ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) শিশু, নারীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে ঠেলে পাঠানো (পুশইন) ঠেকাতে সুনামগঞ্জসহ দেশের সীমান্তবর্তী ২৬ জেলায় সর্বোচ্চ সতর্কতা ও নজরদারি বাড়িয়েছে বিজিবি। চার পালায় (সিপ্টে) ২৪ ঘণ্টা তাঁরা সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন। সীমান্তের বিভিন্ন জায়গায় স্থানীয় লোকজনও তাঁদের সহযোগিতা করছেন। বিশেষ করে রাতের আঁধারে বিএসএফকে জোরালো উপস্থিতির কথা জানান দেওয়ার জন্য বিজিবি মেগাফোন, সার্চলাইট এবং মাইকিং করছে। এলাকার লোকজন এবং আনসার বাহিনীও ওইসময় টহল কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছে।
সুনামগঞ্জ জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে ছয়টি উপজেলার সঙ্গে ভারতের ১২০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে মধ্যনগর উপজেলার ৭ কিলোমিটার নেত্রকোনা ব্যাটালিয়নে এবং ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার ২৩ কিলোমিটার সিলেট ব্যাটালিয়নের অন্তর্ভুক্ত। এর বাইরে ৯০ কিলোমিটার সীমান্ত সুনামগঞ্জ বিজিবির ২৮ ব্যাটালিয়নের অধীন। সুনামগঞ্জ ব্যাটালিয়নের আওতাধীন ৯০ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে ৮৯ কিলোমিটার স্থলসীমা ও ১ কিলোমিটার জলসীমা। সুনামগঞ্জ জেলার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো অত্যন্ত দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকা। কিছু কিছু স্থান কাঁটাতারের বেড়াবিহীন রয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশইনের অপচেষ্টা চলমান থাকলেও সুনামগঞ্জ সীমান্তে জনবল বৃদ্ধির মাধ্যমে বিজিবির টহল জোরদারের পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করায় এখানে পুশইনের ঘটনা ঘটে নি।
তবে ২০২৫ সালে চারদফায় সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার ছনবাড়ি—নোয়াকোট সীমান্ত দিয়ে নারী—পুরুষ ও শিশুসহ ৭৪ জন পুশইন করেছিল ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। বিজিবির প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, পুশইনকৃত সকলেই বাংলাদেশী নাগরিক ছিলেন। যারা ইতোপূর্বে অবৈধভাবে বিভিন্ন সময়ে ভারতে যান। গত বছরের ২৮ মে ছাতকের ছনবাড়ি—নোয়াকোট সীমান্ত দিয়ে ১৬ জন ও ১২ জুন ১৭ জন, ২৪ জুন ২০ জন ও ১৬ জুলাই ২১ জনকে পুশইন করে বিএসএফ। ছাতকে আটককৃত ৭৪ জনের মধ্যে ৭৩ জনই সিলেট, যশোর, নড়াইল, সাতক্ষীরা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, পাবনা জেলার বাসিন্দা ছিলেন। সর্বশেষ গত ১৬ জুলাই সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক সীমান্তে আটককৃত ২১ জনের মধ্যে একজন ছিলেন ছাতক উপজেলার মোছা. ফাতেমা (২২) নামে এক জন। সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দাদের মধ্যে তিনিই প্রথম পুশইনকৃত ব্যক্তি। মোছা. ফাতেমা উপজেলার মুক্তিরগাঁও গ্রামের মৃত. শামসুদ্দিনের মেয়ে।
বিজিবির সদর দপ্তর সূত্র জানায়, যে ২৬ জেলার সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে পুশইনের চেষ্টা করা হতে পারে সেগুলো চিহ্নিত করে সেসব স্থানে বিজিবির টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। জেলাগুলো হলো— সুনামগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, যশোর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, ফেনী, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, খাগড়াছড়ি, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, কুমিল্লা, সিলেট, হবিগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নীলফামারী, পঞ্চগড়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও শেরপুর। দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ৬০ হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর আগে একসঙ্গে এত বিজিবি সদস্য এসব সীমান্তে দায়িত্ব পালন করতেন না।
এদিকে পুশইন ঠেকাতে সুনামগঞ্জ জেলার প্রত্যেকটি বিওপির সীমান্ত এলাকায় স্থানীয়দের সাথে নিয়ে মাইকিং করা হচ্ছে। বিশেষ করে কাঁটাতারবিহীন সীমান্ত এলাকার চিনাকান্দি বিওপির আশেপাশে মধ্যরাতে টহল জোরদার করা হয়েছে এবং মাইকিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এলাকার লোকজন এবং আনসার বাহিনীও ওই সময় টহল কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছে।
বিজিবির উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেছেন, ভারতের পাঁচ রাজ্যের সঙ্গে দেশের ২৬ জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে ৪ হাজার ৪৮৭ কিলোমিটার সীমান্তে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করতে ৬০ হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া সাদাপোশাকে বিজিবি সদস্যরা গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছেন।
চিনাকান্দি বিওপির পাশ্বর্বর্তী ঘামাইতলা গ্রামের বাসিন্দা মো. সাঈদ বলেন, আমাদের চিনাকান্দি বিওপির সীমান্ত এলাকায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা করেছে বিজিবি। আমরা শুনেছি যে, ভারতীয় নাগরিকদেরকে জোর করে আমাদের দেশের সীমান্ত দিয়ে পাঠানো হচ্ছে। এজন্য সুনামগঞ্জ বিজিবি আগে থেকেই আমাদের সতর্ক করছেন। আমাদের সাথে নিয়ে মাইকিং করছেন। এছাড়াও আমরা যে কোনো তথ্য পেলে বিজিবিকে জানানোর আহবান করছেন। আমরাও তাদের সাথে রাত জেগে কাজ করছি।
একই গ্রামের বাসিন্দা আল—আমিন বলেন, বিজিবি দিন—রাত ২৪ ঘন্টা টহল দিচ্ছে, আমরাও সহযোগিতা করছি। সীমান্ত দিয়ে কোনো ভারতীয় নাগরিকদের পাঠানোর চেষ্টা করা হলে আমরা সাথে সাথে বিজিবিকে অবগত করব।
সুনামগঞ্জে বিজিবির ২৮ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ কে এম জাকারিয়া কাদির বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থান দিয়ে বিএসএফ কর্তৃক পুশইন করানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে সুনামগঞ্জ ব্যাটালিয়নের অধীনস্থ বর্ডার অবজারবেশন পোস্ট (বিওপি)—এর দায়িত্বপূর্ণ এলাকা দিয়ে এ ধরনের কোনো পুশইন যেন কোনো অবস্থাতেই না ঘটে সেজন্য বিজিবির সব বিওপিতে জনবল বৃদ্ধি করা হয়েছে। সীমান্তের সম্ভাব্য পুশইনের স্থানগুলো চিহ্নিত করে সেখানে সার্বক্ষণিক টহল জোরদার এবং গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধিসহ কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে। বিশেষ করে রাতের আঁধারে বিএসএফকে বিজিবির জোরালো উপস্থিতির কথা জানান দেওয়ার জন্য মেগাফোন, সার্চলাইট এবং মাইকিং করা হচ্ছে। সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবির পাশাপাশি স্থানীয় গ্রামবাসীদেরও সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সুনামগঞ্জের ৯০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় ১৯ টি বিওপির সীমান্ত জুড়ে সার্বক্ষণিক তৎপরতা জোরদার করার পাশাপাশি, যে ১২ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে কাঁটা তারের বেড়া নেই সেখানে জনবল বাড়ানোসহ ২৪ ঘন্টা টহল জোরদার এবং নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, পুশইন ছাড়াও সীমান্ত হত্যার অভিযোগ আছে বিএসএফের বিরুদ্ধে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিএসএফের হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যান। এ ছাড়া ২০২৪ সালে ৩০ জন এবং ২০২৩ সালে ৩১ জন বাংলাদেশি নাগরিক সীমান্তে নিহত হন।
এদিকে গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ কোনো ধরনের অবৈধ পুশ ইন বা পুশ ব্যাকের (ফেরত পাঠানো) পক্ষে নয়। এ কারণে সীমান্তে বিজিবিকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।