বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার পশ্চিম জলিরপাড় গ্রামে যাতায়াতের উপযোগী কোনো সড়ক না থাকায় গুরুতর অসুস্থ এক রোগীকে বাঁশের সঙ্গে নেট বেঁধে কাঁধে করে প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ বহন করে সড়কে নিতে হয়েছে পরিবারের সদস্যদের। সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ওই রোগীর মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকটকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার পশ্চিম জলিরপাড় গ্রামের বাসিন্দা মোনাই অধিকারী (৬০) দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। শুক্রবার রাতে হঠাৎ তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। কিন্তু গ্রামের সঙ্গে মূল সড়কের সরাসরি কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে পরিবার বাধ্য হয়ে তাকে বাড়িতেই রেখে প্রাথমিক সেবা দেওয়ার চেষ্টা করে।
পরদিন শনিবার সকাল ১১টার দিকে পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা বাঁশের সঙ্গে নেট বেঁধে অস্থায়ী বহনের ব্যবস্থা করেন। এরপর কাঁধে করে প্রায় দেড় কিলোমিটার দুর্গম পথ অতিক্রম করে তাকে কোদালধোয়া-বড়মগড়া সড়কের দয়াল ওঝার দোকান সংলগ্ন এলাকায় নিয়ে আসেন। সেখান থেকে ভ্যানে করে তাকে আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় রেফার করেন। পরে ঢাকায় নেওয়া হলেও চিকিৎসা শুরু হতে বিলম্ব হওয়ায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেছেন।
নিহতের স্ত্রী রিনা অধিকারী বলেন, “রাতে অসুস্থ হওয়ার পর যদি দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার মতো রাস্তা বা যানবাহনের ব্যবস্থা থাকত, তাহলে হয়তো আমার স্বামীকে বাঁচানো সম্ভব হতো।”
স্থানীয়রা জানান, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একই গ্রামের বাসিন্দা ব্রজেন হালদারের স্ত্রী কুমদিনী (৯০) হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাকেও টিনের চাদরের ওপর বসিয়ে কাঁধে করে প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ হেঁটে মূল সড়কে নিয়ে যেতে হয়েছিল। পরে সেখান থেকে ভ্যানে করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
গ্রামের বাসিন্দা মালা হালদার ও গোলাপী হালদার বলেন, বর্ষা মৌসুমে এলাকার দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। কাদা ও জলাবদ্ধতার কারণে চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়ে। অনেক সময় নৌযান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে। ফলে শিক্ষার্থী, রোগী ও সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়।
স্থানীয় ইউপি সদস্য পরিমল হালদার বলেন, পশ্চিম জলিরপাড় এলাকায় সড়ক নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিনের। তবে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় এখনো কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয়ভাবে মাটি ভরাটের ব্যবস্থা করা গেলে পরবর্তীতে হেরিংবন্ড বা স্থায়ী সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিখন বণিক বলেন, “পশ্চিম জলিরপাড় গ্রামের যোগাযোগ সমস্যার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। দ্রুত সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও মৌলিক যোগাযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত পশ্চিম জলিরপাড়ের বাসিন্দারা। জরুরি চিকিৎসা, শিক্ষা ও দৈনন্দিন চলাচলের স্বার্থে দ্রুত একটি টেকসই সড়ক নির্মাণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।