আমাদের রাজনীতিতে “হানিমুন পিরিয়ড” শব্দবন্ধটি সাধারণত নতুন সরকারের প্রথম কয়েক মাসকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়—যে সময়ে জনগণ আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকে, বিরোধীরা অপেক্ষা করে, আর সরকার নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণের সুযোগ পায়। কিন্তু ইতিহাস বলে, এই সময়ে অধিকাংশ সরকারই প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার ব্যবধানের কারণে দ্রুত সমালোচনার মুখে পড়ে। সেই বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ১০০ দিন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ভিন্ন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে।
বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া প্রথম শতদিনে সরকার এমন কিছু দৃশ্যমান ও মানবিক পদক্ষেপ নিয়েছে, যা শুধু রাজনৈতিক সমর্থকদের মধ্যেই নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের মানুষ এমন একটি সরকার দেখছে, যারা ক্ষমতায় বসেই জনগণের ভাষা বোঝার চেষ্টা করছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন সরকারের ১০০ দিন পূর্তি উপলক্ষে যে তথ্য উপস্থাপন করেছেন, তা কেবল পরিসংখ্যান নয়; বরং একটি রাজনৈতিক দর্শনের ইঙ্গিত বহন করে। তিনি বলেন, রক্তস্নাত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, দীর্ঘ ১৬ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষার ধারাবাহিকতায় এই সরকার জনগণের মালিকানা জনগণের কাছেই ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে জনগণের সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল—ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়া এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা থেকে রাষ্ট্রের দূরত্ব তৈরি হওয়া। কিন্তু তারেক রহমানের সরকার শুরুতেই সেই দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করেছে। “সরকার মানুষের দরজায় যাচ্ছে”—এই বার্তাটি কেবল রাজনৈতিক প্রচারণা নয়, বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমেও দৃশ্যমান হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সরকার প্রথম থেকেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরি করেছে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে অতীতে বহু সরকার নির্বাচনী ইশতেহার দিলেও তার বাস্তবায়নের জন্য এমন কাঠামোগত তদারকি খুব কমই দেখা গেছে।
প্রথম ১০০ দিনে সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর মাধ্যমে নারীকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে নারীরা এখনো অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে। সেখানে পরিবারভিত্তিক নিরাপত্তা সুবিধা নারীর হাতে পৌঁছানো মানে পরিবারকেন্দ্রিক অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল করা।
একইভাবে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব এবং ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানি চালু করার সিদ্ধান্তটি সমাজের একটি দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন। এটি কেবল ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন নয়; বরং সামাজিক বাস্তবতার প্রতিও সরকারের সংবেদনশীল অবস্থান নির্দেশ করে।
কৃষিখাতে সরকারের পদক্ষেপগুলোও উল্লেখ করার মতো। ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ এবং ‘কৃষক কার্ড’ চালুর সিদ্ধান্ত গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। বাংলাদেশে কৃষক বহুদিন ধরেই ঋণের বোঝা, মধ্যস্বত্বভোগী এবং উৎপাদন ব্যয়ের চাপে বিপর্যস্ত। সেই বাস্তবতায় ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থাপনা ও ঋণমুক্তির উদ্যোগ কৃষকদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি এবং পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের উদ্যোগকে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি উৎপাদন এবং পানি ব্যবস্থাপনাকে একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা, পানির সংকট ও কৃষি ক্ষতির যে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা রয়েছে, তা সমাধানে এই উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও সরকার কিছু ইতিবাচক বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছে। মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৭১ শতাংশে নেমে আসা নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। যদিও এটি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি, তারপরও বাজারে স্থিতিশীলতার আভাস সাধারণ মানুষের মনে আশাবাদ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি সরাসরি মানুষের জীবনমানকে প্রভাবিত করে। ফলে সরকারের জন্য এটি একটি বড় রাজনৈতিক অর্জনও বটে।
এর পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিও সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় আস্থার প্রতিফলন। এক মাসে প্রায় ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসা দেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগও ইতিবাচক পদক্ষেপ। দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও প্রবাসীরা নানা ক্ষেত্রে অবহেলার শিকার হয়েছেন। নতুন সরকার তাদের রাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করছে।
শুধু অর্থনীতি নয়, শ্রমজীবী মানুষের প্রতিও সরকারের মনোযোগ স্পষ্ট হয়েছে। ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস নিশ্চিত করতে মালিকপক্ষ, ব্যাংক ও শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। শিল্পাঞ্চলে ঈদের আগে শ্রমিক অসন্তোষ বাংলাদেশের জন্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু সমন্বয়মূলক উদ্যোগ পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হয়েছে।
ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে বিশেষ ট্রেন, নৌ-সার্ভিস, নারীদের জন্য আলাদা কম্পার্টমেন্ট এবং মনিটরিং সেল গঠন সরকারের জনবান্ধব প্রশাসনিক মনোভাবের পরিচয় দেয়। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমানোর এই উদ্যোগগুলোই আসলে একটি সরকারের প্রতি আস্থা তৈরি করে।
স্বাস্থ্য খাতেও সরকার কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিয়েছে। হাম প্রতিরোধে টিকাদান কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং প্রায় শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ প্রশংসনীয়। মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক সংকেত।
তবে সরকারের সবচেয়ে আলোচিত দিক সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মানবিক ও জনসংযোগভিত্তিক রাজনৈতিক আচরণ। বাংলাদেশের মানুষ বহু বছর ধরে এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখেছে, যেখানে ক্ষমতাসীনরা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে অবস্থান করেন। কিন্তু রামিসার পরিবারের কাছে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর সরাসরি গিয়ে সহমর্মিতা প্রকাশ করা একটি ভিন্ন বার্তা দিয়েছে।
রাজনীতিতে প্রতীকী আচরণের গুরুত্ব অনেক। যখন জনগণ দেখে যে দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে ভুক্তভোগীর বাড়িতে যাচ্ছেন, তখন রাষ্ট্রকে তাদের কাছে আরও মানবিক মনে হয়। মাহদী আমিনের বক্তব্য—“এখন জনগণ প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাচ্ছে না, বরং প্রধানমন্ত্রী জনগণের দুয়ারে যাচ্ছেন”—এই সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে।
দ্রুত বিচার নিশ্চিতের ক্ষেত্রেও সরকার দৃশ্যমান বার্তা দিয়েছে। মেহেরপুরে শিশুধর্ষণ মামলায় ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডের রায় একটি বিরল নজির। যদিও বিচারব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার এখনো বড় চ্যালেঞ্জ, তারপরও দ্রুত বিচার জনগণের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে সরকারের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। সরকার সাংবাদিকদের “সর্বোচ্চ স্বাধীনতা” নিশ্চিত করার কথা বলেছে, যদিও একইসঙ্গে অপপ্রচার ও বিদ্বেষমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধেও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দায়িত্বশীলতা বজায় রাখাও জরুরি—সরকার সেই ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে বলেই মনে হচ্ছে।
প্রথম ১০০ দিনে মন্ত্রিসভার ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মধ্যে ৩৭টি বাস্তবায়িত হওয়া প্রশাসনিক সক্রিয়তার প্রমাণ। বাংলাদেশে ফাইলবন্দী সিদ্ধান্তের সংস্কৃতি বহু পুরোনো। সেখানে স্বল্পসময়ে বাস্তবায়নের হার সরকারের গতিশীলতাকে নির্দেশ করে।
তবে সবকিছুর পরও বাস্তবতা হলো—হানিমুন পিরিয়ড চিরস্থায়ী নয়। জনগণের প্রত্যাশা যত বাড়বে, সরকারের ওপর চাপও তত বাড়বে। মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দুর্নীতি দমন, বিচারব্যবস্থার সংস্কার এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা নিশ্চিত করাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
বিশেষ করে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী। এই লক্ষ্য অর্জনে শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা নয়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, দক্ষ মানবসম্পদ এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রয়োজন হবে।
এস আলম গ্রুপের সম্পদ জব্দ এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে জনগণ এখন শুধু প্রতীকী পদক্ষেপ নয়, স্থায়ী ও কাঠামোগত পরিবর্তন দেখতে চায়।
তারপরও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার প্রথম ১০০ দিনে জনগণের মনে এক ধরনের মুগ্ধতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। রাজনৈতিক ভাষণের চেয়ে বাস্তব উদ্যোগ, প্রশাসনিক গতি এবং মানবিক আচরণ—এই তিনটির সমন্বয় সরকারকে একটি ইতিবাচক অবস্থানে নিয়ে গেছে।
পরিশেষে বলা যায়,বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন পর মানুষ হয়তো এমন একটি সময় দেখছে, যখন সরকারকে ঘিরে শুধু ভয় বা হতাশা নয়, আশার কথাও উচ্চারিত হচ্ছে। এই আশাকে টিকিয়ে রাখার দায় এখন সরকারেরই। কারণ ইতিহাস বলে, জনগণ প্রথমে মুগ্ধ হয়, পরে বিচার করে। আর সেই বিচারের মাপকাঠিতে টিকে থাকতে হলে প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিক বাস্তবায়নই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে হানিমুন পিরিয়ডের মতই সরকার মুগ্ধতা ছড়িয়ে যাবে পুরোটা সময়। এটিই আমাদের সকলের প্রত্যাশা।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]