ঢাকা | সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আন্তর্জাতিক থাইরয়েড সচেতনতা সপ্তাহ চলছে

থাইরয়েড মোকাবেলায় পুষ্টির পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছে এআই

author
মোহাম্মদ গোলাম নবী

প্রকাশিত : ২৫ মে, ২০২৬ বিকেল ৪:২২
ছবি-সংগৃহীত ছবি-সংগৃহীত
ad003
আন্তর্জাতিক থাইরয়েড সচেতনতা সপ্তাহ (২৫–৩১ মে) চলছে। বিশ্ব থাইরয়েড দিবস উপলক্ষে শুরু হওয়া এ বছরের কর্মসূচিতে গুরুত্ব পাচ্ছে “থাইরয়েড ও পুষ্টি” বিষয়টি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আয়োডিন ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও থাইরয়েডজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। একই সঙ্গে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) থাইরয়েড রোগ শনাক্তকরণ ও ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গবেষকরা থাইরয়েড আল্ট্রাসনোগ্রামের ছবি বিশ্লেষণ, থাইরয়েড নডিউল ক্যান্সারজনিত কি না তা মূল্যায়ন এবং রোগের ঝুঁকি নির্ধারণে এআইভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ে কাজ করছেন। বিপুল পরিমাণ রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে এআই এমন কিছু ধরণ ও লক্ষণ শনাক্ত করতে পারে, যা অনেক সময় মানুষের চোখে সহজে ধরা পড়ে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই চিকিৎসকের বিকল্প নয়; বরং দ্রুত ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক একটি প্রযুক্তি। বিশেষ করে যেখানে এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট ও রেডিওলজিস্টের সংখ্যা সীমিত, সেখানে ভবিষ্যতে এআই প্রাথমিক স্ক্রিনিং ও ঝুঁকি নিরূপণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে থাইরয়েড রোগ দ্রুত শনাক্ত করা এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু করার সুযোগ আরও বাড়তে পারে।

থাইরয়েড হলো গলার সামনের অংশে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থি। এটি থেকে উৎপন্ন হরমোন শরীরের বিপাকক্রিয়া, শক্তি উৎপাদন, বৃদ্ধি, হৃদস্পন্দন এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই হরমোন তৈরির জন্য আয়োডিন একটি অপরিহার্য উপাদান। ফলে খাদ্যে পর্যাপ্ত আয়োডিন না থাকলে থাইরয়েডের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।

একসময় বাংলাদেশ ছিল আয়োডিন ঘাটতিজনিত রোগের জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গলগণ্ড  বা থাইরয়েড গ্রন্থি বড় হয়ে যাওয়ার সমস্যা ব্যাপক ছিল। পরে আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারের জাতীয় কর্মসূচির মাধ্যমে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অন্যতম সফল পুষ্টি কর্মসূচির মধ্যে এটি একটি। এক সময় গলগণ্ড জনস্বাস্থ্যের একটি বড় সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে সেই পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, থাইরয়েড রোগের কারণ শুধু আয়োডিন ঘাটতি নয়। বর্তমানে অটোইমিউন রোগ, বংশগত কারণ, বয়স, পরিবেশগত উপাদান এবংজীবনযাপনের ধরনও থাইরয়েড সমস্যার সঙ্গে জড়িত। ফলে আয়োডিন ঘাটতি কমে এলেও থাইরয়েড রোগের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি।

আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আয়োডিনের পাশাপাশি সেলেনিয়াম, জিংকসহ অন্যান্য পুষ্টি উপাদানও থাইরয়েডের স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ কারণেই এ বছরের আন্তর্জাতিক থাইরয়েড সচেতনতা সপ্তাহে পুষ্টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
থাইরয়েড রোগের লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ শারীরিক সমস্যার সঙ্গে মিলে যায়। অতিরিক্ত ক্লান্তি, ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাস, চুল পড়া, মনোযোগ কমে যাওয়া, বিষণ্নতা, উদ্বেগ, হৃদস্পন্দনের পরিবর্তন এবং ঘুমের সমস্যা থাইরয়েডের ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা দীর্ঘদিন এসব সমস্যাকে সাধারণ শারীরিক দুর্বলতা বা মানসিক চাপের ফল মনে করে চিকিৎসা নেন না। ফলে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীদের মধ্যে থাইরয়েড রোগের হার পুরুষদের তুলনায় বেশি। তবে শিশু থেকে বয়স্ক—সব বয়সের মানুষই এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। সময়মতো শনাক্ত করা না গেলে এটি কর্মক্ষমতা, শিক্ষা, মাতৃস্বাস্থ্য এবং জীবনমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আন্তর্জাতিক থাইরয়েড সচেতনতা সপ্তাহ উপলক্ষে বিশেষজ্ঞরা জনগণকে সুষম খাদ্য গ্রহণ, আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার, প্রয়োজনে থাইরয়েড পরীক্ষা এবং থাইরয়েড সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, থাইরয়েড কোনো বিরল রোগ নয়। সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা শুরু করা গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তাই সচেতনতা, সুষম পুষ্টি এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয়ই হতে পারে ভবিষ্যতে থাইরয়েডজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ।


সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT