ঢাকা | শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শিক্ষা সংস্কার: সনদ থেকে দক্ষতার পথে

author
মো: রায়হান উদ্দিন

প্রকাশিত : ৯ জুন, ২০২৬ সকাল ৯:৫৩
ad003
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত দেশব্যাপী ১২ হাজার শিক্ষকের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় ৭ জুন ২০২৬ তারিখে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মানোন্নয়ন, আধুনিকায়ন এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ রূপান্তর নিয়ে একটি সুস্পষ্ট ও সময়োপযোগী দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন। তার এই বক্তব্য বাংলাদেশের শিক্ষা নীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা হিসেবে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে একটি দেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হলো জ্ঞান, দক্ষতা ও উদ্ভাবন। প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে মানবসম্পদ আজ অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যে জাতি তার জনগণকে দক্ষ, সৃজনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর মানবসম্পদে পরিণত করতে পারে, তারাই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকে। এই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেন।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সনদ অর্জনকে সফলতার প্রধান মানদণ্ড হিসেবে দেখা হয়েছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করলেও কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে থাকে। এই বাস্তবতার পরিবর্তন ঘটাতে তিনি দক্ষতা-ভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার এই দৃষ্টিভঙ্গি বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিশ্ব বর্তমানে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা সায়েন্স, প্রোগ্রামিং, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও ন্যানোটেকনোলজি ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও শিল্পখাতের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে পাঠ্যক্রম আধুনিকায়নের ওপর তার জোরালো আহ্বান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয় শিক্ষা ব্যবস্থার মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত হলে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম বৈশ্বিক শ্রমবাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো শিক্ষিত বেকারত্ব। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করলেও তাদের দক্ষতা ও চাকরির বাজারের চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান থেকে যায়। এই সমস্যা সমাধানে শিল্পখাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন। ইন্টার্নশিপ, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজ বাধ্যতামূলক করা হলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব কর্মপরিবেশের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে।

তারেক রহমানের বক্তব্যে উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়টিও বিশেষভাবে উঠে এসেছে। একটি আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল চাকরিপ্রার্থী তৈরি করবে না; বরং নতুন উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবকও তৈরি করবে। তরুণদের উদ্ভাবনী ধারণা বাস্তবায়নের জন্য সিড ফান্ডিং ও ইনোভেশন গ্রান্টের মতো সহায়তা ব্যবস্থা কার্যকর হলে দেশে স্টার্টআপ সংস্কৃতি বিকশিত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি তিনি নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ শিক্ষা শুধু পেশাগত সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি একজন দায়িত্বশীল, মানবিক ও সচেতন নাগরিক গঠনের প্রক্রিয়া। সামাজিক মূল্যবোধ, পরিবেশ সচেতনতা এবং নৈতিকতা ছাড়া কোনো উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

শিক্ষা ব্যবস্থার এই রূপান্তরে শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক শুধু জ্ঞান প্রদান করেন না; তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তা, চরিত্র ও নেতৃত্ব গঠনে সরাসরি ভূমিকা রাখেন। তাই শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা শিক্ষা সংস্কারের অপরিহার্য অংশ।

সবশেষে, তার বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করা। যদি এই মানবসম্পদকে আধুনিক শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং দক্ষতার মাধ্যমে প্রস্তুত করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নেই নয়, জ্ঞান ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে। এই শিক্ষা দর্শন ভবিষ্যতের সমৃদ্ধ বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

লেখক:
মো: রায়হান উদ্দিন 
সহকারী অধ্যাপক 
অর্থনীতি বিভাগ 
বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজ, সিলেট।

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT