ঢাকা | রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুন্দরবনে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা, সংকটে বননির্ভর লক্ষাধিক মানুষ

author
কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ৩১ মে, ২০২৬ দুপুর ১২:২১
ad003
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে আগামী ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত টানা তিন মাস সুন্দরবনে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে বন বিভাগ। এ সময় বনের অভ্যন্তরে মাছ ও কাঁকড়া ধরা, মধু সংগ্রহসহ সব ধরনের বনজ সম্পদ আহরণ বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে পর্যটকদের প্রবেশও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জুন থেকে আগস্ট সময়কাল সুন্দরবনের অধিকাংশ বন্যপ্রাণী, মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য জলজ সম্পদের প্রধান প্রজনন মৌসুম। এ সময় মানুষের অবাধ চলাচল, নৌযানের শব্দদূষণ এবং সম্পদ আহরণ কার্যক্রম বনের স্বাভাবিক পরিবেশ ও প্রজনন প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে প্রতিবছরের মতো এবারও ৯০ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হচ্ছে।

তবে এই সিদ্ধান্তে সুন্দরবন-নির্ভর হাজার হাজার পরিবার চরম উদ্বেগে পড়েছে। কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা, শ্যামনগর ও মোংলা এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ মাছ ধরা, কাঁকড়া আহরণ, মধু সংগ্রহ, গোলপাতা কাটা, ট্রলার পরিচালনা ও পর্যটন খাতের ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় সূত্রের দাবি, পশ্চিম সুন্দরবন এলাকায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে প্রায় এক লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বনভিত্তিক পেশার সঙ্গে জড়িত।

কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের বনজীবী আব্দুর রহমান বলেন, “সুন্দরবন বন্ধ থাকলে আমাদের আয়ের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। তিন মাস সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে পড়ে। সরকারি সহায়তা না পেলে পরিবার নিয়ে দুর্ভোগে পড়তে হবে।”

একই এলাকার জেলে মো. হাবিবুর রহমান বলেন, “আমরা বন থেকে মাছ ও কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করি। নিষেধাজ্ঞা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। তবে এই সময়ে পরিবার চালানোর জন্য বিশেষ সহায়তা দরকার।”

খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, “সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা যেমন জরুরি, তেমনি বননির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিন মাসের নিষেধাজ্ঞার সময় বনজীবী ও শ্রমজীবী পরিবারগুলো যাতে খাদ্য সংকটে না পড়ে, সে লক্ষ্যে বিশেষ সহায়তার বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে উত্থাপন করা হয়েছে। দ্রুত কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।”

এ বিষয়ে পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ. জেড. এম. হাসানুর রহমান বলেন, “সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থে এই নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বনের মাছ, কাঁকড়া ও বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে প্রতিবছর এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের পুনরুৎপাদন বৃদ্ধি পায়, যা দীর্ঘমেয়াদে বনজীবীদেরও উপকারে আসে। আমরা স্থানীয় জনগণকে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় নজরদারি জোরদার করা হবে।”

বন বিভাগ জানায়, নিষেধাজ্ঞাকালে বনাঞ্চলে প্রবেশ, মাছ ও কাঁকড়া আহরণ কিংবা অন্য কোনো বনজ সম্পদ সংগ্রহ করতে গেলে বন আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে বনসংলগ্ন এলাকাগুলোতে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ ও সচেতনতামূলক প্রচারণা শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এ ধরনের পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে একই সঙ্গে বননির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। বিকল্প কর্মসংস্থান ও খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা হাজারো পরিবারের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT