প্রকৃতি মানুষের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নদী, বন, পাহাড়, জলাভূমি, বায়ু ও জীববৈচিত্র্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই পৃথিবীই আমাদের জীবন ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন। অথচ উন্নয়নের নামে নির্বিচারে বন উজাড়, নদী দখল ও দূষণ, শিল্পবর্জ্যের অনিয়ন্ত্রিত নিঃসরণ, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহারের কারণে আজ পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে। এই সংকটময় সময়ে পরিবেশ সংরক্ষণের আন্দোলনে সাংবাদিকতা হয়ে উঠেছে সবচেয়ে কার্যকর, শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল সামাজিক শক্তিগুলোর একটি।
প্রতিবছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস বিশ্ববাসীকে পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। দিবসটি শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার এক বৈশ্বিক আহ্বান। আর এই আহ্বানকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে গণমাধ্যম ও সাংবাদিক সমাজ।
সাংবাদিকতা কেবল ঘটনা বর্ণনার কাজ নয়; এটি সত্য উদঘাটনের একটি শক্তিশালী প্রক্রিয়া। পরিবেশ সাংবাদিকতা সেই সত্যকে তুলে ধরে, যা অনেক সময় ক্ষমতাবান গোষ্ঠী, অসাধু ব্যবসায়ী কিংবা স্বার্থান্বেষী মহল আড়াল করতে চায়। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নদী দখলের চিত্র উন্মোচন করতে পারে, একটি তথ্যভিত্তিক সংবাদ বনভূমি ধ্বংসের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে পারে, আবার একটি সচিত্র প্রতিবেদন দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্দশা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরিবেশ সাংবাদিকতার গুরুত্ব আরও বেশি। নদীমাতৃক এই দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, খরা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং তাপমাত্রার অস্বাভাবিক পরিবর্তন প্রতিনিয়ত মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে। এসব বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, বৈজ্ঞানিক তথ্য তুলে ধরা এবং নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে সাংবাদিকদের ভূমিকা অপরিসীম।
পরিবেশবিষয়ক সংবাদ প্রকাশের ফলে বহু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হয়েছে, নদী উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়েছে, দূষণকারী কারখানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং পরিবেশ রক্ষায় নতুন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। গণমাধ্যমের ধারাবাহিক প্রচারণা অনেক সময় জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। এটাই সাংবাদিকতার শক্তি, এটাই গণমাধ্যমের সামাজিক দায়বদ্ধতা।
একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল যুগে পরিবেশ সাংবাদিকতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। অনলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, তথ্যচিত্র, ড্রোন প্রযুক্তি এবং মাল্টিমিডিয়া প্রতিবেদনের মাধ্যমে পরিবেশের বাস্তব চিত্র দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে পরিবেশবিষয়ক কোনো ঘটনা আর নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; মুহূর্তের মধ্যে তা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
তবে পরিবেশ সাংবাদিকতা সহজ কোনো কাজ নয়। অনেক সময় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরোধিতা, তথ্যপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা এবং নানা ধরনের চাপ মোকাবিলা করে সাংবাদিকদের কাজ করতে হয়। তারপরও সত্য ও জনস্বার্থের পক্ষে অবস্থান নিয়ে পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ে তারা অবিচল থাকেন। কারণ একটি নদীর মৃত্যু শুধু একটি নদীর মৃত্যু নয়; এটি একটি অঞ্চলের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর আঘাত। একটি বন ধ্বংস হওয়া মানে শুধু গাছ কাটা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলা।
আজ যখন পৃথিবী জলবায়ু সংকটের এক ভয়াবহ সময় অতিক্রম করছে, তখন পরিবেশ সাংবাদিকতা হয়ে উঠেছে মানবসভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম হাতিয়ার। সাংবাদিকদের দায়িত্ব শুধু সমস্যা তুলে ধরা নয়; বরং সম্ভাবনার পথও দেখানো। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ, টেকসই কৃষি এবং প্রকৃতি সংরক্ষণে সফল উদাহরণগুলোও গণমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের নতুন করে শপথ নেওয়ার সুযোগ এনে দেয়। প্রকৃতিকে রক্ষা করা মানে নিজেদের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা। আর এই মহৎ দায়িত্ব পালনে সাংবাদিকতা হলো সচেতনতার বাতিঘর, সত্যের নির্ভীক কণ্ঠস্বর এবং পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
আসুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমরা পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন, প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার প্রতি আমাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করি। কারণ একটি সবুজ, নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গঠনে সাংবাদিকদের কলম, ক্যামেরা ও সত্যনিষ্ঠ প্রতিবেদন হতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী পরিবর্তনের হাতিয়ার।
প্রকৃতি বাঁচলে পৃথিবী বাঁচবে, আর পরিবেশ রক্ষার এই সংগ্রামে সাংবাদিকতা থাকবে সবসময় সম্মুখসারির যোদ্ধা হয়ে।
লেখক:
শাহ্ নাফিউল্লাহ সৈকত
গণমাধ্যমকর্মী
ই-মেইল: [email protected]