ঢাকা | রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হোক আনন্দ, আবিষ্কার ও মানবিকতার আশ্রয়স্থল

author
এ ইউ দৌলা

প্রকাশিত : ২৫ মে, ২০২৬ সকাল ১১:৩৩
ad003
আমার সন্তান আমার জীবনের সেরা সম্পদ, আর শিশুরা জাতির সেরা বিনিয়োগ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আসলেই কি আমরা এই সত্যটিকে গুরুত্ব দিচ্ছি?

আজকের দিনে একটা জুতার ব্র্যান্ড কিংবা সাবানের বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, দেশের টকশো বা মূলধারার আলোচনায় শিশুদের শিক্ষা নিয়ে তার চার ভাগের এক ভাগও কথা বলতে দেখা যায় না। এটাই ‘কলোনিয়াল হ্যাংওভার’ বা ঔপনিবেশিক মানসিকতার এক নির্মম অভিশাপ।

আমাদের শিশুরা আজও বড় স্বপ্ন দেখতে শিখছে না। পরাধীন ঔপনিবেশিক আমলের মানুষ হিসেবে আমাদের বাবা-দাদা ও পূর্বপুরুষেরা যেমন কেবল ব্রিটিশ বা পাকিস্তানি প্রভুদের অধীনে একটা 'কেরানির চাকরি' পাওয়ার সংকীর্ণ উদ্দেশ্যে পড়াশোনা করতেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আজও যেন হুবহু সেই একই দাসত্বমূলক মানসিকতার ফাঁদে আটকে রয়েছে। আমরা শুধু জিপিএ-৫ আর মুখস্থবিদ্যার পেছনে ছুটছি, কিন্তু উদ্ভাবনী মানুষ তৈরি করতে পারছি না।

এর বাস্তব প্রমাণ, আজও বাংলাদেশের পোশাক খাত, তথ্যপ্রযুক্তি, বহুজাতিক কোম্পানি এবং বড় বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ নির্বাহী (CEO) বা উচ্চপদস্থ কারিগরি ও ব্যবস্থাপক পদে শ্রীলঙ্কা, ভারত, পাকিস্তান বা পশ্চিমা দেশের নাগরিকেরা বসে আছেন। আমাদের দেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা রেমিট্যান্স হিসেবে তারা নিয়ে যাচ্ছেন, কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা উচ্চ দক্ষতার দূরদর্শী নেতৃত্ব (Visionary Leadership) তৈরি করতে পারছে না।

অথচ, শুধু বড় স্বপ্ন দেখা এবং আপন কাজের  'মৌলিকত্ব' ও 'কোয়ালিটি' ধারণ করার কারণে বিশ্ব আজ কত দূর এগিয়ে গেছে! এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে তৈরি করা হার্ডিঞ্জ ব্রিজের সামনে দাঁড়ালে আজও ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারদের দূরদর্শিতা ও কাজের মানের প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। তারা এমন সেতু তৈরি করেছিলেন যা একশো বছর পরেও শত শত ট্রেনের ভার অনায়াসে সয়ে যাচ্ছে। ১৯১৫ সালের দিকে ব্রিটেন ও ইউরোপের দেশগুলো 'ট্যাংক' আবিষ্কার করছিল। প্রায় এক হাজার বছর আগে ভাইকিং, পলিনেশিয়ান ও ব্রিটিশ নাবিকেরা  সাধারণ কাঠের পালতোলা নৌকা নিয়ে দিগন্তহীন প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরের উত্তাল তরঙ্গ পাড়ি দিয়ে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো নতুন নতুন মহাদেশের সন্ধান করছিল। সেসব জাতির অন্তরে যে মূল চালিকাশক্তি ছিল তা হল বড় স্বপ্ন দেখার মানসিকতা।
কিন্তু আজ জ্ঞান-বিজ্ঞানের অবারিত সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও আমরা কি সত্যিই বৈশ্বিক পর্যায়ে গত ৫০ কিংবা ১০০ বছরে মৌলিক কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার বা প্রযুক্তিগত বিপ্লব ঘটাতে পেরেছি? আমরা কি আমাদের জাতির জন্য একটি স্বাবলম্বী শাসনব্যবস্থা, যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা কিংবা বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা সৃষ্টি করতে পেরেছি? সম্ভবত না। আমরা আজও অন্যদের তৈরি করা প্রযুক্তি ও চিন্তাভাবনা ধার করে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখছি। এর মুল কারণ, আমাদের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিশুদের চিন্তার স্বাধীনতা এবং সৃষ্টিশীলতাকে গলা টিপে দেয়া হচ্ছে। যতক্ষণ না আমরা শিশুদের কেরানি হওয়ার বৃত্ত থেকে বের করে বিশ্বজয়ী উদ্ভাবক হওয়ার স্বপ্ন দেখাব, ততক্ষণ প্রকৃত মুক্তি, উন্নয়ন আর নিরাপত্তা কোনটাই সম্ভব নয়।

প্রিয় পাঠকদের প্রতি অনুরোধ, আপনি যদি সত্যিই দেশের প্রকৃত উন্নয়ন চান, তবে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কথা বলুন, আলোচনা ও বিতর্ক করুন, টকশো বা পোস্ট দিন। প্রতিটি স্কুলে গিয়ে নিজে চোখে দেখুন, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কেমন পরিবেশে কী শিখছে।

কিছুদিন আগে ঢাকার মোহাম্মদপুরের একটি স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়েছিলাম। বেশ কয়েকটি বড় ভবন নিয়ে স্কুলটি তৈরি হলেও সেখানে ১০-১২ হাজার শিক্ষার্থী আর অভিভাবকদের ভিড়, সরু রাস্তা, গাড়ির তীব্র হর্ন ও চারদিকের হট্টগোল দেখে মনটা দমে গেল। সামান্য তিন কাঠা মাঠের মধ্যে শিশুরা গিজগিজ করছে, প্রতি ক্লাসরুমে শতাধিক শিক্ষার্থী! তীব্র শব্দদূষণে পাশে দাঁড়ানো শিক্ষিকার কথাও শোনা যাচ্ছিল না। ঢাকা শহরের অন্যতম সেরা স্কুলেরই যদি এই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা হয়, তবে এই পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুর মাঝে নৈতিকতা, মানবিকতা আর সহনশীলতা গড়ে ওঠা কি আদেও সম্ভব?

সরকারের প্রতি আবেদন, এমন একটি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলুন যেখানে শিক্ষকেরা আসবেন দেশের সেরা মেধাবীদের মধ্য থেকে। তাদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা এমন উচ্চতায় নিয়ে যান, যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্রটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়াকে জীবনের লক্ষ্য বানান। প্রতিটি স্কুলে একই মান, খেলার মাঠ, সবুজ প্রকৃতি ও শান্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে আগামী ২০ বছরের মহাপরিকল্পনা নিন। এমন ব্যবস্থা করুন যেখানে শিশুরা সকালে স্কুলে এসে সারাদিন কাটাবে; তাদের পড়াশোনা, খেলাধুলা, খাবার ও বিশ্রামের ব্যবস্থা স্কুলেই থাকবে। বাড়িতে পড়াশোনার কোনো চাপ থাকবে না, সন্ধ্যায় তারা বাবা-মায়ের কাছে ফিরে শুধু আনন্দময় সময় কাটাবে। প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তক, গল্প ও ছবি কেমন হবে, তা নির্ধারণের জন্য দেশের বিজ্ঞ সাইকোমেট্রিশিয়ান (Psychometrist) ও শিশুমনস্তত্ত্ববিদদের দায়িত্ব দিন। একটি শিশু যে শব্দটি পড়ে, শোনে বা দেখে, তার প্রতিটি উপাদানই তার মস্তিষ্ক গঠনের নিয়ামক। ভুল কথা, ভুল শব্দ ও ভুল দৃশ্য শিশুর অন্তরে বিষের মতো কাজ করে; তাই পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং পাঠ্যসূচির সঠিক পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি। পড়াশোনা যেন শিশুর ওপর মানসিক চাপ না হয়ে, তার ভেতরের সুপ্ত প্রতিভাকে আবিষ্কার করার আনন্দময় মাধ্যম হয়।

আমরা প্রত্যেকেই নিজের সন্তানকে সবার আগে প্রাধান্য দিই। কিন্তু একটু গভীরভাবে দেখুন, আপনার সন্তানটি সমাজে কেবল তখনই নিরাপদ থাকবে, যখন তার চারপাশের অন্য সব শিশুও সুন্দর পরিবেশ পাবে। তাই নিজের সন্তানের স্বার্থেই সমাজের প্রতিটি শিশুর নিরাপদ বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

আমরা আজ প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে মেট্রোরেল বসাচ্ছি, ২১ হাজার কোটি টাকায় বিমান টার্মিনাল বানাচ্ছি, আর নতুন বিমান কেনার জন্যই রয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনা। দেশে বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বিলাসবহুল পণ্যের বাজার তৈরি হয়েছে; আমরা চমৎকার সব বাড়ি বানাচ্ছি, দামি গাড়ি কিনছি। উন্নয়নের স্বার্থে হয়তো এই সবকিছুরই প্রয়োজন রয়েছে; কিন্তু আমাদের শিশুরা কি সুস্থ ও স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ পাচ্ছে?

তাই আসুন, অন্তত আগামী ২০টি বছরের জন্য জাতিয় ‘উন্নয়নের সংজ্ঞা’ টিকেই শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য নিবেদন করি। বাহ্যিক উন্নয়নের চিন্তা কিছুটা কমিয়ে, আমাদের পুরো শক্তি ও জাতীয় বাজেট প্রাথমিক শিক্ষাকে নতুন করে সাজানোর পেছনে ঢালি। বিশ্বাস করুন, প্রাথমিক শিক্ষার ভিত যদি একবার মজবুত হয়ে যায়, তবে এদেশ অবশ্যই একদিন পুরো পৃথিবীকে নেতৃত্ব দেবে এবং জগতের বুকে এক বিস্ময় হবে। আর যে দূরদর্শী নেতৃত্ব আজ এই যুগান্তকারী কাজটি সম্পন্ন করবেন, ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম চিরকালের জন্য উচ্চারিত হবে ড. মাহাথির মোহাম্মদ, নেলসন ম্যান্ডেলা আর সম্রাট হিরোহিতোর মতো বিশ্বজয়ী কিংবদন্তিদের পাশে। 

(লেখক: মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষক) 

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT