ঢাকা | রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নজরুলের 'বিদ্যাপতি' নাটক তাঁর প্রেমের পবিত্রতার এক অতুলনীয় প্রতিমূর্তি

author
আবদুল মালেক শাহ্

প্রকাশিত : ২৪ মে, ২০২৬ সকাল ৮:১৩
ad003
কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের সাহিত্যের আকাশে এক বহুজ্যোতিষ্ক নক্ষত্র। তাঁকে আমরা (পাঠকরা) কেবল বিদ্রোহী কবি কিংবা লেখক হিসেবে চিহ্নিত করলে তা চরম ভুল হবে। তাঁর কাব্য, গান, প্রবন্ধের মতো নাট্যরচনাও বহুমাত্রিক — সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্য, বিদ্রোহী চেতনা ও মানবিকতার সংমিশ্রণে দীপ্ত। 'বিদ্যাপতি' তাঁর নাট্যজগতে এক বিশেষ সংযোজন, যেখানে তিনি উপস্থাপন করেছেন শৃঙ্গার, ভক্তি ও সংস্কৃতি — এই তিনটির এক আশ্চর্য মিশ্রণ। এই নাটকে নজরুল কেবল একটি ঐতিহাসিক চরিত্রের জীবনকে পুনরুজ্জীবিত করেননি, বরং প্রেমের এক অনন্য পবিত্র রূপকে শিল্পের মাধ্যমে অমর করে তুলেছেন।

এই নাটিকার মূল চরিত্র বিদ্যাপতি — যিনি শুধু একজন কবি নন, বরং একজন অনুভবদর্শী, প্রেমিক ও ঈশ্বরান্বেষী মানুষ। নজরুলের 'বিদ্যাপতি' রচিত হয়েছে মধ্যযুগীয় বৈষ্ণব সাহিত্যকে কেন্দ্র করে (১৯৩৮ সালে) এবং একই বছরে এটি মঞ্চস্থ হয়েছে। নজরুল এই নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন পঞ্চদশ শতাব্দীর মিথিলার সেই কবিকে, যিনি শৃঙ্গার-ভাবনির্ভর রাধাকৃষ্ণ প্রেমকে কাব্যে রূপ দিয়েছেন জাদুর মন্ত্রধ্বনির মতো। মূলত বিদ্যাপতির পদাবলি বাংলা, মৈথিলি ও ব্রজবুলি ভাষার সমন্বয়ে রাধা-কৃষ্ণের স্বর্গতুল্য প্রেমের এক অকৃত্রিম দলিল। তবে নজরুল শুধু ইতিহাসের অনুকরণ করেননি — তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে বিদ্যাপতি হয়ে উঠেছেন এক মানবিক, সংগ্রামী ও প্রেমমিশ্রিত ভক্তিকবি।

নাটকের কাহিনির সূচনায় পরিচয় মেলে — বিদ্যাপতি একজন রাজদরবারের কবি। তাঁর কাব্য একদিকে রসনিমগ্ন, অন্যদিকে ভক্তিমূলক। কিন্তু হঠাৎ রাজশক্তি প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় তাঁর কাব্যিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, যা বিদ্যাপতির মনে গভীর আক্রোশের সৃষ্টি করে। কেননা বিদ্যাপতি মনে করেন — কবিতা কারও দাস নয়, কবিতার নিজস্ব স্বাধীনতা রয়েছে; কবিতা প্রকৃতির মতোই স্বাধীনভাবে বিচরণ করে — যার সামনে কেউ বাধা হয়ে দাঁড়ানোর অধিকার রাখে না।

নজরুল এখানে কেবল বিদ্যাপতির কাহিনি বলেননি, বরং তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিকে চরিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন — জলরাশির মাঝে পদ্মফুলের মতো, যা দূর থেকেও মানুষকে আকৃষ্ট করে এবং একবার হলেও যাকে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। নজরুলের মতে সৃজনের স্বাধীনতাই সর্বোচ্চ মানবিক অধিকার। তিনি তাঁর সৃষ্ট কেন্দ্রীয় চরিত্র বিদ্যাপতির মধ্যে পাঁচটি সত্তার সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন — প্রেমিক, ভক্ত, কবি, সত্যসন্ধানী মানুষ এবং বিদ্রোহী। পাশাপাশি নজরুল তাঁকে করেছেন গভীরভাবে মানবিক। তাঁর প্রেম পবিত্র, তাঁর ঈশ্বরভক্তি মুক্ত এবং তাঁর কাব্য স্বাধীনতার প্রতীক।

অপরদিকে এই নাটকের নারী চরিত্রগুলো রাধাস্বরূপ — প্রেমে নিবেদিত, কিন্তু নিস্তরঙ্গ নয়। তাঁদের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রেম ও ভক্তি — দুটোরই রূপ উঠে আসে। রাজা প্রতীকী — সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক। তিনি বিদ্যাপতির স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করতে চান, যা কবির মননকে বন্দি করে। ধর্মকে তারা ব্যবহার করে ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে। নজরুল তাঁদের মাধ্যমে দেখান — ইহজগতে বাস্তবিক অর্থে ধর্মের মূল মর্ম প্রেম নয়, বরং তা প্রায়শই ক্ষমতার খেলায় পরিণত হয়। চরিত্রগুলো বাস্তবধর্মী না হয়ে প্রতীকধর্মী, যা নাটকটিকে রূপকধর্মী (অ্যালেগোরিক্যাল) মাত্রা দেয়।

ঘটনাপ্রবাহে দেখা যায় ঐতিহাসিক বিদ্যাপতির জীবনে লছিমা (রাজা শিব সিংহের প্রিয়তমা স্ত্রী)  নামক এক নারীর উল্লেখ পাওয়া যায়, যার প্রেম কবিকে অনুপ্রাণিত করেছিল কিন্তু কখনও উতলা কিংবা মাতাল করেনি। নজরুল এই চরিত্রটিকেও তাঁর নাটকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। লছিমার প্রতি বিদ্যাপতির প্রেম এবং সেই প্রেমের পরিণতি — এই দুটি সূত্র ধরেই নাটকের মূল বিষয়বস্তু সামনের দিকে এগিয়ে চলে।

বিদ্যাপতি যখন ক্রমান্বয়ে লছিমাকে ভালোবাসতে শুরু করেন , সেই ভালোবাসার মধ্যে প্রথমে থাকে কবির সৌন্দর্যতৃষ্ণা  অর্থাৎ যা  একজন শিল্পীর চোখে নারীর সৌন্দর্য দেখার অনন্য আকুতি। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই প্রেম হয়ে ওঠে বেশ গভীর। পরবর্তীতে তা পরিপক্ক হয়, এবং শেষ পর্যন্ত তা পার্থিব সীমা অতিক্রম করে দিব্য প্রেমের রূপ ধারণ করে।

মূলত, এই রূপান্তরের প্রক্রিয়াটিই নাটকের সবচেয়ে মনোজ্ঞ দিক। এর মাধ্যমে নজরুল দেখাতে চেয়েছেন যে সত্যিকারের প্রেম কখনো ক্ষয় হয় না — এটি কেবল পরিস্থিতি অনুসারে রূপ বদলায় মাত্র। লছিমার সাথে মিলনের মুহূর্তগুলো যেমন বিদ্যাপতিকে আনন্দে বিমোহিত করে, বিচ্ছেদের বেদনা তেমনি তাঁকে গভীরতর করে তোলে এবং তাঁর হৃদয় মন্দিরে রক্তক্ষরণ হয় । এবং সেই গভীর ক্ষত  থেকেই জন্ম নেয় তাঁর শ্রেষ্ঠ পদাবলি। প্রেম এখানে শুধু অনুভূতি নয় — এটি সৃষ্টির এক অনন্য উৎস।

"প্রিয়া যখন দূরে থাকে, তখন তার স্মৃতি কবির বুকে এক অনির্বাণ দীপশিখা হয়ে জ্বলে। সেই আলোতেই কবি খুঁজে পায় তার সৃষ্টির পথ।"

বলতে গেলে নজরুল এই নাটকে বৈষ্ণব দর্শনের একটি মূল তত্ত্বকে নাটকীয় রূপ দিয়েছেন — বিরহ হলো প্রেমের আসল পরিপূর্ণতা। নজরুল ইঙ্গিত করেছেন বিরহে প্রেম ঔজ্বল্যতা ফিরে পায় আর মিলনে মলিন হয়।  রাধা ও কৃষ্ণের মিলন যেমন সুন্দর, বিরহও তেমনি মায়াবী  — কারণ বিরহ মানে প্রেমাস্পদকে মনে রাখা, প্রেমকে টিকিয়ে রাখা এবং পরস্পরকে (প্রেমিক-প্রেমিকা) ভালোবাসতে থাকা। বিদ্যাপতির জীবনেও এই বিরহ-দর্শন কার্যকর। লছিমার সাথে বিচ্ছেদ তাঁকে ভেঙে দেয় না — বরং তাঁকে নতুনভাবে গড়ে তোলে স্বর্ণাকারের সোনা পোড়ানোর মতো করে। 

'বিদ্যাপতি' নাটকে কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র লছিমার চরিত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এইনাটকে  নজরুল তাঁকে কেবল একজন প্রেমিকা হিসেবে নয়, প্রেমের পবিত্রতার চমকপ্রদ প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। লছিমা বিদ্যাপতিকে কেবল গভীরভাবে ভালোবাসেন তার না, ভালোবাসেন নিঃস্বার্থভাবে। তাঁর প্রেমে কোনো সচরাচর প্রেমিকাদের দাবি নেই, পক্ষ নেই এবং নেই কোনো শর্ত।  আছে শুধু ভালোবাসার স্রোত বয়ে চলা এক চলন্ত নদী। তাঁর (লছিমা) কাছে বিদ্যাপতির সুখ ও সৃষ্টিই তাঁর একমাত্র কাম্য। তাঁর কাছে কবিকে কাছে পাওয়ার চেয়েও দেখার স্বাদ ছিল বেশি। 

লছিমার এই নিঃস্বার্থ প্রেম বাংলা সাহিত্যের অন্যতম মহৎ নারীচরিত্রের এক চিরায়ত উজ্জ্বল উজ্জীবিত নির্মাণ। তিনি বিদ্যাপতিকে মন-প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসলেও তিনি জানেন যে বিদ্যাপতি জাতির একজন মহান কবি — তাঁর জীবন শুধু একটি ব্যক্তিগত প্রেমের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকতে পারে না। তাই লছিমা কখনো বিদ্যাপতিকে কাছে টেনে  তাঁর সৃষ্টি থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করেন না — বরং তিনি তাঁর কবিসত্তাকে আরও বিকশিত হতে প্রতি মুহূর্ত অনুপ্রেরণা জোগালেন।

নজরুলের এই লছিমা চরিত্রে রবীন্দ্রনাথের 'বিসর্জন'-এর অপর্ণার ছায়া কিছুটা অনুভব করা যায় — তিনি-ই প্রকৃত নারী যিনি যিনি প্রিয়জনের বৃহত্তর উদ্দেশ্যের কাছে নিজের সুখকে বিসর্জন দিতে পারেন। কিন্তু লছিমা শুধু ত্যাগের প্রতীক নন — তিনি শক্তির প্রতীকও। তাঁর উপস্থিতি বিদ্যাপতিকে দুর্বল করে না, তাঁকে শক্তিশালী করে এবং নবসৃষ্টে উৎসাহিত করে প্রতি মুহূর্তে। এটাই প্রেমের সত্যিকারের শক্তি।নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিদ্যাপতির মধ্যে সবসময় একটি দ্বন্দ্ব চলতে থাকে — তা হলো কবি সত্তা ও প্রেমিকের সত্তার । বিদ্যাপতি প্রায়ই এক সিদ্ধান্তহীনতায় থাকেন। কবি হিসেবে তিনি চান সৃষ্টির একাকিত্ব, ধ্যান ও অন্তর্মুখী জীবন পার করার আর প্রেমিক হিসেবে তিনি চান তাঁর প্রিয়তমা লছিমার সান্নিধ্য, মানবিক উষ্ণতা ও সংযোগ। আপাতদৃষ্টিতে,  এই দু’টি চাওয়া স্ব-বিরোধী মনে হলেও নজরুল দেখিয়েছেন যে আসলে এ দুটি একটি মুদ্রার দুটি দিক মাত্র-যা একটির অনুপস্থিতিতে আরেকটি অস্তিত্বহীন লছিমার প্রতি বিদ্যাপতির প্রেম তাঁর কবিত্বকে নষ্ট করে না — বরং তা সমৃদ্ধ ও নবজাগরণে রূপ নেয়। 

লছিমার ভালোবাসা না পেলে তিনি হয়তো জাতিগতভাবে শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত হতেন, কিন্তু জগতের মহান কবি হতে পারতেন না। প্রেমই তাঁর মধ্যে জাগিয়ে দিয়েছে সেই সংবেদনশীলতা যা ছাড়া মহৎ সাহিত্য সম্ভব নয়। নজরুলের 'বিদ্যাপতি' নাটকে প্রেমকে কখনো সহজ পথে এগোতে দেওয়া হয়নি।কেননা তাঁদের দু’জনের প্রেমের পথে  রাজদরবারের ষড়যন্ত্র, সামাজিক বাধা ও রাজনৈতিক চাপ প্রতিনিয়ত বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আর নজরুল এই বাধাগুলোকে শুধু নাটকীয় সংঘাত তৈরির জন্য ব্যবহার করেননি — এর মধ্য দিয়ে তিনি একটি গভীর সামাজিক সমালোচনাও করেছেন। সচরাচর বিবাহিত নারীর সাথে অন্য পুরুষের প্রেমকে পরকীয়া হিসেবে নেতিবাচকভাবে নিলেও লছিমার প্রতি বিদ্যাপতির প্রেম তার বিপরীতে। পরকীয় প্রেম আটকায় মূলতঃ দেহের মায়ায় নতুবা পরস্পরকে কাছে পাওয়া। কিন্তু তাঁদের প্রেম স্বর্গীয় প্রেমের মতো ই পবিত্র। মিথিলার রাজদরবারে বিদ্যাপতির প্রতিপক্ষরা সবসময় তাঁর প্রেমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। 

তারা বিদ্যাপতির প্রেমকে দুর্বলতা মনে করে — এবং এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে কবিকে প্রতি মুহূর্তে ধ্বংস করতে চায়। কিন্তু নজরুল দেখান যে প্রেম আসলে দুর্বলতা প্রতীক না  নয় বরং  এটিই কবির সবচেয়ে বড় শক্তি যে শক্তিকে কবিকে নব শক্তির জোগায়।  যতবার বিদ্যাপতির প্রেমকে আঘাত করা হয়, ততবারই তিনি সেই আঘাত থেকে নতুন সৃষ্টির শক্তি সঞ্চয় করেন বিগলিত সোনা তার সত্যিকারের রূপ ধারণ করে। আবার চিন্তা করলে। এই দিক থেকে 'বিদ্যাপতি' নাটকটি একটি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে — পবিত্র প্রেম রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছে পরাজিত হয় না বরং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ই প্রেমের কাছে হার মানে। প্রেমের অপরাধে প্রেমিককে রাজা তাঁর প্রাসাদে বন্দী করতে পারেন, শত্রু তাঁকে হয়তো সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে পারে — কিন্তু হৃদয়ের গভীরে যে প্রেম জ্বলে, তা নেভানো কখনও সম্ভব নয়। নজরুলের এই বার্তা তাঁর নিজের জীবনদর্শনেরও প্রতিফলন — তিনি নিজেও বিশ্বাস করতেন যে প্রেম ও সৃষ্টির শক্তি যেকোনো দমন-পীড়নের চেয়ে ধারালে। লছিমার প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতেও নজরুলের প্রগতিশীল চিন্তার এক স্পষ্ট চাপ প্রকাশ পায় । নজরুলের দেখিয়েছেন,  যে সমাজ নারীর প্রেমকে সন্দেহের চোখে দেখে, তার বিরুদ্ধে লছিমার মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো — এটি কেবল ব্যক্তিগত সাহসের গল্প নয়, এটি নারীমুক্তির একটি রাজনৈতিক অঙ্গভঙ্গিও। 'বিদ্যাপতি' নাটককে সম্পূর্ণভাবে বুঝতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই নজরুলের নিজের প্রেমদর্শনকে জানতে হবে। 

নজরুল বিশ্বাস করতেন যে প্রেম হলো সেই শক্তি যা মানুষকে সৃষ্টিশীল করে,বিকশিত করে, সংকীর্ণতার উপরে উঠতে সাহায্য করে এবং শেষে  ঈশ্বরের সান্নিধ্যে নিয়ে যায়। আমর যদি তাঁর নিজের জীবনে একটু আলোকপাত করি তাহলে দেখা যাবে তাঁর  একাধিক গভীর প্রেমের অভিজ্ঞতা ছিল — নার্গিসের সাথে প্রথম প্রেম, প্রমীলার সাথে বিবাহ — এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর প্রেমদর্শনকে আকার দিয়েছে।নজরুলের প্রেমের গানে যে বৈচিত্র্য আছে — তা ভক্তিমূলক থেকে পর্যায়ক্রমে  রোমান্টি এবং বিরহের থেকে মিলনের — তা তাঁর প্রেম সম্পর্কে গভীর ও বহুমাত্রিক বোঝাপড়ার প্রমাণ। 'বিদ্যাপতি' নাটকে তিনি এই বহুমাত্রিকতাকেই প্রকাশ করেছেন। এখানে নজরুল প্রেমকে চিত্রিত করেছেন একসাথে আনন্দ ও বেদনা, শক্তি ও দুর্বলতা, পার্থিব ও অপার্থিব,ভয় ও জয়ে । 

বিশেষ করে নজরুলের সূফী মনেভাবের প্রভাব এই নাটকে স্পষ্ট। প্রকৃতপক্ষে, সূফী দর্শনে প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্ককে সাধক ও ঈশ্বরের সম্পর্কের রূপক হিসেবে দেখা হয়। এই নাটকে  বিদ্যাপতির বৈষ্ণব ভক্তি ও নজরুলের সূফী চেতনা মিলিত হয়ে একটি অনন্য প্রেমতত্ত্ব তৈরি করেছে — যেখানে নজরুল ফুটিয়ে তুলেছেন  মানুষের প্রেম ও ঈশ্বরের প্রেম ভিন্ন না, তা একই নদীর দুটি ধারা। কাজী নজরুল ইসলামের 'বিদ্যাপতি' নাটক বাংলা নাট্যসাহিত্যে প্রেমের পবিত্রতার যে প্রতিমূর্তি গড়ে তুলেছে, তা আজও অমলিন। পরিশেষে বলা যায়, নজরুলের 'বিদ্যাপতি' নাটক তাঁর সামগ্রিক সৃষ্টিকর্মের একটি বিশেষ মুকুট হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে । দ্রোহের কবি নজরুল এই নাটকে এসে হলেন কোমল, অনুভূতিপ্রবণ ও আধ্যাত্মিক। প্রেমের শক্তিতে বিশ্বাসী এই নজরুলই হয়তো তাঁর সত্যিকারের পরিচয় — যিনি জানতেন যে পৃথিবী বদলাতে হলে শুধু বিদ্রোহ নয়, ভালোবাসাও লাগে।

আবদুল মালেক শাহ্

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT