ঢাকা | শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আগামীর বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি: কেন বাজেটে এখনই বড় পরিবর্তন জরুরি

author
ইমন সরকার

প্রকাশিত : ১০ জুন, ২০২৬ সকাল ৬:১৮
ad003
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত আবারও এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস ও কয়লার মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং বিদ্যুৎ খাতে ক্রমবর্ধমান ভর্তুকি–সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি নতুন চাপের মধ্যে পড়েছে। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবস্থা শুধু ব্যয়বহুল নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। 

বাংলাদেশ বহু বছর ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস, কয়লা ও এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। এই নির্ভরতার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য অস্থিরতাও সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে আঘাত হানে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এলএনজি আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ভর্তুকির চাপও দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য দীর্ঘদিন ধরে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হচ্ছে, যার বড় অংশ জনগণের করের টাকা থেকে পরিশোধ করা হয়। একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্য বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হচ্ছে। ফলে জ্বালানি সংকট এখন কেবল একটি অর্থনৈতিক ইস্যু নয়; এটি জনজীবন, শিল্প, কৃষি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে। 

এই প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি আর কোনো বিলাসিতা নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত প্রয়োজন। বিশ্বের বহু দেশ ইতোমধ্যে বুঝতে পেরেছে যে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে স্থানীয় ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বিকল্প গড়ে তুলতেই হবে। বাংলাদেশেও সেই বাস্তবতা এখন আরও স্পষ্ট। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র প্রায় ৫ শতাংশের কিছু বেশি নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে, যার বড় অংশই সৌরশক্তিনির্ভর। বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট সক্ষমতা প্রায় ১,৭৪৫ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও এটি জাতীয় চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য। অথচ ভৌগোলিক অবস্থান, সৌর বিকিরণ এবং গ্রামীণ অবকাঠামোর বিচারে বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। 

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যেই বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি ৪৯৫ মেগাওয়াট নতুন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করেছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে বাস্তবতা হলো, কেবল বিচ্ছিন্ন প্রকল্প দিয়ে জ্বালানি রূপান্তর সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার, বাজেটীয় অগ্রাধিকার এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের অভাব। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) দেখিয়েছে যে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন বাজেটের ৫ শতাংশেরও কম নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বরাদ্দ করা হয়েছে, যেখানে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্পগুলো এখনও বড় অংশ দখল করে আছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র এখনও পুরোনো জ্বালানি কাঠামোকেই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। 

এই প্রবণতা পরিবর্তন না হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আরও বড় জ্বালানি ঝুঁকিতে পড়বে। কারণ জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিনির্ভর, বৈদেশিক মুদ্রানির্ভর এবং পরিবেশবিধ্বংসী। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। কিন্তু সৌর বা বায়ুশক্তির ক্ষেত্রে জ্বালানি আমদানি করতে হয় না। একবার অবকাঠামো তৈরি হলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম থাকে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থনৈতিকভাবে টেকসই হওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও কমাতে পারে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনও জীবাশ্ম জ্বালানিকেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেল অনুসরণ করছে। কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু কার্বন নিঃসরণ বাড়ায় না; বায়ুদূষণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশগত ক্ষতির কারণও হয়ে দাঁড়ায়। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ তাই কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প নয়, এটি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষারও অংশ। 

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধানগুলোর একটি হতে পারে রুফটপ সোলার বা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ। দেশের শহরাঞ্চল, শিল্পকারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি ভবনের ছাদগুলোকে কাজে লাগানো গেলে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। ইতোমধ্যে পোশাকশিল্প খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে সৌরশক্তির দিকে ঝুঁকছে। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের  কার্বন বর্ডার এডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সিবিএএম) এর মতো নীতির ফলে ভবিষ্যতে উচ্চ কার্বননির্ভর শিল্পগুলো বাণিজ্যিক চাপের মুখে পড়তে পারে। 

কৃষিখাতেও সৌর সেচ বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। বর্তমানে সেচের জন্য ডিজেল ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে। সৌরচালিত সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষি খাতে ব্যয় কমবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে এগ্রিভোল্টাইকস বা কৃষিজমির সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সমন্বিত পদ্ধতি ভূমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে। বাংলাদেশে নদী ও জলাশয়ের সংখ্যা বিবেচনায় ফ্লোটোভোল্টাইকস বা পানির ওপর ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পও ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় খাত হতে পারে। এতে কৃষিজমির ওপর চাপ কমবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। 

তবে শুধু প্রকল্প নিলেই হবে না; নীতিগত ও কাঠামোগত সংস্কারও জরুরি। বর্তমানে অনেক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বিনিয়োগ সংকট, জমি অধিগ্রহণ জটিলতা এবং ব্যাংকযোগ্য নীতির অভাবে ধীরগতিতে এগোচ্ছে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকারের সাম্প্রতিক সৌরবিদ্যুৎ দরপত্রে বিনিয়োগকারীদেরই জমি সংগ্রহ ও অর্থায়নের ঝুঁকি নিতে বলা হয়েছে, যা প্রকল্প বাস্তবায়নকে কঠিন করে তুলছে। ফলে বিনিয়োগবান্ধব কাঠামো তৈরি না হলে শুধু উচ্চাকাঙ্ক্ষী ঘোষণা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিড ব্যবস্থার আধুনিকায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন সবসময় স্থির থাকে না; সূর্যের আলো বা আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। তাই আধুনিক, নমনীয় ও স্মার্ট গ্রিড ছাড়া বড় পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংযুক্ত করা কঠিন। বাজেটে তাই শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, গ্রিড উন্নয়ন, বিদ্যুৎ সঞ্চয় প্রযুক্তি এবং ব্যাটারি অবকাঠামোতেও বরাদ্দ বাড়াতে হবে। 

আসন্ন জাতীয় বাজেটে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়া জরুরি। প্রথমত, সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর কর ও শুল্ক কমাতে হবে। বর্তমানে উচ্চ আমদানি ব্যয়ের কারণে সৌরবিদ্যুৎ অনেকের জন্য এখনও ব্যয়বহুল। দ্বিতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে স্বল্পসুদে ঋণ, সবুজ তহবিল এবং সহজ শর্তের স্বল্পসুদে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, সরকারি ভবন ও শিল্পখাতে বাধ্যতামূলক নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের নীতি নিতে হবে। চতুর্থত, নেট মিটারিং সহজ ও কার্যকর করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষও বিদ্যুৎ উৎপাদনে অংশ নিতে পারে। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো– বাংলাদেশকে এখন জ্বালানি নীতির দর্শন বদলাতে হবে। এতদিন জ্বালানি খাতকে মূলত বড় অবকাঠামো ও আমদানিনির্ভর উন্নয়নের চোখে দেখা হয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থা হতে হবে বিকেন্দ্রীভূত, অংশগ্রহণমূলক এবং জনগণকেন্দ্রিক। স্থানীয় সরকার, কমিউনিটি, নারী ও যুবসমাজকে সম্পৃক্ত না করে টেকসই জ্বালানি রূপান্তর সম্ভব নয়। 

বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। একটি পথ পুরোনো–যেখানে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়বে, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বাড়বে, পরিবেশ দূষণ বাড়বে এবং জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। অন্য পথটি ভবিষ্যতের–যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্থানীয় উদ্ভাবন, সবুজ অর্থনীতি এবং জ্বালানি গণতন্ত্রের মাধ্যমে একটি টেকসই ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে উঠতে পারে। ২০২৬-২৭ সালের বাজেট সেই ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এখন প্রয়োজন সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, বাস্তবসম্মত বিনিয়োগ এবং জনগণকেন্দ্রিক জ্বালানি পরিকল্পনা। কারণ নবায়নযোগ্য জ্বালানি শুধু বিদ্যুতের বিকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, পরিবেশ নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের টিকে থাকার প্রশ্ন। 

লেখক: 
ইমন সরকার 
উন্নয়নকর্মী 
সদস্য, পরিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম, ময়মনসিংহ 

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT