ঢাকা | রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পিপলস আর্মি ও প্রতিরক্ষা

১ম পর্ব

author
এ ইউ দৌলা

প্রকাশিত : ১ জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৫৯
ad003
আকাশ ভেঙে যখন ঝুম বৃষ্টি নামে, কিংবা চৈত্র-বৈশাখের খরতাপে যখন পিচঢালা পথ তেতে ওঠে, তখনমেঠোপথ আর অলিগলিতে হেঁটে যাওয়া সাধারণ মানুষগুলোর দিকে কখনো নিবিড়ভাবে তাকিয়ে দেখেছেন? মোটা চশমা চোখে যে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণটি বাসে ঝুলতে ঝুলতে যাচ্ছে, যে কারখানার কর্মীটি কপালে ঘাম মুছে মধ্যরাতে ঘরে ফিরছে, কিংবা যে কৃষকটি উদয়াস্ত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে শস্যের দানা ফলাচ্ছে, বাইরে থেকে দেখলে এদের বড্ড সাধারণ মনে হয়। মনে হয়, এরা কেবলই জীবনসংগ্রামের যাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া কিছু নিরীহ নাগরিক, যাদের কোনো শক্তি আর সাহস নেই। কিন্তু ইতিহাস প্রমান করেছে শান্ত আর পলিমাটির মতো নরম মানুষগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি।  রাষ্ট্রের অস্তিত্ব যখন চোরাবালিতে আটকে যায়, তখন এই মানুষগুলোই ত্রানকর্তা হয়ে ওঠে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ট্রেনিং ছাড়া, কোনো বাজেট আর প্রতিশ্রুতি ছাড়াই এক অলিখিত জাদুকরী শক্তিতে তারা অভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। কীভাবে জন্ম নেয় এই অপরাজেয় শক্তি? সেই উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরতে হবে প্রকৃতির চিরন্তন পাঠশালায়। 

কারণ, প্রকৃতিই মানুষের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। জীবজগতের দিকে তাকিয়ে দেখুন, প্রকৃতি তার প্রতিটি প্রাণীকে এক একটি অনন্যপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। কারো মাথার ওপর আছেমজবুত শিং, কারো আছে সুচালো দাঁত, কারো থাবায় অসীম শক্তি। বনের হাতিকে দেওয়া হয়েছে বিশাল শুঁড় ও দানবীয় শরীর,আবার সাপ বা বিছার মতো ক্ষুদ্র প্রাণীর শরীরে আছে তীব্র বিষের থলি। ক্ষুদ্র পিঁপড়ার আত্মরক্ষার হাতিয়ার তার ছোট্ট দুটি দাঁত, কাঁকড়ার আছে ধারালো ব্লেড, ঈগলের আছে তীক্ষ্ণ চঞ্চু আর ফ্যালকনের আছে তীব্র গতি।

এখন ভেবে দেখুন, ঈগলকে যদি হাতির মতো একটা বিশাল শুঁড় দেওয়া হয়, তবে কিতার প্রতিরক্ষা বাড়বে? নাকি সেই ভারী শুঁড়ের ওজনে সে মাটিতেই গড়াগড়ি খাবে? শুঁড় কি তখন তার জন্য এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে না? কিংবা ধরুন, বনের মহিষকে যদি সাপের মতো সায়ানাইড বিষ দেওয়া হয়, তবে কি সে শক্তিশালী হবে? নাকি বিষের প্রকোপে সে নিজেই অক্কা পাবে? প্রকৃতি আমাদের এই অমোঘ সত্যই শেখায়, যার যা সহজাত শক্তি, তাকে সেই শক্তি নিয়েই টিকে থাকতে হয়। অন্যের শক্তি ধার করতে গেলে নিজের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ে।

বিশ্বজগতের মানচিত্রে যুগে যুগে বিভিন্ন জাতি তাদের নিজস্ব সহজাত শক্তি ও দক্ষতাকে কেন্দ্র করেই পরাক্রমশালী হয়ে উঠেছে। জাপান তাদের নিখুঁত কাজের মানদিয়ে সারা জগতের সমীহ আদায় করেছে। ইহুদি জনগণ বুদ্ধিবৃত্তিক চাতুর্য নিয়ে সবার অলক্ষ্যে থেকে বিশ্ব শাসন করছে। আমেরিকা তাদের সমরাস্ত্রের প্রযুক্তিকে নিয়ে গেছে এক অতিপ্রাকৃতিক উচ্চতায়। চাইনিজদের আছে সুশৃঙ্খল প্রতিরক্ষা আয়োজন। পৃথিবীর নানা জাতির, নানা দেশের আছে নানা রকম নিজস্ব শক্তি ও সামর্থ্য।

কিন্তু এই ভূ-রাজনৈতিক জাঁতাকলে দাঁড়িয়ে আমাদের ঠিক কী আছে?

যদি তাত্ত্বিক তর্কের খাতিরে বলি আমাদেরও সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী আছে; তবে তার পরক্ষণেই অত্যন্ত রূঢ় কিছু বাস্তব প্রশ্ন চলে আসে। আমাদের এই বাহিনীর যে যুদ্ধ সরঞ্জাম, বিমান কিংবা সাবমেরিন, সেগুলো কি আমাদের নিজেদের তৈরি? নাকি অন্য কারো থেকে চড়া মূল্যে কেনা? যদি তা কেনা হয়ে থাকে, তবে কোনো বড় যুদ্ধের সময় ওইসব জটিল সরঞ্জামের স্পেয়ার পার্টস এবং গোলাবারুদ নিয়মিত সরবরাহ পাওয়ার নিশ্চয়তা কতটুকু? আচ্ছা, আমাদের বিপুল অর্থ দিয়ে কেনা ঐ সব যুদ্ধ বিমান আর সাবমেরিনগুলোর ভেতরে যে ডিজিটাল সফটওয়্যার সোর্সকোড থাকে, সেগুলোতে কি বিক্রেতা দেশগুলোর বিজ্ঞানীদের ‘রিমোট এক্সেস’ একেবারেই অসম্ভব?

এই প্রশ্নগুলোই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয় যে, আমাদের প্রতিরক্ষা আমাদেরই আবিষ্কারে হতে হবে। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা অন্য কারো উপর নির্ভর করে প্ল্যান করা মোটেও যুক্তিসঙ্গত নয়। আমাদের যা সহজাত শক্তি আছে, সেই শক্তিকে চিনে নিয়ে তাকে মজবুত করার মাধ্যমেই আমাদের চূড়ান্ত প্রতিরক্ষা দুর্গ গড়ে তুলতে হবে।

তাহলে জাতি হিসেবে আমাদের সেই সহজাত, প্রাকৃতিক শক্তিটি ঠিক কী, যা দিয়েই আমরা আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী আর কার্যকর করে তুলতে পারি? 

বিগত প্রায় ৩০ বছর ধরে পৃথিবীর নানা দেশের, নানা জাতির সামরিক বাহিনীর মানুষদের খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। তাদের সাথে দীর্ঘ আলাপচারিতায় তাদের জীবন, তাদের রণকৌশল, তাদের আকাঙ্ক্ষা আর ভেতরের গভীর মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাগুলোকে খুব কাছ থেকে বোঝার চেষ্টা করেছি। বিশ্বের বড় বড় পরাশক্তিগুলোর আধুনিকতম মারণাস্ত্রের কৃত্রিম জৌলুসওদেখেছি। আর এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা শেষে নিজের প্রিয়জাতির দিকে তাকিয়ে যে পরম সত্যটি আমি উপলব্ধি করেছি, তা হলো, আমাদের হয়তো অনেক কিছুই নেই; কিন্তু আমাদের এমন এক অসাধারণ, অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ আছে যা পৃথিবীর কোনো ল্যাবরেটরিতে বা অস্ত্রাগারে তৈরি হয় না, আর তা হলো আমাদের "আবেগ"।

হ্যাঁ, এই বাংলার মানুষ জগতের সবচেয়ে আবেগপ্রবণ জাতি। এই আবেগকে শুষ্ক পশ্চিমা মনস্তত্ত্ব ‘দুর্বলতা’ বলে কটাক্ষ করতে চায়; তারা বলে,আবেগ মানুষকে যুক্তিহীন করে তোলে, ভঙ্গুর করে দেয়। কিন্তু দীর্ঘ গবেষণা থেকে আমি বুঝেছি আবেগ কোনো দুর্বলতা নয়, এটি মানুষের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি, অনন্য জাতীয় সম্পদ। যে জাতির বুকে আবেগ থাকে না, সে জাতি যা কিছুই করুক, তারা শেষ পর্যন্ত ‘মানুষ’ থাকে না। যন্ত্রের সাথে মানুষের মৌলিক পার্থক্য তো কেবল ঐ আবেগের দেওয়ালে এসেই থমকে দাঁড়ায়।

আমাদের মজ্জায় মজ্জায়, রক্তের কণিকায় তীব্র আবেগ মিশে আছে বলেই আমরা আর দশটা পশ্চিমা জাতির মতো যান্ত্রিক রোবট হয়ে যাইনি। পরম আবেগ বুকে ধারণ করেন বলেই বাংলার বাবা-মায়েরা কোনো গাণিতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব না করে, শুধু নিঃস্বার্থ ভালোবাসার টানে পরিবারের জন্য, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নিজের পুরোটা জীবন অকাতরে বিলিয়ে দিয়ে চলেছেন। এই আবেগ আছে বলেই এ দেশের মা-বোনেরা নিজের সুখকে কর্পূরের মতো বিসর্জন দিয়ে পরিবারের সকলের মুখে হাসি ফোটাতে পারেন।

এই আবেগ আমাদের ধমনীতে আছে বলেই কোনো অন্যায়, কোনো জুলুম বা কোনো বৈষম্য দেখলে আমরা ঘরের কোণেলুকিয়ে থাকি না।  ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আর যুদ্ধজয় তা আমাদের আত্মসম্মানবোধের ফসল। আবেগে আঘাত লাগলে আমাদের ধমনীতে রক্ত টগবগ করে ওঠে, আমরা ফুঁসে উঠতে পারি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক পেতে দাঁড়ানোর এই যে অদম্য মানসিক শক্তি, তা কোনো যান্ত্রিক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মস্তিষ্ক থেকে আসে না, তা আসে আবেগপ্রবণ হৃদয় থেকে। যখন আমাদের জাতীয় মর্যাদায় আঘাত লাগে, যখন আমাদের মা ও মাটির ওপর কোনো কালো থাবা আসে, তখন আমাদের এই বারুদঠাসা আবেগই হয়ে ওঠে আমাদের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক অস্ত্র।

আবেগের মাঝেই লুকিয়ে আছে আমাদের অপরিসীম ভালোবাসা ও অবিশ্বাস্য সহমর্মিতা। গভীর আবেগ আছে বলেই তো ঝড়, বন্যা, মহামারী আর শত কষ্টের নির্মম যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েও আমরা কখনো হাল ছেড়ে দিই না। আমরা একে অপরের হাত ধরে, এক থালায় নুন-ভাত ভাগ করে খেয়েও শতাব্দীর পর শতাব্দী বেঁচে থাকি। কেউ দূর প্রান্তর বন্যায় ভাসলে, বুক সমান জল পেরিয়ে পরম অচেনাকে বাঁচাতে ছুটে যায় এদেশেরনিঃস্বার্থ অচেনা তরুণ। এই যে একে অপরের জন্য অঝোরে কাঁদা আর অন্যের দুঃখে বুক ফেটে যাওয়া, এটাই তো আমাদের খাঁটি ‘মানুষ’ করে তোলে।

অস্ত্রের শক্তি একদিন ফুরিয়ে যায়, বারুদের ক্ষমতা সময়ের নিয়মে ম্লান হয়ে আসে, কিন্তু বাঙালির এই চিরন্তন আবেগের শক্তি শুকিয়ে যায় না। এই আবেগের আগুনই ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে আমাদের পথ দেখিয়েছে, আর আগামীতেও এইজাগ্রত আবেগই তৈরি করতে পারবে এক অপরাজেয়, অভেদ্য ‘জনতার সেনাবাহিনী’।ভেবে দেখুন, আঠারো কোটি মানুষ যখন তাদের সহজাত ‘আবেগ-শক্তিতে’ বলীয়ান হয়ে এক সুতোয় মালা গাঁথবে, তখন তারা এমন এক অপরাজেয় মনস্তাত্ত্বিক প্রাচীর তৈরি করবে, যা শত্রুকে শেষ রক্ত বিন্দু পর্যন্ত কোন ছাড় দিবে না। এমন বাহিনীর সামনে জগতের কোন সুপার পাওয়ার চ্যালেঞ্জ করতে সাহস করবে, বলুন তো? 

কখনো মেঠোপথের ধারে বিষ পিঁপড়ার ঢিবির দিকে তাকিয়ে দেখেছেন? ছোট্ট এক একটি পিঁপড়া, অথচ তাদের ঐ বাসাটিকে হিংস্র পশু থেকে শুরু করে বনের রাজাও সমিহ করে। কেন? কারণ ওই ছোট ছোট পিঁপড়াদের সম্মিলিত কামড়ের যে তীব্র শক্তি, তাদের সেই ক্ষুদ্র দাঁতের যে যৌথ প্রতিরোধ, তা যে কাউকে দুঃশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। এটাই হলো জনতার শক্তির মূল উৎস; এটাই হলো ‘পিপলস আর্মি’।

আমাদের কী নেই, তা নিয়ে হাহাকার করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের দরকার এমন এক ‘জনতার সেনাবাহিনী’ গড়ে তোলা, যারা কোনো বিদেশি সামরিক সরঞ্জাম ছাড়াই, শুধু নিজেদের উদ্ভাবন করা অস্ত্র, আত্মমর্যাদা আর সম্মিলিত আবেগের শক্তিতে পুরো জগতের কাছ থেকে সমীহ আদায় করে নেবে।

যে পিপলস আর্মির শক্তির কথা বলছি, তা কিন্তুনতুন নয়। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, সাধারণ মানুষ যখন রুখে দাঁড়িয়েছিল, তখন রণকৌশলের সমস্ত নিয়ম ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বের বড় বড় দাম্ভিক পরাশক্তিগুলো সাধারণ মানুষের তৈরিফাঁদে পড়ে কীভাবে খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়েছিল,  সেই বিষয় নিয়ে লিখব পরের পর্বে। (পর্ব-০১)

(মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT