একসময় যুদ্ধ হতো খোলা ময়দানে, তরবারি আর কামানের মুখোমুখি গর্জনে। সময় বদলালো; সাগর ও জলপথ নিয়ন্ত্রণ হয়ে উঠল যুদ্ধের জয়ের প্রধান কৌশল। এরপর প্রযুক্তির ডানায় ভর করে এলো আকাশ যুদ্ধ, আর সেই সাথে যুক্ত হলো রাজনৈতিক, কূটনৈতিক আর অর্থনৈতিক যুদ্ধ। বর্তমান সময়ে পরাশক্তিগুলো মারণাস্ত্র বসাচ্ছে স্যাটেলাইটে এবং খুব শীঘ্রই হয়তো এই মহাকাশই হয়ে উঠবে যুদ্ধের নতুন ময়দান। কিন্তু দৃশ্যমান এতসব আধুনিক আয়োজনের মাঝে, সব চেয়ে সহজ অথচ সব চেয়ে মারাত্মক এক যুদ্ধ চলছে অত্যন্ত গোপনে, নিঃশব্দে; যার নাম ‘কগনিটিভ ওয়ারফেয়ার’। এটি এমন এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যা আঘাত করে টার্গেট দেশের মানুষের মন-মগজ আর চিন্তার জগতে। এটি মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখার এক চরম সুক্ষ্ম কৌশল।
ব্যাপারটা আরেকটু সহজ করে বলি। আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসি, দেশের প্রতি আমাদের এক গভীর নাড়ির টান রয়েছে। কিন্তু দেশের প্রতি, মাতৃভূমির প্রতি, লাল-সবুজ পতাকার প্রতি, দেশের নেতৃত্বের প্রতি কিংবা নিজের ভাষা আর পরিচয়ের প্রতি আমাদের এই যে ভালোবাসা আর আবেগের বন্ধন, সেটা কিন্তু এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ‘কনস্ট্রাকশন’। আমরা আমাদের শৈশব থেকে পরিবার, সমাজ আর চারপাশ থেকে দেশকে ভালোবাসতে শিখেছি বলেই আজ দেশকে এতটা ভালোবাসি।
কগনিটিভ ওয়ারফেয়ার হলো সেই যুদ্ধ, যা আপনার ভেতরের এই ভালোবাসার কাঠামোটিকেই ভেঙে দেয়। এই পদ্ধতি আপনাকে অবিরত অনুভব করতে শেখাবে যে, আপনার দেশ নোংরা, আপনার দেশ দুর্নীতিতে ভরা, এখানে কোনো নিরাপত্তা নেই, আপনার জীবন আর সম্মান এই দেশে অনিরাপদ। এই সূক্ষ্ম কৌশল আপনাকে আপনার নিজের ভাষাকে দুর্বল, দেশের শাসন ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর এবং দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতিকে অত্যন্ত নিম্নমানের মনে করতে বাধ্য করবে। শত্রুরা এই নীল নকশা বাস্তবায়ন করার জন্য তারা টার্গেট দেশের অভ্যন্তরে এমন কিছু সংকট তৈরি করতে থাকবে, যাতে সাধারণ চোখে দেশকে দুর্বল ভাবার এই পুরো ব্যাপারটা সত্য বলেই মনে হয়। আর এই নেতিবাচক বিষয়গুলোকে তারা বারংবার সব ধরনের মিডিয়ায় ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রচার করবে। শত্রুরা টার্গেট দেশে এমন সব ছদ্মবেশী এজেন্ট নিয়োগ করে, যারা কৌশলে সারাদিন দেশের দুর্বলতা আর ব্যর্থতা নিয়েই বেশি বেশি মাতম করতে থাকে। তারা নাটক, সিনেমা, গল্প আর কন্টেন্টগুলো এমনভাবে বানাবে, যেন সাধারণ মানুষ নিজের অজান্তেই দেশ সম্পর্কে এক গভীর নেতিবাচক অনুভবে ডুবে যায়। মানুষ যেন দেশের প্রতি ভালোবাসা অনুভব করতে ভুলে যায়, জাতি যেন তার আত্মমর্যাদা হারিয়ে ফেলে। তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো, টার্গেট জাতিকে হীনমন্য, আত্মসম্মানবোধহীন ও মানসিকভাবে মেরুদণ্ডহীন দুর্বল দেশে পরিণত করা।
এই মনস্তাত্ত্বিক কৌশল যখন কোনো দেশে সফল হয়, তখন শত্রুদের আর কোটি কোটি ডলার খরচ করে যুদ্ধবিমান পাঠাতে হয় না। এমন অবস্থায় সেই দেশের বিজ্ঞানী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, প্রভাবশালী অর্থনীতিবিদ কিংবা উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসারদের খুব সহজেই নিজেদের পক্ষে এজেন্ট হিসেবে কিনে নেওয়া যায়। সামান্য প্রলোভনে তখন তারা রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গোপন দলিল তুলে দেয় শত্রুদের হাতে।
২০১১ সালের আগের লিবিয়া; তেলের সম্পদে ভাসমান এই দেশটিতে মুয়াম্মার গাদ্দাফির শাসনামলে নাগরিকরা এমন কিছু সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করতেন, যা আজকের অনেক উন্নত পশ্চিমা দেশের মানুষও কল্পনা করতে পারে না। লিবিয়ায় চিকিৎসা এবং শিক্ষা ছিল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। কোনো নাগরিক যদি দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা বা উন্নত চিকিৎসার জন্য যেতে চাইত, তবে রাষ্ট্র তাকে প্রতি মাসে ২,৩০০ ডলার সমপরিমাণ স্কলারশিপ এবং যাতায়াত খরচ দিত। সেখানে প্রতিটি নবদম্পতিকে নিজেদের জীবন শুরু করার জন্য রাষ্ট্র থেকে ৫০,০০০ ডলার অনুদান দেওয়া হতো এবং আবাসনকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার মনে করা হতো। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কোনো সুদ ছিল না। বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য কোনো বিল দিতে হতো না। মরুভূমির বুকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কৃত্রিম নদী প্রকল্প তৈরি করে তারা মরুভূমিকে শস্য-শ্যামল করে তুলেছিল। কোনো নাগরিক যদি চাষাবাদ করতে চাইত, তাকে বিনামূল্যে জমি, খামারবাড়ি, যন্ত্রপাতি এবং বীজ দেওয়া হতো। পরাশক্তিগুলোর অর্থনৈতিক বা সামাজিক সূচকের চেয়ে লিবিয়ার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান অনেক ওপরে ছিল। আফ্রিকার সবচেয়ে ধনী এবং সর্বোচ্চ মাথাপিছু আয়ের দেশ ছিল এই লিবিয়া।
গাদ্দাফি সরকার আফ্রিকার জন্য গোল্ড দিনার চালুর উদ্যোগ নিচ্ছিল, যা পরাশক্তিগুলোর অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের জন্য ছিল চরম হুমকি। তাই দেশটিকে ধ্বংস করার নীল নকশা আঁকা হলো। কিন্তু সরাসরি সামরিক আক্রমণ করলে বিশ্বজুড়ে নিন্দা আর প্রতিরোধ আসতে পারে, তাই শত্রুরা বেছে নিল সবচেয়ে কম খরচের ও মারাত্মক অস্ত্র। লিবিয়ার জনগণের অন্তরে অত্যন্ত গোপনে বিষ ঢুকিয়ে দেওয়ার অপারেশন শুরু হলো। পশ্চিমা মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ার সমন্বয়ে লিবিয়ার মানুষের মগজে অবিরত এই বার্তা ঢুকিয়ে দেওয়া হতে লাগল যে, "তোমাদের কোনো স্বাধীনতা নেই, তোমরা এক স্বৈরাচারের অধীনে বন্দি, তোমাদের গণতন্ত্র নেই।"
কগনিটিভ ওয়ারফেয়ারের সুক্ষ্ম চালে তাদের চোখের সামনে সারাক্ষণ তুলে ধরা হতে লাগল কেবলই নেতিবাচক আখ্যান। তাদের বোঝানো হলো, গাদ্দাফির ব্যবস্থা অত্যন্ত নিম্নমানের, এখানে মানুষের কোনো সম্মান নেই। এই প্রোপাগান্ডায় লিবিয়ার জনগণের ‘জাতীয় ঐক্য’ ভেঙে পড়ল। শত্রুরা এমন কিছু ছদ্মবেশী এজেন্ট ও সামাজিক অসন্তোষ তৈরি করল, যার ফলে সাধারণ মানুষের কাছে দেশ সম্পর্কে নেতিবাচক অনুভবই সত্য বলে মনে হতে লাগল। যখন কগনিটিভ অপারেশন সফল হলো, লিবিয়ার জনগণ শত্রুর পাতা প্রোপাগান্ডার ফাঁদে পা দিয়ে মেতে উঠল এক উন্মত্ত ধ্বংসযজ্ঞে। বহিরাগত শক্তিগুলো তখন লিবিয়ার এই অভ্যন্তরীণ বিভেদকে কাজে লাগিয়ে "মানবাধিকার রক্ষা" এবং "গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার" দোহাই দিয়ে লিবিয়ার ওপর বিমান হামলা শুরু করল। যে জনগণ ভেবেছিল গাদ্দাফির পতনে দেশে বুঝি স্বর্গ নেমে আসবে, তারা খুব দ্রুতই এক চরম দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি হলো। গাদ্দাফিকে নির্মমভাবে হত্যার পর লিবিয়ার সেই সাজানো-গোছানো শাসন কাঠামো এক লহমায় প্যারালাইজড হয়ে গেল। আজকের লিবিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখুন; ২০১১ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত সেখানে কোনো স্থায়ী সরকার গড়ে ওঠেনি। এক সময়ের সমৃদ্ধ লিবিয়া আজ বিভিন্ন মিলিশিয়া গ্রুপ আর যুদ্ধবাজদের চারণভূমি। যে দেশের মুদ্রা আফ্রিকার সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল, সেখানে আজ মানুষ এক মুঠো অন্নের তাগিদে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পালিয়ে যাচ্ছে।
একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন, জাতি যদি নিজের দেশকেই ভালোবাসতে ভুলে যায়, তবে সেই দেশ রক্ষার জন্য কেউ কি অস্ত্র ধরবে? কে নিজের জীবন উৎসর্গ করবে? না, কেউ করবে না। এটাই মানুষের চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক স্বভাব। শত্রুরা ঠিক এমন আরও অসংখ্য মনস্তাত্ত্বিক কৌশলে এই গোপন অপারেশন চালায়। এই অপারেশনগুলোর দৃশ্যমান ফল আসতে হয়তো কিছুটা সময় লাগে, কিন্তু এর ফলাফল হয় চিরস্থায়ী। একটা দেশের জাতিসত্তাকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দেওয়ার সবচেয়ে সহজ, সবচেয়ে কম খরচের অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী যুদ্ধ এটাই।
তো, চলুন এবার নিজেদের জাতিসত্তাকে একটু ডায়াগনোসিস করে দেখি। বিগত দুই দশক আগের বাংলাদেশের সাথে যদি আজকের সামাজিক ও মানসিক অবস্থার তুলনা করি, তবে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তরে আমাদের বিবেক কী সাক্ষ্য দেবে?
• আমাদের জনগণের মাঝে দেশপ্রেমের শক্তি কি আগের চেয়ে বেড়েছে নাকি কমেছে?
• দেশের বিষয়ে কটু কথা বলা, দেশের বদনাম প্রচার কমেছে নাকি বেড়েছে?
• আমাদের সমাজে সামগ্রিক দুর্নীতি, অপরাধ আর সহিংসতার হার বেড়েছে নাকি কমেছে?
• মানুষের মাঝে বৈষম্য আর বঞ্চনার অনুভব বেড়েছে নাকি কমেছে?
• জনগণের পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস ও সামাজিক বন্ধন শক্তি বেড়েছে নাকি কমেছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই বুঝতে সাহায্য করবে যে, আমরা কোনো অদৃশ্য শক্তির ‘কগনিটিভ ওয়ারফেয়ার’ এর শিকার হয়ে পড়েছি কিনা; আমাদের জাতির আত্মসম্মানবোধকে প্যারালাইজড করে দেওয়ার গোপন ষড়যন্ত্র চলছে কিনা। (পর্ব-০৩)
কীভাবে এই অদৃশ্য যুদ্ধের মোকাবেলা করে জাতিসত্তার প্রতিরক্ষা মজবুত করা করা যায়? (জানতে চোখ রাখুন আগামী পর্বে)
(মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)