১৯৬৮ সালের মে মাস, ভিয়েতনামের যুদ্ধ আমেরিকানদের জন্য গলার কাটা হয়ে উঠেছিল; ঘরেবাইরে তখন তাদের লেজে গোবরে অবস্থা, তাই ওয়াশিংটন এই যুদ্ধ শেষ করার কৌশল খুঁজতে লাগল। তারা বুঝতে পারল যে বিপুল সামরিক শক্তি দিয়েও ভিয়েতনামের ‘পিপলস আর্মি’কে হারানো অসম্ভব। এই জন্য তারা উত্তর ভিয়েতনামের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানাল প্যারিস শান্তি আলোচনায়। হুয়াইট হাউস ভেবেছিল, বছরের পর বছর জঙ্গলে কষ্ট করা, না খেয়ে থাকা এই গেরিলা লিডারদের রাজকীয় হোটেল আর বিলাসবহুল জীবনযাত্রার স্বাদ দিতে পারলে তাদের সাথে নেগোশিয়েশন সহজ হবে।
ভিয়েতনামের দুজন নারী ও দুজন পুরুষের চার সদস্যের ছোট্ট প্রতিনিধি দল যখন প্যারিস বিমানবন্দরে পৌঁছুল তখন আমেরিকান অফিসাররা তাদের স্বাগত জানাতে বিলাসবহুল লিমুজিন গাড়ির বহর দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। কিন্তু ভিয়েতনামী দল অত্যন্ত বিনয়ের সাথে সেই রাজকীয় আয়োজন প্রত্যাখ্যান করলেন। ফাইভ-স্টার হোটেল এবং বিশ্বমানের ডাইনিংয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে তারা জানালেন, প্যারিসের শহরতলীতে তাদের একজন ভিয়েতনামী ছাত্রের ওখানেই তারা অবস্থান করবেন। একজন আমেরিকান অফিসার স্তম্ভিত হয়ে এর কারণ জানতে চাইলে একজন নারী বলেছিলেনঃ
“আমরা পাহাড় আর বন থেকে আপনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। আমরা খোলা আকাশের নিচে ঘুমিয়েছি আর গাছের পাতা খেয়ে বেঁচে থেকেছি। আজ যদি আমরা আমাদের জীবনযাত্রার ধরণ বদলে ফেলি, তবে আমাদের ভয় হয়, আমাদের আত্মমর্যাদা খুব শীঘ্রই বিলাসিতার কাছে বিক্রি হয়ে যাবে। আর যে মানুষ বিবেক বিক্রি করে, সে নিজের দেশও বিক্রি করবে।”
ভিয়েতনামী লিডারদের সেই অনমনীয় মানসিকতার পেছনে যে গভীর আবেগ কাজ করছিল, তা হলো জঙ্গলে ফেলে আসা তাদের সহযোদ্ধাদের প্রতি গভীর সহমর্মিতা। তারা যখন প্যারিসের বিলাসবহুল পরিবেশে টেবিল টক করছিলেন, তখনো ভিয়েতনামের লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ ও গেরিলা যোদ্ধা রেইনফরেস্টে বোমাবর্ষণের মুখে লড়াই করছিল। প্যারিসের এসি রুমে দামি খাবার খাওয়া আর দামি বিছানায় ঘুমানোকে তারা তাদের সেই ভাইদের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা বলে বিশ্বাস করেছিলেন। এই গভীর মমত্ববোধই তাদের একটি কঠোর মোরাল রিয়ালিটির মধ্যে নোঙর করে রেখেছিল। পিপলস আর্মির শক্তি এটাই; এর প্রতিটি সদস্য নিজের আত্মত্যাগকে তার সামষ্টিক ভাগ্যের সাথে একাত্ম করে দেখে।
ভিয়েতনামিদের থেকে পাওয়া শিক্ষার সমাপ্তি শুধু প্যারিস চুক্তিতেই ঘটেনি। এর বেশ কয়েক বছর পর, ভিয়েতনামের কিংবদন্তি সামরিক কমান্ডার জেনারেল ভো নগুয়েন গিয়াপ যিনি একাধারে ফরাসি এবং মার্কিন দুই পরাশক্তিকে হাঁটু গেঁড়ে বসতে বাধ্য করেছিলেন, সেই তিনি একটি আরব দেশ সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে বেশ কয়েকজন ‘বিপ্লবী’ নেতার সাথে তিনি সাক্ষাৎ করেন। তিনি দেখলেন, সেই আরব নেতারা বিশাল সব রাজপ্রাসাদে বাস করছেন, বিলাসবহুল মার্সিডিজ গাড়ি হাঁকাচ্ছেন, দামি কিউবান চুরুট ফুঁকছেন আর বিদেশি সুগন্ধিতে স্নান করছেন। নেতারা অত্যন্ত গর্বের সাথে জেনারেল গিয়াপকে স্বাগত জানালে, গিয়াপ তাদের উদ্দেশ্যে স্পষ্টভাবে বলেছিলেন:
“আপনাদের এই বিপ্লব কখনোই সফল হবে না।”
স্তম্ভিত সেই আরব নেতারা জিজ্ঞেস করলেন, "কেন সফল হবে না?" এই সময় জেনারেল গিয়াপ বিপ্লব ও পিপলস আর্মির ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক দর্শনটি তুলে ধরেন:
“বিপ্লব এবং বিলাসিতা কখনো একসাথে সহাবস্থান করতে পারে না। যে বিপ্লব আত্মমর্যাদা, বিবেক এবং আদর্শ দ্বারা পরিচালিত হয় না, তা একসময় সন্ত্রাসবাদে রূপ নেয়। নৈতিক শৃঙ্খলাবিহীন একটি গণঅভ্যুত্থান কেবলই একটি বিশৃঙ্খল দাঙ্গায় পরিণত হয়। আর যখন সেখানে টাকা ঢুকতে শুরু করে, তখন নিজেরাই নিজেদের সবচেয়ে বড় শত্রুতে পরিণত হয়।”
জাতির অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয় রক্ষার তাগিদ থেকেই সৃষ্টি হয় পিপলস আর্মির অপরাজেয় মনস্তাত্ত্বিক ‘সুপারউইপন’। এই শক্তিই একজন সাধারণ মানুষকে অবিনাশী যোদ্ধায় রূপান্তর পারে। কিন্তু সামরিক ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো, যে পিপলস আর্মিকে পৃথিবীর কোনো আধুনিক পরাশক্তি বাইরে থেকে এসে সমরাস্ত্র দিয়ে গুঁড়ো করতে পারে না, সেই বাহিনী অনেক সময় শুধু ভেতরের মানসিক ও সাংগঠনিক ভাঙনে তাসের ঘরের মতো ধসে যায়। লোহার তৈরি অস্ত্রকে বাইরে থেকে আঘাত করলে তা হয়তো টিকে থাকে, কিন্তু ভেতরে মরিচা ধরলে তা একসময় নিজে থেকেই ভেঙে পড়ে। তাই একটি জনগণের বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হল নিজেদের ভেতরের আদর্শিক বিচ্যুতি, লোভ এবং বিভেদের কালো থাবা।
প্রথম শতাব্দীতে রোমান সাম্রাজ্য যখন জুডিয়া (বর্তমান ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল অঞ্চল) দখল করে, তখন তারা শুধু কর আদায় করেই ক্ষান্ত থাকেনি। রোমানরা নিজেদের পৌত্তলিক সংস্কৃতি, মূর্তি উপাসনা এবং জীবনযাত্রা স্থানীয় ইহুদি জনগণের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। এটি ছিল ইহুদিদের জন্য এক চরম অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়ের সংকট। এই সংকটে পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যাওয়া অবস্থা থেকে জন্ম নেয় ‘জিলট’ আন্দোলন; তারা কোনো পেশাদার সামরিক বাহিনী ছিল না; তারা ছিল সাধারণ কৃষক, মেষপালক এবং ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ, যারা রোমান উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে এক অবিরাম গেরিলা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। শুরুতে তাদের মোটিভেশনের উৎস ছিল অত্যন্ত পবিত্র ও স্পষ্ট, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষা করা। এই তীব্র আদর্শিক স্পষ্টতার কারণে তারা রোমের বিশাল সুপ্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হতে ভয় পেত না। সাধারণ চাদরের নিচে ছোট বাঁকা তলোয়ার লুকিয়ে তারা রোমান সৈন্যদের ওপর অতর্কিত ‘হিট অ্যান্ড রান’ হামলা চালাত, যার কারণে রোমানরা তাদের চরম সমীহ করতে শুরু করেছিল। ৬৬ খ্রিস্টাব্দে জিলটদের নেতৃত্বে এক মহাবিক্ষোভের মাধ্যমে জেরুজালেম থেকে রোমানদের বিতাড়িত করা হয়।
কিন্তু পিপলস আর্মির জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় তখনই যখন প্রাথমিক কোনো বড় সাফল্য আসে কিংবা যুদ্ধটি দীর্ঘমেয়াদে রূপ নেয়। বছরের পর বছর যুদ্ধ চলার কারণে জিলটদের মূল ধারার এবং মাঠপর্যায়ের যোদ্ধাদের মনে মারাত্মক মানসিক ক্লান্তি ভর করেছিল, আর ঠিক এই সন্ধিক্ষণে তাদের নেতাদের অন্তরে ঘটেছিল ‘কগনিটিভ পিলফারেজ’। যে যোদ্ধারা একসময় নিজেদের ধর্ম ও মাটি রক্ষার পবিত্র শপথে উদ্বুদ্ধ ছিল, তারা তাদের সেই উচ্চ নৈতিক আদর্শটি ভুলে যেতে শুরু করে। তাদের অবচেতন মনে আধ্যাত্মিক ও জাতীয় মুক্তির চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, ব্যক্তিগত ক্ষমতার লোভ, যুদ্ধের লুটপাটের মাল এবং গোষ্ঠীগত আধিপত্য। যুদ্ধ যখন তার পবিত্র উদ্দেশ্য হারিয়ে শুধু ‘রক্তপাত ও ক্ষমতা দখলের’ হিংস্র খেলায় পরিণত হয়, তখন পিপলস আর্মির ভেতরের সেই মনস্তাত্ত্বিক সুপারউইপনটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
যখনই জিলটদের আদর্শিক বুনিয়াদ নষ্ট হয়ে গেল, অমনি তাদের সামষ্টিক বিশ্বাসের গ্রিড ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে পড়ল। জিলট আন্দোলন একক কোনো শক্তি হিসেবে না থেকে ভেতরের চরমপন্থী ও নরমপন্থীদের দ্বন্দ্বে বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ল। শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার চেয়ে তারা জেরুজালেম শহরের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী আত্মকলহে মেতে উঠল। মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয় এমন স্তরে পৌঁছেছিল যে, জিলটদের এক উপদল অন্য উপদলের রসদ সরবরাহ নষ্ট করতে জেরুজালেমের বিশাল শস্যভাণ্ডারগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়, যেন অন্য দল খাবার না পায়। তারা ভুলে গিয়েছিল যে, এই শস্য কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, এটি পুরো অবরুদ্ধ জেরুজালেমের সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ছিল। নিজেদের কমরেডদের প্রতি চরম অবিশ্বাস ও হিংসা পুরো প্রতিরোধ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভেতর থেকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল।
৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমান জেনারেল টাইটাস যখন জেরুজালেম অবরুদ্ধ করেন, তখন রোমানদের তেমন কোন যুদ্ধই করতে হয় নাই; শহরের ভেতরের জিলটরা তখন এতটাই বিভক্ত হয়ে উঠেছিল যে, তারা রোমানদের ঠেকানোর চেয়ে নিজেদের হত্যা করতেই বেশি ব্যস্ত ছিল। সাধারণ মানুষ, যারা একসময় এই জিলটদের বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল, তারা জিলটদের এই অভ্যন্তরীণ জুলুম, লুণ্ঠন এবং ইনসাফহীনতা দেখে চরম আশাহত ও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। জনগণ তাদের ওপর থেকে সমর্থন সম্পূর্ণ তুলে নেয়। টাইটাস যখন শহরের দেয়াল ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন, তখন জিলটদের অস্ত্র আর মজবুত বাঙ্কার থাকলেও লড়াই করার মতো কোনো ‘মোটিভেশন’ ছিল না। ফলে রোমানরা অতি সহজেই পুরো জেরুজালেম শহর ধ্বংস করে জিলট প্রতিরোধকে চিরতরে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে সক্ষম হয়।
পিপলস আর্মির অক্সিজেন হলো নেতৃত্ব ও সাধারণ যোদ্ধাদের মধ্যকার সমতার সম্পর্ক এবং ইনসাফ। এই জায়গায় আঘাত লাগলে বাহিনীতে এক মুহূর্তে বিষ ছড়িয়ে পড়ে। মাঠপর্যায়ের যোদ্ধারা যখন বরফে ঢাকা পাহাড়ে বা অন্ধকার সুড়ঙ্গে না খেয়ে, বুলেট মাথায় নিয়ে লড়ছে, তখন যদি সেন্ট্রাল কম্যান্ড বা ওপরের সারির নেতারা কোনো সেফ হাউজে বসে বিলাসবহুল জীবনযাপন শুরু করেন, তখন বাহিনীর ভেতরের ‘শেয়ার্ড ফেট’ বা একই ভাগ্যের মনস্তাত্ত্বিক বন্ধনটি একেবারে ভেঙে যায়। যোগ্যতা ও ত্যাগের মূল্যায়ন না করে যখন নেতৃত্বের পদে স্বজনপ্রীতি, আঞ্চলিকতা ও ব্যক্তিস্বার্থের অনুপ্রবেশ ঘটে, তখন সাধারণ যোদ্ধাদের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম নেয় আর এমন কলহ পুরো বাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। (পর্ব-১১)
১৯৪০-এর দশকে চিনের গৃহযুদ্ধ চূড়ান্ত রূপ নেওয়ার সময়ে চিয়াং কাই-শেকের জাতীয়তাবাদী কুওমিনতাং বাহিনীতে প্রায় ৪২ লক্ষ সেনা ছিল, কিন্তু কীভাবে এত বৃহৎ একটা বাহিনী ইতিহাসের পাতা থেকে চিরতরে হারিয়ে গেল সেই ইতিহাস জানাব আগামী পর্বে।
(মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)