দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমা পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের তরুণদের সামনে সত্যিকার অর্থে উদযাপন করার মতো একটি বড় উপলক্ষ এসেছে- আর তা হলো তারুণ্যের আইকন হিসেবে খ্যাত তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির সরকার গঠন, যাদের নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঘোষণায় দেশের লাখ লাখ তরুণ নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রতিশ্রুতি, তাই এটিকে আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। আর ঠিক এ কারণেই শুধু হাততালি দিয়ে বা প্রশংসা করেই আমাদের থেমে থাকা উচিত নয়। বরং সরকারের সামনে আমাদের এই কঠিন প্রশ্নটি রাখা উচিত যে, তারা ঠিক কোন পদ্ধতিতে এত সংখ্যক তরুণের চাকরি নিশ্চিত হবে। কারণ মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শত শত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান (SME) বন্ধ হয়ে গেছে।
কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যখন তাদের দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে, তখন চাকরিপ্রার্থীরা মরিয়া হয়ে সরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকছেন। এক্ষেত্রে সরকার তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে সরকারি চাকরির খাত বাড়ানোর কথা চিন্তা করতে পারে। কিন্তু সত্যিকারের অর্থনৈতিক অগ্রগতি কেবল সরকারি চাকরির খাত বাড়িয়ে অর্জন করা যায় না, বরং এর জন্য এমন একটি উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হয় যেখানে এসএমইগুলো সহজে টিকে থাকতে পারে, বিকশিত হতে পারে, ও নিজেরাই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে। হিসাবটা খুবই সোজা: বাংলাদেশ যদি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলতে পারে এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে গড়ে ১০ থেকে ২০ জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়, তবে ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে সরকার অনেক দুর এগিয়ে যাবে। তবে পরম পরিতাপের বিষয় হল, বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে অনেকগুলো কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে যা একে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিচ্ছে। বাংলাদেশ নতুন কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শুরু করতে ব্যাংকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা (Paid-up Capital) দেখানো, তা জোগাড় করতে না পারলে ৮০% জরিমানার বিধান, ও লোকসানের সম্মুখীন হলে উদ্যোক্তাদের সম্মানজনক এক্সিট পলিসির অভাব তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও আর্থিক বাধা।
পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, এবং কর ও ভ্যাট থেকে অব্যাহতি, জামানতবিহীন স্টার্টআপ তহবিল, স্বল্প বা শূন্য সুদে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল পাওয়ার সুযোগ ও কাঁচামাল আমদানিতে কম শুল্ক ধার্য করার মতো আর্থিক প্রণোদনাসমূহের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এছাড়াও জেলা পর্যায়ের ইনকিউবেশন সেন্টার, মেন্টরশিপ নেটওয়ার্ক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রমে উদ্যোক্তা বিষয়ক কোর্সের অন্তর্ভুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং খাতের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং একটি শক্তিশালী দুর্নীতিবিরোধী ডিজিটাল ব্যবস্থার অভাবে বাংলাদেশে উদ্যোক্তা বান্ধব ইকোসিস্টেম পরিপূর্ণভাবে প্রস্ফুটিত হতে পারছেনা। উদ্যোক্তা হওয়ার পথে থাকা এই কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতাগুলো আমরা যদি সমূলে উৎপাটন করতে না করি, তবে অতীতের অনেক প্রতিশ্রুতির মতোই ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কেবল কাগজে-কলমেই থেকে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
বাংলাদেশের একজন তরুণ উদ্যোক্তা বাস্তবে কী ধরনের বাধার মুখোমুখি হন এবং সেই বাধাগুলো দূর করতে কী ধরনের কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন তা আমার নিজের উদ্যোক্তা জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে এই লেখার মাধ্যমে তুলে ধরতে চেষ্টা করব।
বর্তমান প্রেক্ষাপট: উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাসমূহ
বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো পেইড আপ ক্যাপিটাল বা পরিশোধিত মূলধন। সরকারের নিয়ম অনুযায়ী, নতুন উদ্যোক্তাদের অবশ্যই কমপক্ষে দশ লাখ টাকার একটি পরিশোধিত মূলধন অ্যাকাউন্টে জমা করতে হবে। এই শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হলে একটি বড় অঙ্কের জরিমানা দিতে হয়, যা প্রয়োজনীয় পরিমাণের ৮০%। এক্ষেত্রে আমার একটি তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০১৩ সালে, জাপানে থাকাকালীন, আমি বেকার বাংলাদেশী যুবকদের আইটি সেক্টরে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্যে এবং তাদের আউটসোর্সিংয়ের সুযোগ করে দেওয়ার লক্ষ্যে ব্যাকবোন লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করি। ১০ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের শর্ত পূরণের আর্থিক সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও, আমি দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কোম্পানিটি শুরু করি। তবে পরিশোধিত মূলধন জোগাড় করতে না পারার কারণে ৮ লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হয়, যা আবেগ এবং সাহস দ্বারা চালিত নবীন উদ্যোগের জন্য একটি বড় ধরণের ধাক্কা ছিল।
নতুন ব্যবসা শুরু করার জন্য যেসব আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, সেগুলো অনেক সময় জটিল এবং সময়সাপেক্ষ হতে পারে। বিশ্ব ব্যাংকের “Doing Business 2020” প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে একটি নতুন ব্যবসা শুরু করতে গড়ে ১৯.৫ দিন সময় লাগে, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড় (৬.৮ দিন) এবং উচ্চ আয়ের দেশগুলোর গড় (৪.২ দিন) থেকে অনেক বেশি। বাংলাদেশের কর ব্যবস্থা বেশ জটিল, যা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিভ্রান্তিকর হতে পারে। বিভিন্ন ধরনের কর, রিটার্ন দাখিলের নিয়মকানুন এবং কর পরিশোধের পদ্ধতি বোঝা এবং সঠিকভাবে অনুসরণ করা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। বিশ্ব ব্যাংকের “Paying Taxes 2020” প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে একটি মাঝারি আকারের কোম্পানিকে বছরে গড়ে ২৪১ ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয় কর পরিশোধের জন্য, যা বিশ্বের গড় (১৬১ ঘণ্টা) থেকে অনেক বেশি। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশের কর ব্যবস্থা অনেক জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। International Finance Corporation (IFC) এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৬০% এর বেশি ব্যবসায়ী মনে করেন যে, কর ব্যবস্থা খুবই জটিল এবং এটি তাদের ব্যবসার জন্য একটি বড় বাধা।
বাংলাদেশের সমাজে সাধারণত নিরাপদ এবং প্রচলিত পেশার প্রতি একটা ঝোঁক লক্ষ্য করা যায়। নতুন কিছু করার চেষ্টা বা ঝুঁকি নেওয়ার প্রতি অনেক সময়ই পরিবার ও সমাজ থেকে নেতিবাচক মনোভাব দেখা যায়। এটি উদ্যোক্তাদের মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা ও সংশয়ের সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের সমাজে সরকারি বা বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি করাকে অনেক বেশি মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। এছাড়াও বিয়ের বাজারেও এই ধরণের পাত্রের চাহিদা সাধারণত বেশি হয়। এর ফলে অনেকেই নিজস্ব ব্যবসা শুরু করার চিন্তা করতে দ্বিধাবোধ করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, দেশের মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যার মাত্র ৪.৪% নিজস্ব ব্যবসায় নিয়োজিত। এটি উদ্যোক্তা হওয়ার প্রতি আমাদের সমাজে অনাগ্রহের ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির ক্ষেত্রে দুর্নীতি একটি প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। নতুন ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহী ব্যক্তিদের প্রতিটি ধাপে দুর্নীতির সম্মুখীন হতে হয়, যা তাদের উদ্যোগী মনোভাবকে নিরুৎসাহিত করে এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে। বাংলাদেশে নতুন ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহী উদ্যোক্তাদের গড়ে ৯টি সরকারি দপ্তরের সাথে যোগাযোগ করতে হয় এবং বিভিন্ন ধরনের অনুমতি ও লাইসেন্স নিতে হয়। দুর্নীতির কারণে এই প্রক্রিয়াগুলো দীর্ঘ, জটিল এবং ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। সিপিডি দ্বারা পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৬৮.১৮% উত্তরদাতা দুর্নীতিকে ব্যবসার সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারি নীতিমালা প্রায়শই জটিল এবং একে অপরের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, যা উদ্যোক্তাদের জন্য বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে এবং তাদের ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে। একটি নতুন কারখানা স্থাপনের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এই ছাড়পত্র প্রাপ্তির প্রক্রিয়া অনেক সময় দীর্ঘ ও জটিল, যা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। বিশ্ব ব্যাংকের “Doing Business 2020” প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে নির্মাণ অনুমতি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ১৯০টি দেশের মধ্যে ১৭৫তম স্থানে রয়েছে। এর একটি প্রধান কারণ হলো পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রাপ্তির জটিলতা। বিশ্ব ব্যাংকের “Doing Business 2020” প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করার সহজলভ্যতার স্কোর ৬২.৮ (০ থেকে ১০০ এর মধ্যে), যা উচ্চ আয়ের দেশগুলোর গড় স্কোর ৮২.৩ এর চেয়ে অনেক কম। এর একটি প্রধান কারণ হলো সরকারের নীতি সংক্রান্ত জটিলতা।
যেখানে ভারতের আইআইটির শিক্ষার্থীরা শুধু তাদের হোস্টেলের ঠিকানা দিয়ে ৪০ হাজারেরও বেশি কোম্পানি চালু করতে পেরেছে, সেখানে বাংলাদেশে বিভিন্ন নীতিমালাজনিত জটিলতার কারণে অন্য ধরণের চিত্র দেখা যায়। বাংলাদেশে তরুণ উদ্যোক্তাদের অফিস নিবন্ধনের জন্য বাধ্যতামূলক বাণিজ্যিক স্থান, ট্রেড লাইসেন্স অর্জন, এবং প্রাথমিক পর্যায়ে উচ্চ ব্যয়ের মত বিভিন্ন কঠোর শর্তের মুখোমুখি হতে হয়। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে, এই পূর্বশর্তগুলি বিশেষ করে সীমিত আর্থিক সংস্থানের শিক্ষার্থী এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অনেক বড় ধরণের বাধার সৃষ্টি করে।
উত্তরণের উপায়: প্রস্তাবিত সমাধানসমূহ
১. পরিশোধিত মূলধন (Paid-up Capital) সংক্রান্ত নীতিমালার আমূল সংস্কার
বর্তমানে বাংলাদেশে সব ধরনের কোম্পানি নিবন্ধনের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পরিশোধিত মূলধন (পেইড-আপ ক্যাপিটাল) প্রয়োজন হয় সেটি সংশোধন করে Tiered paid-up capital বা স্তর-ভিত্তিক পেইড-আপ ক্যাপিটাল বা পরিশোধিত মূলধন চালু করা যেতে পারে, যেখানে ব্যবসার ধরন ও আকারের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন স্তরের ব্যবসার জন্য বিভিন্ন ধরণের মূলধন নির্ধারণ করা হবে। এর ফলে ছোট ও মাঝারি আকারের ব্যবসা, বিশেষ করে সেবা খাতের ব্যবসা, তুলনামূলকভাবে কম মূলধনে শুরু করা যাবে। মূলধন জোগাড় করতে না পারলে বিশাল অঙ্কের জরিমানার যে নিয়ম রয়েছে, তা দ্রুত বাতিল করতে হবে। এটি তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও আর্থিক বাধা। কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যদি লোকসানের কারণে বন্ধ করে দিতে হয়, তবে উদ্যোক্তা যেন কোনো ধরনের আইনি হয়রানি বা সামাজিক অপমানের শিকার না হয়ে সহজেই ব্যবসাটি গুটিয়ে নিতে পারেন, সেই নীতি বা নিয়ম চালু করতে হবে।
২. অনলাইনভিত্তিক ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ (Plug and Play) পলিসি বাস্তবায়ন
বাংলাদেশে উদ্যোক্তা সৃষ্টির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে পরিচিত আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমাতে একটি কার্যকর অনলাইন হাব তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। সরকারি দপ্তরগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধি করে ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ পলিসির আওতায় ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মত একক অনলাইন পোর্টাল চালু করতে হবে। এটি এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে তরুণ উদ্যোক্তারা জটিল আইনি প্রক্রিয়া বা সরকারি দপ্তরের আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্যের মধ্য দিয়ে না গিয়ে খুব সহজে অনলাইনে তাদের ব্যবসা শুরু করার সুযোগ পাবেন। উদ্যোক্তারা ঘরে বা যেকোনো জায়গায় অনলাইনে বসে মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে একটি কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন সম্পূর্ণ করে ফেলতে পারবেন। আমেরিকা বা অন্যান্য উন্নত দেশের ন্যায় এই পলিসির অধীনে উদ্যোক্তারা অনলাইনে একটি শেয়ার্ড অফিসের ঠিকানা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকানা ব্যবহার করে ব্যবসার নিবন্ধন করতে পারবেন। এর ফলে শুরুতেই আলাদা কোনো বাণিজ্যিক স্পেস বা অফিস ভাড়া নেওয়ার চাপ থাকবে না। এই প্রক্রিয়ায় ঘরে বসেই ন্যাশনাল আইডি (NID) কার্ড এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট একটি নির্দিষ্ট অনলাইন সফটওয়্যারে আপলোড করার মাধ্যমে জয়েন্ট স্টকের অধীনে অনলাইনেই পুরো কোম্পানি গঠন করে ফেলা যাবে। নিবন্ধনের জন্য সশরীরে কোনো অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না - এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা হয়রানির সুযোগ না থাকে।
৩. সম্প্রসারিত আর্থিক প্রণোদনা ও বিনিয়োগ সুবিধা:
ব্যবসার শুরুতে টিকে থাকার লড়াইয়ে সাহায্য করতে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য একটি শক্তিশালী আর্থিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করতে হবে:
ট্যাক্স ও ভ্যাট হলিডে: নতুন স্টার্টআপ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রথম ৫ বছরের জন্য ট্যাক্স এবং ভ্যাট থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দিতে হবে।
জামানতবিহীন ঋণ ও ফ্লেক্সিবল ক্যাপিটাল: ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সম্পূর্ণ জামানতবিহীন (Collateral-free) এবং স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।
সিড ফান্ড ও সিএসআর (CSR) অনুদান: তরুণদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি মূলধন তহবিল গঠন করতে হবে। পাশাপাশি, বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সিএসআর ফান্ডের একটি নির্দিষ্ট অংশ স্টার্টআপদের অনুদান হিসেবে দেওয়ার নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে।
অপারেশনাল ভর্তুকি: উৎপাদনশীল ও আইটি খাতের নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য প্রথম কয়েক বছর অফিস স্পেস, বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট বিলে সরকারি ভর্তুকি প্রদান করা যেতে পারে।
৪. উদ্যোক্তামুখী শিক্ষাব্যবস্থা:
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষাক্রমে উদ্যোক্তা বিষয়ক কোর্সগুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কারিগরি ও সাধারণ উভয় শিক্ষাব্যবস্থাতেই মার্কেটিং, ফাইন্যান্স ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত কোর্সগুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে যেন একজন ইঞ্জিনিয়ার তার নিজ পণ্যের সঠিক ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও বিপণন নিজেই সম্পন্ন করতে পারে। পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি বা বেসরকারি সহায়তায় ‘ইনকিউবেশন সেন্টার’ স্থাপন করতে হবে, যাতে তরুণরা সঠিক দিকনির্দেশনা পায়।
পরিশেষে, পলিসি বা নীতি ঘোষণা করাই শেষ কথা নয়, এর সফল বাস্তবায়নই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের আগামী দিনের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির আড়ালে তরুণ সমাজকে শুধু দিবাস্বপ্ন না দেখিয়ে কাঠামোগত সংস্কার সাধনের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের জন্য একটি অবাধ ও সহযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলেই, ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রকৃত বাস্তবায়ন এবং বেকারত্বের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করা সম্ভব বলে আমি মনে করি।
লেখক:
মাহিন মতিন
ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যান, ব্যাকবন লিমিটেড