দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে রাজধানী ঢাকার অন্যতম সহজ যোগাযোগের মাধ্যম হচ্ছে আরিচা-কাজিরহাট এবং পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুট। এ দুই নৌরুট দিয়ে ঈদের এ সময়ে অন্যান্য সময়ের চেয়ে যানবাহনের কয়েকগুণ চাপ বৃদ্ধি পায় বলে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ জানিয়েছে। ফলে, ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদেরকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
তবে, যাত্রীদের এ ভোগান্তি লাঘবে জন্য আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে ৫টি ফেরি, ১২টি লঞ্চ ও ৬৫টি স্পিডবোট এবং পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭টি ফেরি এবং ২০ট লঞ্চ চলাচল করবে। এ সময় প্রাকৃতিক বড় ধরনের কোন সমস্যা না হলে পর্যাপ্ত ফেরি, লঞ্চ ও স্পিডবোট চলাচল করায় এবারের পবিত্র ঈদুল আজহায় উক্ত দুই নৌরুট কোন সমস্যা হবে না বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন সংশ্লিষ্টরা।
বিআইডব্লিউটিসি’র আরিচা আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নিশ্চিত করতে আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে ছোট-বড় মিলিয়ে ৫টি এবং পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭টি ফেরি চলাচল করবে। আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে যানবাহনের মধ্যে বেশিরভাগ ট্রাক আর ছোট গাড়ি পারাপার হয়ে থাকে। দুইটি নৌরুটে ঈদের আগে ও পরে ট্রাক পারাপার বন্ধ থাকবে। তবে, জরুরি পণ্য ও পশুবাহী যানবাহন পারাপার করা হবে। এছাড়া, ফেরির যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামতের জন্য পাটুরিয়া ঘাট এলাকায় ভাসমান কারখানা মধুমতি প্রস্তুত রয়েছে।
আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে নৌরুটের চ্যানেলের দূরত্ব ১৬ কিলোমিটার। একেকটি ফেরি গন্তব্য পৌছাতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা করে সময় লাগে। তবে, যমুনায় চর পড়ার কারণে ফেরিগুলোকে ৬কিলোমিটার পথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে। নাব্যতা সংকটের কারণে ঘুর পথে ফেরি চলাচল করায় বেশি সময় লাগছে। ফেরি ছাড়াও এ নৌরুটে লঞ্চ ও স্পিডবোট সার্ভিস রয়েছে।
পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ১৭টি ফেরির মধ্যে ৯টি রো-রো, ৮ মাঝারি-ছোট ফেরি চলাচল করবে। এ নৌরুটের চ্যানেলের দূরত্ব তিন কিলোমিটার। বর্তমান সময়ে ফেরির আকারভেদে পার হতে সময় লাগছে ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে আরও জানা গেছে, আরিচায় ২টি, কাজিরহাট ২টি, পাটুরিয়ায় ৫টি এবং দৌলতদিয়ায় ৩টি ফেরি ঘাট রয়েছে। এ সকল ঘাটের সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। এছাড়া, ঘাটে কোন সমস্যা হলে তা তাৎক্ষণিক সমাধানের জন্য জনবল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
পাটুরিয়া ঘাটে ফেরির অপেক্ষায় থাকা গোল্ডেন লাইন পরিবহনের চালক আবুল কাশেম বলেন, “পদ্মা সেতু চালুর পর স্বাভাবিক সময়ে ফেরি পেতে এখন আর তেমন সিরিয়ালে থাকতে হয় না। তবে, ঈদের এ সময়ে ভিড় বাড়ায় পারাপারের জন্য কিছু সময় সিরিয়ালে থাকতে হয়।
ফেরি পার হতে আসা মোশারফ হোসেন বলেন, ফেরি সংকট না হলে নৌরুটে তেমন ভোগান্তি হয় না। আগের তুলনায় নৌরুটে অনেক চাপ কমেছে। ঈদ মৌসুমে ভিড় বৃদ্ধি পেলেও পর্যাপ্ত ফেরির কারণে ভোগান্তি না হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ফেরির যাত্রী পরিবহনে অতিরিক্ত অর্থ আদায় যাতে না হয় সে বিষয়টি লক্ষ্য রাখার জন্য অনুরোধ করছি।
আরিচা ঘাটের ব্যবস্থাপক আবু আবদুল্লাহ বলেন, ‘আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে ঈদের সময় ব্যক্তিগত ছোট গাড়ির চাপ বেড়ে যায়। তবে ছয়টি ফেরি চলাচল করায় তেমন কোনো ভোগান্তি হবে না বলে আশা করছি। বর্তমানে এ নৌরুটে ৫টিা ফেরি চলাচল করছে। দুই পারের ২টি করে মোট ৪টি ফেরি ঘাট সচল রয়েছে।’
বিআইডব্লিউটিসি আরিচা কার্যালয়ের ডিজিএম (বাণিজ্য) মোহাম্মদ সালাম হোসেন বলেন, ‘ঈদকে সামনে রেখে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে যানবাহন ও যাত্রী পারাপারে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক কোন দুর্যোগ না হলে এই নৌরুটে পর্যাপ্ত ফেরি চলাচল করায় যাত্রীদের ভোগান্তির কোনো শঙ্কা নেই। যানবাহন লোড-আনলোডের জন্য পাটুরিয়ায় ৫টি এবং দৌলতদিয়ায় ৩টি ঘাট প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’
মানিকগঞ্জ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারোয়ার আলম বিপিএম বলেন, পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ও আরিচা-পাটুরিয়া ঘাট এলাকায় যাত্রী এবং যানবাহনের নিরাপত্তায় জেলা পুলিশ, নৌপুলিশ, হাইওয়ে পুলিশের প্রায় সাড়ে সদস্য কাজ করবে। এর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় র্যাব, কোস্টগার্ড, আনসার বাহিনী মোতায়েন করা থাকবে। আমাদের সকল প্রস্তুতি প্রায় শেষে। যাত্রীদের নিরাপদে বাড়ি ফেরার জন্য সংশ্লিষ্ট এ সকল বাহিনী কাজ করবে। এছাড়া, এবার মাননীয় নৌপরিবহণ প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের নির্দেশনা রয়েছে যে, দুর্ঘটনা গাড়ি ফেরিতে উঠার আগে সকল যাত্রীদেরকে গাড়ি থেকে নেমে যেতে হবে। এরপর গাড়ি ফেরিতে উঠার পর যাত্রীরা যার যার সিটে গিয়ে বসবে এমন নির্দেশনা রয়েছে।
শিবালয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার মনিষা রানী কর্মকার বলেন, আসন্ন ঈদুল আজহায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এবং আরিচা-কাজিরহাট নৌরুট দিয়ে পার হয়ে থাকেন। ঈদে ঘরমুখো মানুষের নির্বিঘ্নে যাতায়াত ও সার্বিক সেবা দেওয়ার জন্য মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় এবং জেলা প্রশাসনের নির্দেশ মোতাবেক আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, আমরা বিআইডব্লিউটিসি, বিআইডব্লিউটি’র প্রধান, রাজনৈতিক নের্তৃবৃন্দ, লঞ্চ, স্পিডবোট, পরিবহণ মালিক সমিতি’র নের্তৃবৃন্দদেরকে নিয়ে সমন্বয় সভা করেছি। এছাড়া নদী ভাঙনের কারণে পাটুরিয়া লঞ্চ ঘাট সরিয়ে কড়াই তলায় নিয়ে আসা হয়েছে। যেটা ইতমধ্যে মাননীয় নৌপরিবহণ প্রতিমন্ত্রী নিজে এসে দেখে গেছেন। এছাড়া, কাজে কোন গাফলতি থাকলে প্রথমে ওই এলাকার সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রধানকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসার নির্দেশনা রয়েছে। গত শুক্রবার জেলা প্রশাসক স্যার ঈদ উপলক্ষে পাটুরিয়া ঘাটের প্রস্তুতি দেখে গেছেন। এছাড়া নৌপুলিশ, কোষ্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস, মেডিকেল টিমসহ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটগণ সার্বক্ষণিক দায়ীত্ব পালন করবেন। ঈদের আগে এবং পরে আমাদের মোবাইল টিম সার্বক্ষণিক স্ট্যান্ড বাই থাকবে। যাতে লঞ্চ, স্পিডবোট এবং পরিবহণে ভাড়া বেশী নিলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমাদের সার্বিক প্রস্তুতি প্রায় শেষ। এবারের ঈদ যাত্রায় কোন ধরনের সমস্যা হবে না বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।