ঢাকা | সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজনীতি ও গণতন্ত্র

author
এ ইউদৌলা

প্রকাশিত : ২৬ মে, ২০২৬ বিকেল ৪:৩৪
ad003
বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীর রাষ্ট্র ব্যবস্থাগুলো একটি বড় ধরনের কাঠামোগত বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। রাজতন্ত্র, ঔপনিবেশিক শাসন এবং একনায়কতন্ত্রের অন্ধকারযুগ পেরিয়ে আমরা আজ ‘প্রজাতন্ত্র’ ও ‘গণতন্ত্রের’ এক আধুনিক বিশ্ব ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখছি। তাত্ত্বিকভাবে এই ব্যবস্থা মূল কথা হলো, জনগণই রাষ্ট্রের একমাত্র ‘মালিকপক্ষ’, আর রাষ্ট্রের বেতনভুক্ত সকলেই হলেন জনগণের ‘সেবকপক্ষ’। 

কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, আধুনিক এই গণতান্ত্রিক যুগে এসেও আমাদের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোটি এখনো মধ্যযুগীয় রাজতান্ত্রিক অভ্যাসের দাসত্ব থেকে মুক্তি পায়নি। খাতা-কলমে আমরা প্রজাতন্ত্র গঠন করলেও, অবচেতনে আমরা এখনো রাজদণ্ডের শাসনে ইঅভ্যস্ত।

এই মনস্তাত্ত্বিক সংকটের মূলে রয়েছে একটি গভীর ভাষাগত ফাঁদ। আজ আমরা যে শব্দগত যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি, তাহলো, কেন আমরা এখনো রাষ্ট্র এবং সমাজের চালিকাশক্তি হিসেবে ‘ক্ষমতা’শব্দটি ব্যবহার করছি? মানুষের মনস্তাত্ত্বিক গঠনকে গোড়া থেকে রিপ্রোগ্রাম করতে হলে এই ক্ষমতা শব্দটির ব্যবহারের অভ্যাসকে চিরতরে সমাজ থেকে বাদ দিতে হবে এবং তার জায়গায় ‘দায়িত্ব’ শব্দটির মানসিক অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।এটিকে বল একটি ব্যাকরণগত বা ভাষাগত শুদ্ধি অভিযান বললে ভুল হবে, বরং এটি মানুষের ভেতরের ‘হ্যাবিটমেশিন’কে নতুন করে সাজানোর এক সুগভীর মনস্তাত্ত্বিক সংগ্রাম। কেন একথা বলছি? 

মস্তিষ্কের একটি মৌলিক সত্য হলো, মানুষ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ কিংবা জটিল আইনিযুক্তি দিয়ে চালিত হয় না। মানুষের সচেতন মস্তিষ্ক বা Prefrontal Cortex শক্তি বাঁচাতে ভালোবাসে; তাই জীবনের অধিকাংশ সিদ্ধান্ত এবং আচরণের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক একটিস্বয়ংক্রিয়বা ‘অটোপাইলটমোড’ গ্রহণ করে, যাকে আমরা বলতে পারি ‘হ্যাবিটমেশিন’। এই মেশিনটি প্রতিনিয়ত আমাদের অবচেতন মনে গড়ে ওঠা দীর্ঘদিনের মানসিক অভ্যাসের মাঝেই কাজ করে।  
 
মনোবিজ্ঞানে ‘সেমান্টিককন্ডিশনিং’ বাশব্দার্থ গত উদ্দীপনা নামে একটি বিষয় রয়েছে। এর অর্থ হলো,  কোনো একটি সুনির্দিষ্ট শব্দ শোনার সাথে সাথে মানুষে র মস্তিষ্কে একটি সুনির্দিষ্ট নিউরাল পাথওয়ে বা স্নায়ুবিক পথ সক্রিয় হয়ে ওঠে। 

যেখানে ক্ষমতা শব্দটির সাথে আমাদের অবচেতন মনে হাজার বছর ধরে একটি ভয়ঙ্কর অ্যাসোসিয়েশন বা সংযোগ তৈরি হয়ে আছে, তাহল: ক্ষমতা = রাজদণ্ড = ইচ্ছে মতো কিছু করার সামর্থ্য = অন্যকে বাধ্য করার শক্তি তাই যখন একজন মানুষ কোনো পদে বসেন, তখন তার প্রজ্ঞাবান মন হয় তো জানে যে তিনি জনগণের সেবক। 

কিন্তু তিনি যখনই ওই চেয়ারে বসেন এবং চারপাশের সমাজ, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্র থেকে বারবার শোনেন যে তিনি “ক্ষমতালাভ” করেছেন, তখন তার ভেতরের ‘হ্যাবিটমেশিন’ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই পুরনো রাজতান্ত্রিক প্যাটার্নটিকেই সক্রিয় করে তোলে। ক্ষমতা শব্দটি তার অবচেতনে এক ধরণের অহংকার এবং আধিপত্যের জন্ম দেয়। 
 
ফলে তিনি অজান্তে সেই মধ্যযুগীয় রাজাদের মতোই অনুভব করতে শুরু করেন। এটি ক্ষমতার দোষ নয়; এটি হলো ক্ষমতা শব্দটির সাথে যুক্ত মস্তিষ্কের কন্ডিশনিংয়ের কুফল।এবং আরও আশ্চর্য বিষয় হল জনগণশাসকের এমন আচরণকে তার ন্যায়সঙ্গত অধিকার বলেই অনুভব করতে থাকেন।
 
ভাষা বিজ্ঞান এবং মনস্তত্ত্বে একটি বিখ্যাত থিওরি রয়েছে, যা Sapir-Whorf Hypothesis নামে পরিচিত। 

এই তত্ত্বের মূল সারমর্ম হলো,শব্দ কেবল মানুষের মনের চিন্তাকে প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং শব্দ মানুষের চিন্তার জগতকে আকৃতি দেয়। অর্থাৎ, আমরা আমাদের ভাষায় যে শব্দগুলো ব্যবহার করি, আমাদের চিন্তার পরিধি ও গভীরতাও ঠিক সেই শব্দগুলোর ছাঁচেই তৈরি হয়।

এখন ভেবে দেখুন, আমরা যদি আমাদের আইনি, রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিমণ্ডল থেকে ‘ক্ষমতা’ শব্দটি ব্যবহারের অভ্যাসকে সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলতে পারি, তবে কী ঘটবে?

যখন আমরা বলি “জনগণের কল্যাণ করার ক্ষমতা”, তার লিংগুইস্টিক ইমপ্যাক্ট হলো, এখানে একজন দাতা আছেন এবং একজন গ্রহীতা আছেন।

দাতা চাইলে কল্যাণ করতেও পারেন, আবার নাও করতে পারেন; কারণ এটিতার ‘ক্ষমতা’। কিন্তু শব্দটিকে বদলে যখন আমরা বলবো “জনগণের কল্যাণ করার দায়িত্ব”, তখন অহংকারের সেই পুরো দেয়ালটি ধসে পড়ে।

দায়িত্বশব্দেরসাথেযুক্তমনস্তাত্ত্বিককন্ডিশনিংহলো, এখানেকোনোদয়ানেই, এটিএকটিঋণ, একটিআমানত, যা পালন করতে ব্যক্তি বাধ্য।এই শব্দগত যুদ্ধে যখন ‘দায়িত্ব’ শব্দটি ‘ক্ষমতা’কে প্রতিস্থাপন করবে, তখন একজন শাসকের পক্ষে মানসিকভাবে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা অসম্ভব হয়ে পড়বে। কারণ তার চিন্তার জগতে স্বৈরাচার তৈরি করার কোনো কাঁচামাল বা শব্দই অবশিষ্ট থাকবে না।

আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, জনগণকে ‘মালিক’ বলা হলেও, একজন সাধারণ নাগরিক যখন কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সামনে যান, তখন তার মনের ভেতরের ‘হ্যাবিটমেশিন’ ভয়, সংকোচ এবং আত্মসমর্পণের পুরনো অভ্যাসে ফিরে যায়। এর একমাত্র কারণ হলো, সমাজ ও ই কর্মকর্তাটিকে ‘ক্ষমতাবান’ হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছে।যে সমাজে ক্ষমতার পুজো হয়, সেখানে মানুষের অধিকার রক্ষা করা অসম্ভব। কারণ ক্ষমতার স্বাভাবিক ধর্ম ই হলো আধিপত্য বিস্তার করা। কিন্তু যখন সমাজ থেকে ক্ষমতা শব্দটি নির্বাসিত হবে এবং তার জায়গায় ‘দায়িত্ব’ শব্দটি প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন জনগণের মনস্তত্ত্বেও এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।

জনগণ তখন কোনো সরকারি কর্মকর্তাদের দেখে ভয় পাবে না। তাদের ‘হ্যাবিটমেশিন’ তখন রিপ্রোগ্রামডহয়েভাববে, "উনি ক্ষমতার মালিক নন, উনি একজন দায়িত্ব প্রাপ্ত সেবক।" এই অনুভব জনগণের আত্মমর্যাদা, নাগরিক অধিকার এবং সচেতন তাকে এক ধাক্কায় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে, আর সেটাই প্রকৃত গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি।

তবে এই শব্দগত যুদ্ধটি মোটেও সহজ নয়। কারণ আমাদের ব্রেইন লক্ষ লক্ষ বছর ধরে টিকে থাকার লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়েছে। আদিম যুগে মানুষ সবসময়একজনশক্তিশালী, হুঙ্কারদেওয়াএবংহিংস্র ‘আলফামেল’ বাদলনেতাকেপছন্দকরত, কারণ সেই পেশি শক্তির ক্ষমতাবান নেতা তাদের রক্ষা করতেপারত।আমাদেরমনেরভেতরের ‘হ্যাবিটমেশিন’ এখনো সেই আদিম সুরক্ষার অভ্যাসে  অভ্যস্ত। এই কারণেই সমাজ এখনোএকজন ‘নম্র, বিনয়ী ও প্রজ্ঞাবান সেবক’কে নেতা হিসেবে সহজে মেনে নিতেপারেনা; তাকে দুর্বল মনে করে। সমাজ অবচেতনভাবেই সেই দাপুটে, টেবিল চাপড়ানো  ‘ক্ষমতাবান’ শাসককেই অবচেতনে বেশি পছন্দ করে। তাই এই যুদ্ধ টিকে বল কাগজে   র                             শব্দ বদলানো হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি মানুষের লক্ষব ছরের আদিম জৈবিক অভ্যাসকে বদলে দেওয়া রএক মহা-সংগ্রাম।

ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার বলেছিলেন, "আপনি যদি আমার সাথে আলোচনা করতে চান, তবে প্রথমে আপনার ব্যবহৃত শব্দগুলোর সংজ্ঞানির্ধারণ করুন।"আজকের এই নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় প্রজ্ঞাবান মানুষদের বড় দায়িত্ব হলো ‘ক্ষমতা’ শব্দটিকে চিরতরে সমাজচ্যুত করে দায়িত্বকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। একথা সত্য যে, ক্ষমতাহীন দায়িত্ব অত্যন্ত অসহায়, তাই ক্ষমতা রাখা উচিত কেবল Institutional Power হিসেবে। 

প্রতিষ্ঠান তার আইনের মাধ্যমে ক্ষমতা সংরক্ষণ করবে কিন্তু সেই ক্ষমতার ব্যবহারকারীগণের কাছে সেটা মনস্তাত্ত্বিকভাবে সব সময় ‘দায়িত্বই’থাকা উচিত।

আমরা যদি সত্যিই মানবতার মর্যাদা, সাম্য এবং অধিকার রক্ষা করতে চাই, তবে সমাজ, সংবিধান এবং প্রতিদিনের ভাষা থেকে ‘ক্ষমতা’ শব্দটির অভ্যাস বাদ দিতেহবে। যেদিন এই শব্দগত যুদ্ধে ‘দায়িত্ব’ শব্দটির চূড়ান্ত বিজয় ঘটবে, সেদিনই আমাদের মন স্বৈরাচারের অটোপাইলট মোড থেকে মুক্ত হয়ে মানবতা ও সেবার আলোয় রিপ্রোগ্রামড হবে; শক্তিশালী হবে মানবাধিকার, গণতন্ত্র আর আসল মুক্তি।

(মাইন্ড- ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT