সামরিক বিজ্ঞানের পরিভাষায় বহুল প্রচলিত সত্যটি হল, "অস্ত্র লড়াই করে না, লড়াই করে অস্ত্রের পেছনের মানুষটি।" রাষ্ট্র শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক রাইফেল, মিসাইল বা ড্রোন এনে তার বাহিনীর হাতে তুলে দিতে পারে। কিন্তু বাহিনীর ভেতরের মানুষগুলোর যদি লড়াই করার ‘মোটিভেশন’ না থাকে, তবে সংকটের প্রথম ধাক্কাতেই তারা সেই সব দামি অস্ত্র শত্রুর পায়ে সমর্পণ করে পালিয়ে যাবে। এইতো সেদিন, আমেরিকার প্রতক্ষ্য তত্ত্বাবধানে তৈরি আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত আফগান ন্যাশনাল আর্মির ৩ লাখের বেশি ট্রেইন্ড সৈন্য মার্কিন ড্রোনের সাপোর্ট থাকা সত্ত্বেও মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তালেবানদের সামনে শুধু মোটিভেশনের অভাবে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল।
পিপলস আর্মির মূল শক্তি কোনো কামিকাজে ড্রোন, কালাশনিকভ বা আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল নয়। এর সবচেয়ে অপরাজেয় এবং লক্ষ্যভেদী বুলেটের নাম হলো, "দৃঢ় মনস্তাত্ত্বিক মোটিভেশন"। এই মোটিভেশনের কোনো ফিজিক্যাল ফর্ম নেই, একে কোনো রাডারে ধরা যায় না, কোনো সাইবার কমান্ড দিয়ে হ্যাক করা যায় না, কিন্তু এটাই জনগণের বাহিনীর মুল শক্তি। তাই এই পর্বে জানাব, পিপলস আর্মির সেই আসল মোটিভেশনের উৎস কোথায়, কোন কোন কারণে এই মহাশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায় এবং কীভাবে সেই মোটিভেশনকে রক্ষা করা সম্ভব।
পিপলস আর্মির একজন সদস্যের লড়াইয়ের পেছনে কোনো অর্থনৈতিক লোভ বা বৈষয়িক মোহ থাকে না। একটি গণপ্রতিরোধ বাহিনীর মোটিভেশনের যতগুলো উৎস রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে মৌলিক উৎসটি হলো, তাদের আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখার চরম মনস্তাত্ত্বিক তাগিদ। কেবল এই একটিমাত্র উপাদানই তাদেরকে অবিনাশী যোদ্ধায় রূপান্তর করে। আর একারনেই প্রথাগত যুদ্ধ এবং অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধের মধ্যে একটি আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। সাধারণ বিরোধে যখন একটি দেশের সামরিক বাহিনী লড়ে, তখন তাদের অবচেতন মনে একটি ‘নিরাপদ এক্সিট রুট’ বা বিকল্প পথ থাকে। তারা জানে যে যুদ্ধ হেরে গেলেও একটি চুক্তির মাধ্যমে শান্তি ফিরে আসবে। কিন্তু পিপলস আর্মি যখন কোনো আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন তাদের সামনে কোনো ‘প্ল্যান বি’ থাকে না। সেখানে যুদ্ধটি কোনো জমি দখলের লড়াই থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। এই তীব্র মরণপণ পরিস্থিতি মানুষের মস্তিষ্কের গভীরতম আদিম প্রতিরক্ষামূলক মনস্তত্ত্বকে সক্রিয় করে তোলে। এই যোদ্ধা খুব ভালো করেই জানে, পরাজয়ের অর্থ হলো তার নিজের ঘরবাড়ি চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাওয়া, মা-বোন-সন্তানেরা দাসে পরিণত হওয়া এবং হাজার বছরের নিজস্ব ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা ও আত্মপরিচয় পৃথিবীর মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে যাওয়া। এই চরম সত্যটি যখন একজন মানুষের অন্তরে গেঁথে যায়, তখন তার ভেতরের ‘ভয়’ সম্পূর্ণ উধাও হয়ে যায়।
একটি বিড়ালকে তাড়া করতে করতে যখন ঘরের এক কোণে অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়, তখন তার পালানোর সব পথ বন্ধ দেখে সে নিজের আকারের চেয়ে দশ গুণ বড় শিকারীর ওপরও বাঘের মতো হিংস্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। একে বলা হয় ‘কর্নার্ড ক্যাট সিন্ড্রোম’। পিপলস আর্মির প্রতিটি যোদ্ধার মানসিক অবস্থা ঠিক এই স্তরে অবস্থান করে। আগ্রাসী পরাশক্তি যখন তাদের ট্যাংক ও বিমান দিয়ে চারপাশ অবরুদ্ধ করে ফেলে, তখন যোদ্ধারা তাদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থাটি বুঝতে পারে। মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হলো, সে মৃত্যুকে ভয় পায়; কিন্তু যখন সে দেখে যে লড়াই না করলে নিশ্চিত ধ্বংস বা দাসত্ব অবধারিত, তখন তার মস্তিষ্ক মৃত্যুকে ভয় পাওয়ার চেয়ে শত্রুর সর্বোচ্চ ক্ষতি করার দিকে মনোনিবেশ করে। এই স্তরে মানুষের জাগতিক সব দুর্বলতা কেটে যায়। মাটির নিচে অন্ধকূপের মতো কু চি টানেলে ভিয়েতনামের মানুষ যে দশকের পর দশক আলো-বাতাস ছাড়া কাটিয়েছে, কিংবা আফগানরা যে বরফে ঢাকা পাহাড়ে বছরের পর বছর না খেয়ে থেকেছে, তার একমাত্র কারণ এই ভয়হীনতা। তারা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে শিখে যায়, কারণ তারা জানে তাদের মৃত্যুর বিনিময়ে হলেও জাতির আত্মপরিচয় টিকে থাকবে।
এই আত্মপরিচয় কেবল একটি নাম নয়; এটি হলো একটি জাতির হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, লোকগাথা, ধর্ম এবং পূর্বপুরুষদের স্মৃতির সমষ্টি। পরাশক্তিগুলো যখন কোনো দেশকে আক্রমণ করে, তারা শুধু শারীরিকভাবে আঘাত করে না; তারা সেই জাতির সংস্কৃতি ও আত্মমর্যাদাবোধকে গুঁড়িয়ে দিতে চায়, যেন তারা চিরকাল মানসিকভাবে পরাধীন থাকে। পিপলস আর্মির মোটিভেশন এই মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণকে একটি অভেদ্য বর্ম দিয়ে প্রতিহত করে। যোদ্ধারা নিজেদের মনে করে তাদের পূর্বপুরুষদের গৌরবময় ইতিহাসের রক্ষক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাধীনতার সোপান। তারা বিশ্বাস করে, তারা যদি আজ বুক পেতে না দাঁড়ায়, তবে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম নিজেদের ইতিহাস ভুলে গিয়ে আগ্রাসীদের দাসে পরিণত হবে। এই যে নিজের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার পবিত্র দায়িত্ববোধ, তা যোদ্ধাদের মনে এক অলৌকিক ও ইস্পাতকঠিন জিদ তৈরি করে। শত্রুর কোটি টাকার মিসাইল এই মনস্তাত্ত্বিক বর্মকে ভেদ করতে পারে না, কারণ সংস্কৃতির শিকড় মাটির অনেক গভীরে প্রোথিত।
অস্তিত্ব রক্ষার এই তাগিদই সমাজে এক অভূতপূর্ব মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ঘটায়। এর ফলে একজন সাধারণ কৃষক, একজন নিরীহ ছাত্র বা একজন সাধারণ নারীও মুহূর্তের মধ্যে ভয়ংকর গেরিলা যোদ্ধায় পরিণত হন। প্রথাগত বাহিনীতে যুদ্ধের জন্য দীর্ঘ ট্রেনিং এবং শারীরিক সক্ষমতার কঠোর শর্ত থাকে। কিন্তু অস্তিত্বের সংকটে পড়া পিপলস আর্মিতে মোটিভেশনই মূল ট্রেনিং হিসেবে কাজ করে। ১০ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৬০ বছরের বৃদ্ধ, প্রত্যেকেই নিজের অবস্থান থেকে প্রতিরক্ষায় অংশ নেয়। কেউ কেউ হয়তো সরাসরি অস্ত্র ধরে না, কিন্তু সেও নিজের ঘরের ভেতর যোদ্ধাকে লুকিয়ে রাখে, কেউ শত্রুর চোখ এড়িয়ে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে, কেউবা লজিস্টিকসের কাজে সাইকেল ঠেলে নিয়ে যায়। পুরো সমাজ তখন একটি স্বয়ংক্রিয় ‘প্রতিরোধ গ্রিড’ বা সোয়ার্মে পরিণত হয়। শত্রু তখন কোনো সুনির্দিষ্ট বাহিনীর মুখোমুখি হয় না, তারা মুখোমুখি হয় একটি আস্ত ক্ষুব্ধ জনসমুদ্রের, যার প্রতিটি কণা তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় মরিয়া।
লোহার তৈরি অস্ত্রকে মরিচা ধরালে বা পুড়িয়ে দিলে তা ধ্বংস হয়ে যায়, কিন্তু "অস্তিত্ব রক্ষার মনস্তাত্ত্বিক তাগিদ" হলো এমন এক বারুদ যা দমনের চেষ্টা করলে আরও বেশি তীব্রভাবে জ্বলে ওঠে। পরাশক্তিগুলো যুগে যুগে এই একটি জায়গাতেই ভুল করেছে; তারা শত্রুর অস্ত্রের হিসাব করেছে, কিন্তু তাদের আবেগের গভীরতা মাপতে পারেনি। পিপলস বাহিনীর আসল শক্তি এখানেই; যেখানে শত্রু সেনাদের লড়াই করার কারণ হলো তার ডিউটি বা বেতন, সেখানে এই বাহিনীর লড়াই করার কারণ হলো তার পরিচয় ও অস্তিত্বকে পৃথিবীর বুকে বাঁচিয়ে রাখা।
তারা গভীর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বুঝতে পারে কীভাবে পরাশক্তিগুলো এবং তাদের দোসরেরা দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা ব্যবস্থা ও সংস্কৃতিকে অদৃশ্য শিকলে বন্দি করে রেখেছে। এই গভীর সচেতনতা তাদের ভেতরে এক ধরনের প্রাজ্ঞ ক্রোধ বা 'ইন্টেলেকচুয়াল রেজ' তৈরি করে, যা পরনির্ভরশীলতার শৃঙ্খল ভাঙতে বুলেটের চেয়েও ধারালো ভূমিকা রাখে। এই বাহিনীর সদস্যরা লড়ে তাদের প্রতিবেশীর জন্য, মহল্লার সুরক্ষার জন্য। যুদ্ধের ময়দানে তাদের ডানে-বামে কোনো অচেনা অঞ্চলের সৈন্য থাকে না; থাকে নিজের গ্রামেরই খেলার সাথি, চাচাতো ভাই বা দীর্ঘদিনের চেনা কোনো মুখ। এই দলগত বন্ধনের কারণে বিপদের মুখে কেউ কাউকে ফেলে পালায় না। তারা নিজেদের মনকে এমনভাবে প্রস্তুত করে যে, যুদ্ধ যদি ২০ বছরও চলে, তবুও তারা লড়তে রাজি। কিন্তু আগ্রাসি শক্তিগুলোর ক্ষেত্রে ব্যপারটা আলাদা; তাদের হাজার কোটি টাকার বাজেট ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ থাকে, তাই তারা দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে চায়। পিপলস বাহিনী এই মনস্তত্ত্বকে উল্টো করে দিয়ে শত্রুকে দীর্ঘমেয়াদে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে।
এই দর্শনে ‘মৃত্যু’ কোনো পরাজয় নয়, বরং মৃত্যু হলো আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ সম্মান। তারা যে যুদ্ধ করে তা কোন ব্যক্তিগত যুদ্ধ নয়, তা হল আদর্শের যুদ্ধ। যখন একজন মানুষ মৃত্যুর ভয়কে জয় করে ফেলে এবং বিশ্বাস করে যে তার এই আত্মত্যাগ পরবর্তী প্রজন্মের স্বাধীনতার সোপান তৈরি করবে, তখন পৃথিবীর কোনো মারণাস্ত্র তাকে দমাতে পারে না। (পর্ব-১০)
কিন্তু পিপলস আর্মির সেই পাহাড়সম গভীর মোটিভেশন কি চিরকাল অক্ষত থাকে? ইতিহাস সাক্ষী, না, তা থাকে না। যে অজেয় স্পৃহা আর ইস্পাতকঠিন আদর্শ একটি জাতিকে অপরাজেয় করে তোলে, কালের বিবর্তনে তাও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। ব্যক্তিগত স্বার্থ, ক্ষমতার লোভ আর বিভেদের কালো থাবা ভেতর থেকেই নস্যাৎ করে দেয় একটি জাতির হাজার বছরের অপ্রতিরোধ্য শক্তি। যোদ্ধারা ভুলে যেতে পারে তাদের সেই পবিত্র শপথ; পথভ্রষ্ট হতে পারে তাদের মূল আদর্শ থেকে। কিন্তু যে মাটিকে ভালোবেসে তারা একসময় বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল, সেই মাটিতেই কীভাবে জন্ম নেয় আত্মকলহ আর নৈতিক অবক্ষয়? কীভাবে একটি অপরাজেয় ‘পিপলস আর্মি’ কোনো বোমা ছাড়াই শুধু মানসিক ভাঙনে ধ্বংস হয়ে যায়, সেই নির্মম ইতিহাস আর সতর্কতা নিয়ে আসছি আগামী পর্বে। চোখ রাখুন।
(লেখকঃ মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)