গ্রিক পুরাণে সিসিফাসকে দেবতাদের অবাধ্য হওয়ার কারণে, অভিশাপ দেয়া হয়। অভিশাপ শাস্তি ছিল, তাকে একটি বড় পাথরের চাই ঠেলে পাহাড়ের চূড়ায় তুলতে হবে। কিন্তু চূড়ায় পৌঁছানো মাত্রই পাথরটি ফের গড়িয়ে নিচে চলে আসে। এবং পুনরায় আবারো পাথরটি পাহাড়ের চূড়ায় তুলতে থাকে। সিসিফাসের এই শাস্তিটা অন্তহীন। এবং এর চূড়ান্ত ফলাফল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিল না।
অনেকটা বাংলাদেশের মতোই! বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই, এদেশের মানুষ অন্নবস্তু, একখন্ড মাথা গোজার ঠাইয়ের নিশ্চয়তা চেয়ে আসছে। সঙ্গে আছে গণতান্ত্রিক অধিকার। সাধারণ জনগণ ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় আন্দোলন, সংগ্রাম করেছে। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাড়িয়ে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার তেমন পরিবর্তন আসেনি। জনগণকে আবারো নতুন দিনের আশায়, নতুন করে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এত বড় একটা পরিবর্তনের পরেও মানুষ তাদের আগামী দিন নিয়ে শঙ্কিত। ২০২৬-এর ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পরপরই আবারো রাষ্ট্র বা মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের নতুন, নতুন মোড়ক উন্মোচন হচ্ছে।
৫ আগস্ট পরবর্তী পরিবর্তিত অবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে, অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা কিচেন ক্যাবিনেট নামে এক কাহিনী উপস্থাপন করেছেন। এরা আধুনিক সময়ের দেবতা যারা সাধারণ মানুষের কল্যাণ কখনোই চায় না। এরা জনগণকে ব্যবহার করে জনগণের বিরুদ্ধেই সবসময়।
নির্বাচন হয়ে নতুন সরকার গঠন হলো এখন বলছেন, উপদেষ্টা হিসেবে কোনো কথা বলতে পারতেন না। মেনে নিলাম আপনারা সত্য বলছেন। তাহলে পদত্যাগ করলেন না কেন? পদত্যাগ করলে সরকারি ব্যয় কিছুটা কম হতো। বাংলাদেশের মতো একটা গরিব দেশ বাড়তি ব্যয় থেকে বাচত। ১৮ মাস সরকারের সব সুযোগ সুবিধা নিয়ে এখন বলছেন, আপনারা কোনো কাজ করতে পারেননি। আপনারা অতীতে এক/এগারোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এবং আগামীতে আরেকটা অনির্বাচিত সরকারে জায়গা নিতে আগাম বার্তা।
অধুনালুপ্ত অন্তর্বর্তী সরকারে সাবেক উপদেষ্টাদের মধ্যে যারা কিচেন ক্যাবিনেট নিয়ে কথা বলেছেন, তাদের বক্তব্য: সাবেক উপদেষ্টা বৃ. (অব.) সাখওয়াত হোসেন বলেছেন, 'ড. ইউনুসের কিচেন ক্যাবিনেট ছিল। সেখানে তাকে কখনো ডাকা হয়নি।' সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতারের কথা 'বাণিজ্য চুক্তির আওতায় সন্তায় মাংস, পোলট্রি ও প্রাণিজ পণ্য আমদানির তীব্র বিরোধিতা করেছি। শেষ পর্যন্ত এই চুক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। চুক্তি ঠেকাতে পারেনি।' পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের বক্তব্য হচ্ছে, 'পরে জানতে পারি প্রধান উপদেষ্টার' নেতৃত্বে ৬ জন উপদেষ্টা প্রতি মঙ্গলবার বৈঠক করেন। যাকে কিচেন ক্যাবিনেট বলা হতো। সব সিদ্ধান্ত সেখানে হতো। মার্কিন চুক্তির বিষয়ে আমি বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবহিত নয়।' আরেক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, মার্কিন চুক্তি নিয়ে ড. ইউনূস আমাকে ডাকেনি।' এদিকে সাবেক উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদারও বলেছেন, 'তিনি না কি অন্তর্বর্তী সরকারে কার্যক্রম সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। সব সিদ্ধান্ত কিচেন ক্যাবিনেট থেকে আসত।'
আপনারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সব সিদ্ধান্ত আসত কিচেন ক্যাবিনেট থেকে। আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পর্কে কেউ বলেছেন জানতেন না। আবার কারো বক্তব্য তীব্র বিরোধিতা করেছেন। এসবের কিছুই তো আমরা জানি না। জনগণের সামনে কেন তুলে ধরেননি। জনগণের পয়সায় সরকারি সুযোগ সুবিধা নেবেন অথচ গণবিরোধী চুক্তি হচ্ছে তা জানাতে পারলেন না। কিংবা এর প্রতিবাদে পদত্যাগও করেননি। সুতরাং অন্তর্বর্তী সব ভালোমন্দের দায়িত্ব আপনাদেরও নিতে হবে। এক জন বা ছয় জনের ওপর দায় চাপানো চলবে না। আমরা বুঝতে পারি আপনাদের এই বক্তব্য হচ্ছে আরেকটা অনির্বাচিত সরকার গঠণের পূর্ব প্রস্তুতি।
সুশীলদের প্রতিনিধি এক জন সম্পাদক সাহেব নির্বাচনের পর দিনই মন্তব্য করে বসলেন, ভোটাররা নাকে রুমাল দিয়ে বিজয়ী দলকে ভোট দিয়েছে। এখান থেকেই নির্বাচন নিয়ে নানা রঙের কথা শুরু। সম্প্রতি আরেক সম্পাদক বললেন, ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান সময় সাবেক প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ পত্র ভ্যানিটি ব্যাগে করে নিয়ে গেছেন। এই কথাটি যে উনি বললেন, বুঝে বলেছেন। না ইচ্ছাকৃত। এর পরবর্তী পরিণতি কি হতে পারে উনি বুঝতে পারেন। এই একটা কথাকে কেন্দ্র করে সাবেক স্বৈরশাসক আগামীতে সব কর্মকাণ্ড অবৈধ বলে দাবি করতে পারেন। বর্তমান সরকারি দল ভেসে আসা কোনো রাজনৈতিক দল নয়। তখন এ-ই কথাকে কেন্দ্র করে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
একই সুরে এদেশের কয়েকটি এনজিওর কর্মকর্তারাও মন্তব্য করতে থাকেন। নির্বাচন এবং নির্বাচন পরবর্তী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। যারা বক্তব্য রেখেছেন, তাদের সকলেই এক-এগারোর কুশীলব এবং তারা সব সময় নির্বাচিত সরকার বা রাজনৈতিক দলের বিষয়ে নেতিবাচক কথা বলেন। এবং অনির্বাচিত সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন থাকে। এবারও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে এবার সরকার গঠনের শুরুতেই তারা সরকারের সমালোচনা করছেন। এই সমালোচনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে ডিপ স্টেটের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত করা। এটা করতে যেয়ে আদর্শগত মতপার্থক্যের সঙ্গে একই মঞ্চে বসে সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য রেখেছেন। মানুষের আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তে নিজেদের আকাঙ্ক্ষার প্রতি বেশি জোর দিচ্ছেন। অথচ মুখে সবসময় মানুষের কথা এবং মানুষের কল্যাণ।
বাংলাদেশের একটা বড় অংশের মনে বিরোধী দলের ভূমিকা সংশয় দেখা দিয়েছে। কেননা, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর দিন থেকেই বিরোধী দল, সরকার বিরোধী আন্দোলন শুরু করে দেয়। নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করা গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকার পরিবর্তনের হুমকি দিয়ে আসছে। বিরোধী দলও যে সরকারের অংশ তা তারা ভুলে যাচ্ছে। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, তারা যা চায় তা সরকার বাস্তবায়ন করলে আছে। না হলে সরকারকে তারা ফেলে দেবে। সরকার দল কি বিনা ভোটে নির্বাচিত?
বিরোধী দল এবং সরকারি দল একই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত। বিরোধী দল অভিযোগ করেছে, ইঞ্জিনিয়ারিং করে সরকারি দল নির্বাচিত হয়েছে, এবং সরকার গঠন করেছে। নির্বাচনে যদি ইঞ্জিনিয়ারিং হয়ে থাকে বিরোধী দলও এর বাইরে নয়। বর্তমান বিএনপি সরকার দল হিসেবে পাচবার নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করেছে। আর বিরোধী দল এর আগের নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১৮টি আসনে নির্বাচিত হয়েছে। এবার ৬৮টি! সুতরাং নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা তুললে অভিযোগের আঙুল আপনাদের দিকেও যাবে।
এদিকে এনসিপি নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রকাশিত। এদের যদি রাজনৈতিক প্রজ্ঞা থাকত, তাহলে এই ছয়টি আসন নিয়েই একটা ইতিবাচক রাজনীতি নিয়ে এগিয়ে যেত। তারা তা না করে সরকারি দলের বিষোদগার করে যাচ্ছে। একটা কথা তাদের মাথায় রাখতে হবে, এদেশের মানুষ গালাগালি পছন্দ করে না। ইতিবাচক সমালোচনাকে জনগণ ছাগত জানায়। স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য বলছি, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাসদ রাজনীতির অভ্যুদয় ঘটে। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে ৯ আসনে নির্বাচিত হয়। কিন্তু ভুলে ভরা জাসদ এখন মাইক্রোস্পিক দল। সুতরাং রাজনীতিতে স্কুলের কোনো সংশোধন নেই।
সবশেষে সিসিফাস সম্পর্কে উপন্যাসিক এবং দার্শনিক আলবেয়ার ক্যামু যা বলেছেন তা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ক্যামু বলেছেন,
সিসিফাস যখন পাথরটিকে নিচে গড়িয়ে পড়তে দেখে। তখন সে তার নিয়তি বা শান্তির কথা পুরোপুরি সচেতনভাবে উপলব্ধি করে। এই সচেতনতাই সিসিফাসের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। সে ভাগ্যকে মেনে নিয়ে বা হতাশ হয়ে আত্মহত্যা করে না। বরং সমস্ত অর্থহীনতা জেনেও মাথা উচু করে পুনরায় পাথরটি ঠেলতে যায়। এই নিরন্তর সংগ্রামই হলো অস্তিত্বের সংগ্রাম। বাংলাদেশের জনগণ হচেছ, সিসিফাস। যুগে, যুগে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার বেদখল হয়ে যায়। সেই অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য। সংগ্রাম করে এবং বিজয়ী হয়।
লেখক-
শাহীন রাজা: সিনিয়র সাংবাদিক।