খুলনা ওয়াসা (পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ) জুড়ে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রশাসনিক নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে।
সংস্থাটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. কামরুজ্জামান এবং উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি, অর্থ ও প্রশাসন) ঝুমুর বালার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তুলেছেন ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কর্মচারী ইউনিয়নের নেতারা।
অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারের বদলির আদেশ জারি হওয়ার পরও মো. কামরুজ্জামান দীর্ঘদিন খুলনা ওয়াসায় দায়িত্ব পালন করেন এবং এই সময় বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির উদ্যোগ নেন। অভিযোগ রয়েছে, কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে পদোন্নতি বাণিজ্যের মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে।
কর্মচারী ইউনিয়নের নেতাদের দাবি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ডিএমডি ঝুমুর বালা ওয়াসা ভবনে মিষ্টি বিতরণ ও প্রীতিভোজের আয়োজন করেন। এ ঘটনায় কর্মচারী ইউনিয়ন প্রতিবাদ জানালে তাদের বিরুদ্ধে শোকজ, বিভাগীয় মামলা এবং চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়া হয়।
ইউনিয়নের অভিযোগ, এরপর থেকেই সংগঠনের নেতাদের ওপর প্রশাসনিক চাপ বৃদ্ধি পায়।
অভিযোগ রয়েছে, ডিএমডি ঝুমুর বালা হাজিরা খাতা নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অনুপস্থিতির অভিযোগ তুলছেন।
কর্মচারী ইউনিয়নের সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. রবিউল ইসলামকে সরকারি ছুটিতে থাকা সত্ত্বেও অনুপস্থিত দেখানো হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া আদালতে বিচারাধীন বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে একাধিক কর্মচারীর বিরুদ্ধে নতুন করে বিভাগীয় মামলা ও কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের দাবি, গত ২৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে দুর্নীতির অভিযোগ সংবলিত স্মারকলিপি দেওয়ার পর থেকেই প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে সাবেক এমডি মো. কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অর্থ তছরুপেরও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অফিস কক্ষ সংস্কারের নামে প্রায় ৩০ লাখ টাকার ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি অর্থে কেনা বিভিন্ন সামগ্রী ব্যক্তিগত ব্যবহারে নেওয়া, ব্যয়বহুল টেলিভিশন ক্রয় এবং বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
খুলনা ওয়াসার ১ হাজার ৬০০ পানির মিটার চুরির ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনাটির তদন্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের পরিবর্তে বিষয়টি ধামাচাপা দিয়েছেন। এতে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির বিষয়টি আড়ালে থেকে গেছে বলে দাবি করেছেন কর্মচারীরা।
অন্যদিকে সংস্থার যানবাহনের জ্বালানি ব্যয়ও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কর্মচারীদের দাবি, যেখানে আগে মাসিক জ্বালানি ব্যয় ছিল প্রায় ২ লাখ ১৮ হাজার টাকা, বর্তমানে তা ৫ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। সরকারি গাড়ির অপব্যবহার এবং ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও তুলেছেন তারা।
নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে খুলনা ওয়াসায়। অভিযোগকারীদের মতে, ২০২০ সালে ২৬টি পদের বিপরীতে প্রায় দুই হাজার আবেদন জমা পড়লেও যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
এছাড়া প্রকল্পভিত্তিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্থায়ী নিয়োগ, অযোগ্য কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের দায়িত্ব প্রদান এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডিএমডি (অর্থ ও প্রশাসন) ঝুমুর বালা। তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রায় ৮০ শতাংশই মিথ্যা ও কাল্পনিক। ওয়াসার একটি পক্ষ সাংবাদিকদের কাছে বিভ্রান্তিকর তথ্য সরবরাহ করছে।
অন্যদিকে সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, “এসব বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। আমার কক্ষের কাজ প্রকৌশলীরা করেছেন। আমি এখন এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নই, তাই বিস্তারিত মন্তব্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”
এ বিষয়ে খুলনার নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের দাবি, অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক।
তাদের মতে, প্রকৃত তদন্ত হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা বেরিয়ে আসবে এবং খুলনা ওয়াসায় জবাবদিহিতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।