সারা দেশের মতো সারিয়াকান্দিতে তাপপ্রবাহ বইছে। মাঝে মধ্যে এক পশলা বৃষ্টি আবার কখনও কখনও প্রখর রোদ। ভ্যাপসা গরম আর তীব্র তাপদাহে অতিষ্ঠ জনজীবন। এমন মুহূর্তে মানুষজন হয়ে উঠছে তৃষ্ণার্ত। আর জ্যৈষ্ঠের কাঠফাটা রোদে দেহের পানির অভাব দূর করতে তালশাঁসের জুড়ি নেই। অসহনীয় গরমে অস্থির পথচারীদের এক মুহূর্তের জন্য হলেও তৃষ্ণায় স্বস্তি এনে দিচ্ছে কচি তালের শাঁস।
বৈশাখের দারুণ দহনে দগ্ধ হচ্ছে চরাচর। একই সঙ্গে গ্রীষ্ম তার ডালা সাজাতে শুরু করেছে নানান স্বাদের ফলসম্ভারে। বাজারে ঝুড়ির ভেতর থেকে এর মধ্যেই উঁকি দিতে শুরু করেছে লাল লিচুর গুচ্ছ। পাকা আম বাঙ্গি কাঁঠাল। এছাড়াও কচি রসালো সুমিষ্ট তালশাঁস বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে ও বাজারে।
ছোটবেলায় পাঠ্যবইয়ে আমরা সবাই পড়ে ছিলাম,খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীনের লিখা কবিতা‘ ঐ দেখা যায় তালগাছ , ঐ আমাদের গাঁ, ঐখানেতে বাস করে কানাবগির ছা’—এই চরণগুলো শিশুমনে একটা চিরস্থায়ী ছাপ ফেলে গেছে। গাঁয়ে এখন বকের ছানা থাক বা না থাক, গাছগুলো ভরে উঠেছে কচি তালে। গ্রামের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে তা আসতে শুরু করেছে নগরের পরিসরে।
বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বললে তারা জানান, আম-লিচুসহ অন্য মৌসুমি ফলের ক্ষেত্রে রাসায়নিক ব্যবহারের আশঙ্কা থাকে। কিন্তু তালশাঁস দীর্ঘ সময় তরতাজা রাখার জন্য এসবের প্রয়োজন হয় না। ফলে গরমে তৃষ্ণা মেটানোর জন্য ডাবের পানির পাশাপাশি ক্রেতাদের কাছে ভেজালমুক্ত তালশাঁসের কদর বেশি। আবার গত কয়েক বছরে ইফতারের উপকরণ হিসেবেও তালশাঁসের জনপ্রিয়তা বেড়েছে।
উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন ভ্রাম্যমাণ দোকান নিয়ে বসছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। এক কুড়ি তালের শাঁসের দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা আর এক কুড়ি আস্ত তাল ৩০০ টাকায় বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। মৌসুম এ ফল কেউ কিনে দাঁড়িয়ে খাচ্ছেন, কেউবা নিয়ে যাচ্ছেন বাড়িতে।
সারিয়াকান্দি পৌর শহরের মুক্তিযোদ্ধা মোড় এলাকায় তালের শাঁস বিক্রি করছেন শফিকুল ইসলাম বাবু নামে এক ব্যক্তি। তাঁর বাড়ি উপজেলার বাড়ইপাড়া গ্রামে। গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহে হাঁসফাঁস করা মানুষগুলো ভিড় করছে তাঁর দোকানে। আর বাবু ধারালো দা দিয়ে তালের শাঁস বের করে তাঁদের চাহিদা মেটাচ্ছে।
তালের শাঁস বিক্রেতা বাবু জানান, প্রতিদিন তিনি ৩ থেকে আড়াই শ তাল কেটে বিক্রি করেন। প্রতিটি তালের ভেতর দুই থেকে তিনটি শাঁস থাকে এবং প্রতিটি তাল গড়ে ১৫ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হয়। গ্রামে গ্রামে ঘুরে এসব কচি তাল কিনে আনেন। তালের সংখ্যাভেদে একটি গাছের দাম পড়ে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা। গরম পড়লে তালের শাঁস অনেক বেশি বিক্রি হয়। প্রতি বছর তিনি এ মৌসুমে তালের শাঁস বিক্রি করেন।
কচি তাল কিনতে আসা সাথী বলেন, তীব্র গরমের কারণে বাজারে কচি তালের চাহিদা অনেক বেশি। যেহেতু কচি ডাবের দাম অনেক বেশি তাই সাধারণ মানুষ কচি তালের শাঁসের দিকে বেশি ঝুঁকছে। তবে চাহিদা বেশি থাকার কারণে কচি তালও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
স্কুল শিক্ষক আহসান হাবীব বলেন, একসময় উপজেলা ব্যাপি গ্রামে গ্রামে বড় বড় তাল গাছ ছিল। আগে রাস্তার পাশে তালের রস নিয়ে বসতো। যেভাবে তাল গাছ কাটা হচ্ছে তাতে এখন তালের শাঁস খেতে পারলেও কিছুদিন পর এগুলো আর পাওয়া যাবে না।
সরকারের কৃষি তথ্য সার্ভিসের ওয়েবসাইটে তালকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অপ্রচলিত ফল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ওয়েবসাইটে তালের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে বলা হচ্ছে, সব ধরনের ফল দেহের জন্য উপযোগী বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজসমৃদ্ধ। তবে তালে এর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ কিছু উপাদান আছে। অন্য ফলের তুলনায় এতে ক্যালসিয়াম, লৌহ, আঁশ ও ক্যালরির উপস্থিতি অনেক বেশি।
আবার পুষ্টিবিদরা বলছেন, তালশাঁসের বেশির ভাগ অংশ জলীয়। ফলে দ্রুত শরীর শীতল করার পাশাপাশি আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে শরীর দ্রুত পানি হারালে তা পূরণ করতে পারে। এ ছাড়া তালশাঁস শরীরের কোষের ক্ষয় প্রতিরোধ করে। ত্বকের সৌন্দর্য বাড়ায়। হাড় গঠনে সহায়তার পাশাপাশি সুস্থ দাঁতের নিশ্চয়তাও দেয়। ফলে সারা দিন রোজার পর অনেককেই পথের পাশের তালশাঁস বিক্রেতার কাছে ভিড় জমাতে দেখা যাচ্ছে।