ঢাকা | শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাহাতাবের জালিয়াতি ফাঁস

অন্যতম সহযোগী মাসুম বিল্লাহ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে করেছেন অঢেল সম্পদ

author
মোঃ আ‌তিয়ার রহমান, খুলনা

প্রকাশিত : ৭ জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৫১
ad003
বারবার জালিয়াতি, জেনেশুনে তথ্য গোপন, আর একের পর এক বদলি ও পদায়ন বাতিলের আদেশ সাধারণ কোনো সরকারি কর্মচারীর ক্ষেত্রে এমনটা ঘটলে এতদিনে হয়তো চাকরি খোয়াতে হতো কিংবা গুনতে হতো জেল-জরিমানা। 

কিন্তু খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (গ্রেড-১৪) এম. এম. জাহাতাব হোসেনের ক্ষেত্রে গল্পটা ভিন্ন। প্রশ্ন উঠেছে, একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পরও এবং বারবার পদায়ন বাতিল হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে তিনি একই দপ্তরে বহাল তবিয়তে আছেন? এতবার বদলি আর পদ বাতিলের পরও যার টনক নড়ে না, সেই জাহাতাবের আসল ‘খুঁটির জোর’ কোথায় এখন এটাই স্বাস্থ্য বিভাগের সবচেয়ে বড় রহস্য!

জালিয়াতি ও অসঙ্গতির বেড়াজালে পদায়ন: আদেশের ভেতরে আদেশ বাতিল। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এম. এম. জাহাতাব হোসেনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদায়নের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই ছিল চরম অসঙ্গতি ও জালিয়াতির ছায়া। ২০১৮ সালের প্রচলিত নিয়োগ বিধিমালা এবং অনুমোদিত ‘জব ডিসক্রিপশন’ (কর্ম-পরিধি) সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে তাকে দ্বিতীয় শ্রেণির পদ থেকে প্রথম শ্রেণির সমপর্যায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তদন্তে এই জালিয়াতি ও জেনেশুনে তথ্য গোপনের প্রমাণ মেলায় খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় থেকে জারি করা এক বিশেষ প্রশাসনিক আদেশে তাঁর প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদের পূর্বের সব আদেশ বাতিল করা হয়।

 একই সঙ্গে তাঁকে তাঁর পূর্বের মূল পদে ফেরত যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং অবৈধভাবে নেওয়া আর্থিক সুবিধা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ারও আদেশ হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এত বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পরও অদৃশ্য এক ক্ষমতার ডানা ভর করে তিনি এখনো স্বাস্থ্য প্রশাসনের ক্ষমতার অলিন্দে ঘোরাফেরা করছেন। নিজ সিন্ডিকেট নিয়ে রয়েছেন বহাল তবিয়তে।

সিন্ডিকেট রাজ ও বদলিবাণিজ্যের ‘হোতা’: খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনে এম. এম. জাহাতাব হোসেনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী অনানুষ্ঠানিক ‘ক্ষমতাকেন্দ্র’ বা প্রশাসনিক সিন্ডিকেট। প্রধান সহকারী মো. মাসুম বিল্লাহসহ কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মচারীকে সাথে নিয়ে তিনি এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি, সংযুক্তি ও পদায়নকে পুঁজি করে এই সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে ‘বদলিবাণিজ্য’ চালিয়ে আসছে। দীর্ঘদিন একই দপ্তরে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকার সুবাদে পুরো খুলনা বিভাগের স্বাস্থ্য খাতের নথি ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এই এম. এম. জাহাতাব হোসেনের ইশারাতেই নিয়ন্ত্রিত হতো।

এম. এম. জাহাতাব হোসেনের অনিয়মের হাত কতদূর বিস্তৃত! তার প্রমাণ মেলে তথ্য অধিকার আইনের একটি ঘটনায়। এক সাংবাদিক তাঁর চাকরিসংক্রান্ত এবং নিয়োগের অসঙ্গতি নিয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করলে তিনি নিজের অপরাধ ঢাকতে তথ্য সরবরাহ না করে তা সম্পূর্ণ গোপন করেন। 

এ কাজে তার অন্যতম সহযোগী ছিলেন মাসুম বিল্লাহ। পরবর্তীতে তথ্য গোপন করার এই ধৃষ্টতার বিরুদ্ধে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় বরাবর লিগ্যাল নোটিশও পাঠানো হয়। জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য এভাবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা প্রমাণ করে যে, তিনি নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে মনে করেন।

সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী এম. এম. জাহাতাব হোসেনের এই ধরনের কার্যক্রম স্পষ্ট ‘অসদাচরণ’ এবং গুরুতর অপরাধের শামিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ইতিপূর্বে তার বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগনামা (শোকজ) জারি করে জানতে চাওয়া হয়েছিলÑকেন তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না? কিন্তু রহস্যজনকভাবে, ওপর মহলের অদৃশ্য ইশারায় সেই তদন্তের গতি থমকে যায়।

জনগণের দাবি: এবার উপড়ে ফেলা হোক ‘খুঁটি’
করোনা মহামারির সময়ও যিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন, সেই এম. এম. জাহাতাব হোসেনের খুঁটির জোর ভাঙতে এবার সোচ্চার সাধারণ মানুষ ও স্বাস্থ্য খাতের সৎ কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্ট মহলের একাধিক কর্মকর্তার দাবি, খুলনা স্বাস্থ্য বিভাগের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনতে হলে অবিলম্বে এই বিতর্কিত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত এই ‘সিন্ডিকেট প্রধানের’ অবৈধ সম্পদের খোঁজ নেওয়া এবং তার খুঁটির জোর যত ওপরেই হোক না কেন, তা উপড়ে ফেলে স্বাস্থ্য প্রশাসনকে দৃষ্টান্ত মূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT