মাদারীপুরের রাজৈর ইউনিয়ন পরিষদে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে চলা এক নজিরবিহীন ‘ভারপ্রাপ্ত রাজত্ব’-এর অবসান ঘটতে যাচ্ছে। জাতীয় দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকায় চাঞ্চল্যকর খবর প্রকাশের পর অবশেষে কঠোর অ্যাকশনে নেমেছে প্রশাসন। দুর্নীতি ও অনিয়ম ঢাকতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে উল্টো মিথ্যা চাঁদাবাজির সাজানো অভিযোগ এনে পার পাওয়ার শেষ রক্ষাও হলো না বিতর্কিত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান চায়না বেগমের। সুশাসনের স্বার্থে তাকে চূড়ান্ত অব্যাহতি প্রদান এবং অনতিবিলম্বে সরকারি 'প্রশাসক' নিয়োগের জন্য মাদারীপুর জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয় থেকে স্মারক সম্বলিত একটি নির্দেশনা পত্র রাজৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নিকট এসে পৌঁছেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ মে ২০২৬ তারিখে যায়যায়দিন পত্রিকায় “রাজৈরে অনিয়ম ঢাকতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চেয়ারম্যানের মিথ্যা অভিযোগ” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই সংবাদটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয় এবং প্রশাসনের উচ্চমহলের সরাসরি নজরে আসে। প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণসহ উঠে এসেছিল কীভাবে গ্রামীণ অবকাঠামোর সরকারি টাকা আত্মসাৎ, অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে নাগরিক প্রত্যয়নপত্র বিক্রি এবং ইউনিয়ন পরিষদের কক্ষ ভাড়া দিয়ে সরকারি কোষাগারে টাকা জমা না করে নিজের পকেটে ভরছিলেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান চায়না বেগম। গত ২০ এপ্রিল এই দুর্নীতির তথ্য ও বক্তব্য নিতে গিয়ে স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক তাঁর কার্যালয়ে হেনস্তার শিকার হন। পরবর্তীতে নিজেকে বাঁচাতে ইউএনও বরাবর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কাল্পনিক চাঁদাবাজির মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেছিলেন তিনি।
আইন অনুযায়ী 'ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান' পদটি একটি জরুরি ও সাময়িক ব্যবস্থা মাত্র। কিন্তু রাজৈর ইউনিয়নে সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল ২০১১ সালে। এরপর দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কোনো এক রহস্যময় কারণে আর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এই সুযোগে ২০১১ সাল থেকে বর্তমান ২০২৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে টানা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের চেয়ার আঁকড়ে ধরে একক রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছিলেন চায়না বেগম।
এদিকে তাঁর অব্যাহতি ও নতুন প্রশাসক নিয়োগের দাপ্তরিক চিঠি পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজৈর ইউনিয়নে সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি থাকা নাগরিক সেবা এখন দুর্নীতিমুক্ত হবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "টাকা ছাড়া একটা সই বা ওয়ারিশ সার্টিফিকেটও মিলত না এই ইউনিয়নে। অবশেষে সাংবাদিকদের লেখনী ও প্রশাসনের অ্যাকশনে আমরা এই শোষণ থেকে মুক্তি পাচ্ছি।"
এই বিষয়ে রাজৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের স্মারক সম্বলিত নির্দেশনা পত্রটি তাঁরা হাতে পেয়েছেন। নীতিমালার বাইরে গিয়ে এত দীর্ঘ সময় ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এবং উপরন্তু সাংবাদিকদের পেশাগত কাজে বাধা দিয়ে মিথ্যা অভিযোগ দায়েরের পুরো বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। সরকারি আদেশ অনুযায়ী দ্রুততম সময়ের মধ্যে চায়না বেগমের দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে এবং সেখানে সাধারণ জনগণের নির্বিঘ্ন সেবা নিশ্চিত করতে একজন সরকারি কর্মকর্তাকে 'প্রশাসক' হিসেবে দায়িত্ব অর্পণ করা হবে।