জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবহন পুল থেকে নয়টি বাসের মাধ্যমে বিভাগীয় শহরগুলোতে শিক্ষার্থীদের পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা আশা করছি, শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে পরিবারের কাছে পৌঁছে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারবে।”
তিনি আরো বলেন, “পরবর্তী ঈদ যাত্রায় আমরা বাস বৃদ্ধির চেষ্টা করবো, সেই সাথে প্রশাসনের সর্বোচ্চ সহযোগিতা থাকবে।”
জকসু পরিবহন সম্পাদক মাহীদ হাসান বলেন, “আমার আমাদের ভাই-বোনদের নিরাপত্তার স্বার্থে সর্বোচ্চ সহযোগিতা হাত বাড়িয়ে দিতে প্রস্তুত। সেই সাথে যেকোনো ধরনের পরিবহন সহয়তায় আমরা বদ্ধপরিকর। আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, ভবিষ্যতে বাস বৃদ্ধি সহ আনুষাঙ্গিক বিষয় আমরা কাজ করব”
সেমিস্টার, ক্লাস-পরীক্ষার ব্যস্ততা আর নগরজীবনের ক্লান্তি পেছনে ফেলে প্রিয়জনদের কাছে ফেরার এই যাত্রা যেন জবি শিক্ষার্থীদের কাছে শুধু বাড়ি ফেরা নয়, বরং এক টুকরো শান্তি, আবেগ আর উৎসবের প্রতীক্ষার নাম। দীর্ঘ ভোগান্তির শঙ্কা ছাড়াই স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে পেরে আনন্দ ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন তারা। পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে ঘরমুখো শিক্ষার্থীদের মুখে ছিল স্বস্তির হাসি।