ঢাকা | সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ট্রাম্প-মহিষের ছবি নিয়ে বিশ্বে তোলপাড়

সেলেবৃটি প্রাণী

author
সৃজন আহমেদ

প্রকাশিত : ১ জুন, ২০২৬ বিকেল ৪:৪৪
ad003
বাংলাদেশের কোরবানির হাটে প্রতি বছরই বড় গরু, বিশাল ষাড় কিংবা অদ্ভুত চেহারার পশু নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু এবারের গল্পটি ছিল অন্য রকম। কারণ, এটি শুধু একটি মহিষের গল্প নয়; এটি সোশাল মিডিয়ার যুগে একটি প্রাণীর ‘সেলেবৃটি’ হয়ে ওঠার গল্প। এটি এমন এক মহিষের গল্প, যার কপালে সোনালি চুলের ঝুটি দেখে মানুষ মনে করেছে, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে।

বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের একটি খামারে জন্ম নেয়া বিরল এলবিনো মহিষটি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে স্থানীয় কৌতূহল থেকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে যায়। রয়টার্স, দি গার্ডিয়ান, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট এবং সিবিএস 

নিউজসহ বিশ্বের প্রভাবশালী মিডিয়ায় জায়গা পায় তার ছবি। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌছে, কোরবানির জন্য বিক্রি হয়ে যাওয়া মহিষটিকে সরকারিভাবে উদ্ধার করে ঢাকার জাতীয় চিড়িয়াখানায় স্থানান্তর করা হয়। আর তখনই শুরু হয় নতুন বিতর্ক, এটি কি শুধু বিরল প্রাণী রক্ষার সিদ্ধান্ত, নাকি এর পেছনে ছিল ডিপ্লোম্যাটিক বিবেচনাও?

যেভাবে জন্ম হলো ‘ট্রাম্প’ নামের
মহিষটির মালিক নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার রাবেয়া এগ্রো ফার্মের খামারি জিয়াউদ্দিন মৃধা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মহিষটির কপালের সামনে সোনালি-হলদেটে চুল দেখে প্রথমে তার ছোট ভাই মজা করে নাম দেন ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। কারণ, প্রাণীটির মাথার সামনের চুলের বিন্যাস অনেকটাই ট্রাম্পের বহুল আলোচিত হেয়ারস্টাইলের মতো ছিল। এরপর নামটি আর বদলানো যায়নি। এই নামটি ছড়িয়ে পড়লে খামারে আসা দর্শনার্থীরা ছবি তুলতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কেউ ভিডিও বানায়, কেউ রিল তৈরি করে। কয়েক দিনের মধ্যেই ফেসবুক, টিকটক এবং ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়ে ‘ট্রাম্প মহিষ’।

সাধারণ মহিষ নয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি এলবিনো বা বর্ণহীন মহিষ। এলবিনিজমের কারণে প্রাণীর শরীরে মেলানিন কম থাকে। ফলে সাধারণ কালো বা ধূসর রঙের বদলে তাদের শরীর সাদা, গোলাপি বা হালকা রঙের হয়। বাংলাদেশে এ ধরনের মহিষ অত্যন্ত বিরল। প্রাণী সম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, হাজার হাজার মহিষের মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্যের প্রাণী খুব কম দেখা যায়। তাদের ত্বক সূর্যালোকের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হওয়ায় আলাদা যত্নের প্রয়োজন হয়। জিয়াউদ্দিন মৃধা আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে জানান, মহিষটিকে প্রতিদিন চারবার গোসল করানো হতো এবং চারবার খাবার দেয়া হতো। বিশেষ যত্নেই তাকে বড় করা হয়েছে।

হাটের তারকা থেকে জাতীয় আলোচনায়
মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই নারায়ণগঞ্জের খামারে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। কেউ শুধু মহিষটি দেখতে ১০০-১৫০ কিলোমিটার দূর থেকেও ছুটে আসে। অনেকেই সেলফি তুলতে লাইনে দাড়ায়। কনটেন্ট কৃয়েটরদের ভিড়ে খামার এলাকা প্রায় মেলায় রূপ নেয়। এক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ‘রয়টার্স’ এ নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করলে ঘটনাটি বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ইনডিয়ান মিডিয়া, বৃটেনের পত্রিকা  এবং আমেরিকান টেলিভিশন নেটওয়ার্কÑ সবাই খবরটি প্রচার করে। বাংলাদেশের কোরবানির হাটের একটি মহিষ তখন আন্তর্জাতিক ‘পপ কালচার’ আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে।

কোরবানির জন্য বিক্রি, এরপর নাটকীয় মোড়
খামার মালিকের প্ল্যান ছিল ঈদুল আজহায় মহিষটিকে কোরবানির জন্য বিক্রি করার। প্রায় ৭০০ কেজি ওজনের এই মহিষটি শেষ পর্যন্ত বিক্রিও হয়ে যায়। কিন্তু ঠিক তখনই ঘটে অপ্রত্যাশিত ঘটনা। সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া জানায়, মহিষটিকে ঘিরে অস্বাভাবিক জনআগ্রহ এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নির্দেশে ক্রেতার অর্থ ফেরত দেয়া হয় এবং মহিষটিকে জাতীয় চিড়িয়াখানায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এভাবেই কোরবানির তালিকা থেকে বাদ পড়ে ‘ট্রাম্প’।

ডিপ্লোম্যাটিক জল্পনা, গুজব নাকি বাস্তবতা
মহিষটি চিড়িয়াখানায় পাঠানোর পর সোশাল মিডিয়ায় নতুন এক ধরনের আলোচনা শুরু হয়। অনেকে রসিকতা করে বলতে থাকে, ‘ট্রাম্প’ নামের প্রাণী কোরবানি হলে সেটি আন্তর্জাতিক ডিপ্লোম্যাটিক আলোচনার বিষয় হয়ে যেতে পারত। কেউ কেউ দাবি করে, আমেরিকার সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ভুল বোঝাবুঝি এড়াতেই প্রাণীটিকে রক্ষা করা হয়েছে।
তবে এ ধরনের দাবির পক্ষে কোনো সরকারি প্রমাণ নেই। সরকারি কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে বলেছে, মূল কারণ ছিল বিরল প্রাণীটিকে ঘিরে ব্যাপক জনআগ্রহ এবং নিরাপত্তাজনিত বিবেচনা। তবুও সোশাল মিডিয়ায় ‘ডিপ্লোম্যাটিক মহিষ’ তত্ত্ব এখনো জনপ্রিয় রসিকতার বিষয় হয়ে রয়েছে।

ইরানের খোচা, রাশিয়ার ভিডিও, আন্তর্জাতিক

রাজনীতিতেও ঢুকে পড়া ‘ট্রাম্প মহিষ’
বাংলাদেশের এই একটি কোরবানির পশু, যে এক সময় আমেরিকা-ইরান উত্তেজনার মধ্যেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠবেÑ সেটা হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি। কিন্তু সেটিই ঘটেছে ‘ট্রাম্প মহিষ’-এর ক্ষেত্রে। মহিষটির ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ‘আরটি’ এ নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, মানুষজন ভিড় করে দেখতে আসায় ‘ট্রাম্প’ নামের মহিষটি নাকি কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েছে এবং খাবার খাওয়াও কমিয়ে দিয়েছে।

এরপর ঘটনাটি নতুন মোড় নেয়। রাশিয়ায় অবস্থিত ইরানি এম্বাসির অফিশিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) একাউন্ট সেই ভিডিও শেয়ার করে কটাক্ষপূর্ণ ভঙ্গিতে লেখেÑ ‘চড়ড়ৎ ঃযরহম! ইধহমষধফবংযর নঁভভধষড় ঁঢ়ংবঃ নু পড়সঢ়ধৎরংড়হং ঃড় উড়হধষফ ঞৎঁসঢ়.’ অর্থাৎ, বেচারা! ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তুলনা করায় বাংলাদেশের মহিষটি মন খারাপ করেছে।

পোস্টটি দ্রুত ছড়ায় সোশাল মিডিয়ায়
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি নিছক হাস্যরস ছিল না; বরং সেই সময় চলমান আমেরিকা-ইরান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে একটি সূক্ষ্ম রাজনৈতিক কটাক্ষ। কারণ, ওই সময় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে টান টান উত্তেজনা চলছিল। দুই পক্ষের নেতারা প্রকাশ্যে একে অপরকে কড়া ভাষায় আক্রমণও করছিলেন। ফলে বাংলাদেশের একটি ভাইরাল মহিষ মুহূর্তের মধ্যেই আন্তর্জাতিক ডিপ্ল্যোম্যাটিক রসিকতার উপাদানে পরিণত হয়। সোশাল মিডিয়ায় তখন অনেকে মজা করে লিখেছিল, ‘বাংলাদেশের মহিষ এখন মিডল ইস্টের ভূরাজনীতিতেও ঢুকে পড়েছে।’

ট্রাম্প কি কিছু বলেছেন
এখন পর্যন্ত আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই মহিষ নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেছেন কি না এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। হোয়াইট হাউস কিংবা ট্রাম্পের নিজস্ব সোশাল মিডিয়া ‘ট্রুথ সোশালেও’ এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তবে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক হাস্যরস তৈরি করেছে। বিভিন্ন সোশাল মিডিয়ায় হাজার হাজার মিম ছড়িয়ে পড়ে। কেউ লিখেছে, ‘বাংলাদেশে ট্রাম্পকে শেষ মুহূর্তে বাচানো হয়েছে।’ কেউ আবার মন্তব্য করেছে, ‘আসল ট্রাম্পের চেয়ে মহিষ ট্রাম্প বেশি জনপ্রিয়।’

বিশ্ব মিডিয়া যে কারণে এত আগ্রহী হলো
গণযোগাযোগ বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, প্রাণীটি ছিল অত্যন্ত বিরল। দ্বিতীয়ত, তার চেহারার সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের এক জনের মিল খুজে পাওয়া গেছে। তৃতীয়ত, সোশাল মিডিয়ার যুগে অদ্ভুত, মজার ও মানবিক গল্প দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা ইউনিভার্সিটির গণযোগাযোগ বিভাগের একাধিক গবেষণায়ও দেখা গেছে, রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, প্রাণী এবং ভাইরাল ভিজুয়ালÑ এই তিন উপাদান একত্র হলে জনআগ্রহ বহু গুণ বেড়ে যায়। ‘ট্রাম্প মহিষ’ যেন সেই সূত্রের বাস্তব উদাহরণ।

চিড়িয়াখানার নতুন বাসিন্দা
যে মহিষটির ভাগ্যে কোরবানি লেখা ছিল, সে এখন জাতীয় চিড়িয়াখানার আকর্ষণ। আর তাকে দেখতেই সেখানে এখন উপচেপড়া ভিড়। চিড়িয়াখানায় এই মহিষকে দেখতে আসছে এদেশে অবস্থানরত এম্বাসি ও সাহায্য সংস্থার কর্মকর্তারা। এক জন আমেরিকান দর্শনার্থীও চিড়িয়াখানায় মহিষটিকে দেখে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মিল খুজে পেয়েছেন বলে একটি টিভি মিডিয়ার রিপোর্ট থেকে জানা গেছে।

বাংলাদেশে কোরবানির হাটে প্রতি বছরই নতুন নতুন তারকা আসে। কিন্তু সোনালি চুলওয়ালা ‘ট্রাম্প মহিষ’-এর মতো বিশ্ব খ্যাতি খুব কম প্রাণীরই জুটেছে। হয়তো কয়েক বছর পর এই গল্পটি শোনা হবে বাংলাদেশের ভাইরাল সংস্কৃতির এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে, যেখানে একটি মহিষ প্রমাণ করে দিয়েছে, সোশাল মিডিয়ার যুগে খ্যাতি কখনো কখনো জীবনও বাচিয়ে দিতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT