রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হবস মনে করেন, মানুষ জন্মগতভাবেই আত্মকেন্দ্রিক ও ক্ষমতা লিপ্সু। কোনো নিয়ন্ত্রক না থাকলে প্রত্যেকে কেবল নিজের স্বার্থ উদ্ধারে তৎপর হয়। বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক চালচিত্র দেখে মনে হয়, তিনি যথার্থই বলেছেন। বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমশই আত্মকেন্দ্রিক এবং ক্ষমতাস লিপ্সু হয়ে উঠেছে। দেশ, জাতি, দেশের মানুষ কিছু নিয়েই তাদের ভাবনা নেই। ভাবনা শুধু একটাই, কিভাবে ক্ষমতায় যাওয়া যায়।
এমন কি ছোটখাটো দল, যাদের একশ লোক জড়ো করার সাংগঠনিক ক্ষমতা নেই। তাদের মুখের ভাষা এমন, সরকারকে ফেলে দেয়া সময়ের ব্যাপার। সরকার তাদের দয়ার ওপর টিকে আছে। এরা কি বোকা! না কারো ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করছে। যারা খেলছে, তারা কি একেক জায়গায় একেক রকম পোশাক পড়িয়ে মাঠে নামিয়েছে। যাদের উদ্দেশ্য সরকারকে বেকায়দায় ফেলা বা চাপে রেখে নিজেদের স্বার্থ বাস্তবায়ন। কিংবা দেশে একটা নৈরাজ্য সৃষ্টির মাধ্যমে বাইরের বিশ্বকে ধারণা দেয়া বাংলাদেশ একটা অকার্যকর রাষ্ট্রের পথে চলছে!
জঙ্গল সলিমপুর, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সালিশের নামে রাষ্ট্রীয় আইন এবং বিচার ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ। চাদাবাজির চিত্র ধারণ করে প্রচারের মাধ্যমে একটা ন্যারেটিভ দেয়া, দেশ এখন চাদাবাজির স্বর্গ রাজ্য। রাজধানীসহ দেশ জুড়ে কিশোর গ্যাং সৃষ্টির মধ্য দিয়ে মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়া। এবং ইসলামী ব্যাংক সমস্যা সৃষ্টি করে বিদেশি পুজি বিনিয়োগে অনাগ্রহ করে তোলা। সবকিছুর কি এক জায়গা থেকেই হচ্ছে। এ রকম ভাবনা হওয়া অমূলক নয়।
জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীরা কি করে সাহস পায় সরকারি স্থাপনা ভেঙে ফেলার! সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা কি টের পায়নি। এমনটা হতে যাচ্ছে। তবে সরকার এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে ধন্যবাদ, তারা তাৎক্ষণিকভাবে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসী ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে যারাই জড়িত তাদের সবাইকেই আইনের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে আবারো নতুন করে সমস্যা দেখা দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এত বড় একটা সন্ত্রাসী ঘটনা অথচ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল নিশ্চুপ। পৃথিবীর যে কোনো দেশে এমন ঘটনা ঘটলে, দলমত নির্বিশেষে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে দাড়িয়ে যেত। এই কথা বলার মানে এই নয় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের যোগসাজশ রয়েছে। নিশ্চুপ থাকা মানে সন্ত্রাসীরা উৎসাহিত হবে। তারা সরকারকেই তাদের শত্রুপক্ষ ভাববে এবং নিজেদের কর্মকাণ্ডকে সঠিক বলে ভাববে। ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ হলে ভবিষ্যতে অশুভ ভাবনার আর কোনো সুযোগ থাকত না।
সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদক এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে স্থানীয় লোকেরা ব্যবস্থা নিচ্ছে। আপাতত দৃষ্টিতে এটি একটা ভালো উদ্যোগ। এর বিরূদ্ধে বিচার করে রায় দেয়া শুভ কাজ নয়। মাদকসেবী বা মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হয় সেটাই হবে সঠিক কাজ। স্থানীয় সন্ত্রাসীদেরও আটক করে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সোপর্দ করতে হবে। দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থায় এদের শাস্তি হবে। তা না হলে রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব প্রকাশ পাবে। যা রাষ্ট্রের জন্য কোনোভাবেই কাম্য নয়।
তবে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিচার বিভাগ যথাযথ দায়িত্ব পালন না করলে সাধারণ জনগণ স্থানীয় সালিশি ব্যবস্থার দিকে ঝুকে যাবে। এই সুযোগে ধর্মের লেবাশে বা সুবিধাবাদী গোষ্ঠী তাদের কার্য হাসিলের সুযোগ নেবে। একসময় এই গোষ্ঠী স্থানীয়ভাবে ব্যাপক ক্ষমতাধর হয়ে উঠবে এক নতুন চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বিশ্বে সরকারের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হবে, সরকার আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ। যদি স্থানীয় ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী জড়িত থাকে তাহলে বাইরের পৃথিবীতে প্রচারিত হবে, বাংলাদেশ মৌলবাদ রাষ্ট্রের পথে হাটছে। যা আমাদের জন্য কোনোভাবেই সুখকর হবে না।
ইলেকশনের আগে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে একটা ন্যারেটিভ দাড় করানো হয়েছিল, তারা চাদাবাজ। ৫ আগস্টের পর তারা দেশব্যাপী চাদাবাজি শুরু করে দিয়েছে। ইলেকশনের পর তা আরো জোড়ালোভাবে প্রচারিত হচ্ছে। সরকারি দল যে চাদাবাজির সঙ্গে জড়িত নয় তা বলা যাবে। ফুটপাথ, বাজারঘাট, বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল এবং মহাসড়কে চাদাবাজি হচ্ছে। এটা দৃশ্যমান ঘটনা। ছোট-বড় সবাই প্রত্যক্ষ করছে। সরকারি দল বা যে দলের লোকই চাদাবাজি করুক না কেন দায় কিন্তু সরকারের ওপরেই বর্তায়।
সরকারকে চাদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। যে দলেরই হোক না কেন কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। কেননা একটা গোষ্ঠী দেশের বাইরে এমনভাবে বিষয়টি প্রচার করেছে, মানুষ ঘরের বাইর হলেই চাদাবাজের সম্মুখীন হতে হয় এবং চাদা না দেয়া ছাড়া উপায় নেই। মানুষের ভেতরে এই বদ্ধমূল ধারণা থেকে বের করে নিয়ে আসা সরকারের দায়িত্ব এবং সরকারের সদিচ্ছা থাকলে সম্ভব। তা না হলে বিএনপি বা বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দল যে তকমা লাগিয়ে দিয়েছে তা মাথায় নিয়েই চলতে হবে।
রাজধানীসহ দেশ জুড়ে শহরগুলোতে নতুন আতঙ্ক কিশোর গ্যাং। শহরের যে কোনো প্রান্তে যে কোন ঘটনা ঘটিয়ে দিতে এরা পারদর্শী। অথচ এই আতঙ্কের বিরুদ্ধে কোনো বিরোধী দল একটি কথাও বলছে না। হয়তো এদের নিয়ে কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের সূদুর প্ল্যান রয়েছে। হয়তো আগামীতে সরকার বিরোধী আন্দোলনে এদের ব্যবহার করা হবে। তাই অনেকে রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে হুঙ্কার দেয়া হচ্ছে, আসছে ‘আলফা জেনারেশন’।
জেনারেশন আলফা ইতিহাসের এমন প্রজন্ম, যারা স্মার্টফোন এবং সামাজিক মাধ্যমবিহীন কোনো পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখে না। সামাজিক মাধ্যমে যা দেখে তারা তাই বিশ্বাস করে। স্মার্ট ফোনের বাইরে তাদের কোনো জগৎ নেই। এদের চলাচল একমুখী এবং স্মার্ট ফোনের বাইরে তারা কোনো আইনকে মানতে ইচ্ছুক নয়। এই গোষ্ঠীকে কোনো রাজনৈতিক দল গোষ্ঠী ব্যবহার করার প্ল্যান নিয়েছে। এ কারণেই মঞ্চ থেকে হুঙ্কার দেয়, আসছে ‘আলফা জেনারেশন’।
সরকারকে দেশ এবং জাতির স্বার্থে এই কিশোর গ্যাংদের হ্যান্ডেল করতে। সবটাই আইনি ব্যবস্থায় করলে চলবে না। এদের উন্নত শিক্ষা এবং উন্নত মানসিক গঠনে ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা আমাদের আগামী প্রজন্মকে ধ্বংস হয়ে যেতে দিতে পারি না। আমাদের দায়বদ্ধতা থেকে সঠিক পথে আনতে হবে। তবে যারা ছিনতাই এবং খুন-খারাবির কাজে জড়িত, তাদের কোনো ছাড় দেয়া চলবে না। এই কিশোর গ্যাংকে ব্যবহারে যারা প্ল্যান করছে এদের আগুনে আপনারাই আগে পুড়বেন এবং সরকার যদি এদের ব্যাপারে এখনই যথাযথ ব্যবস্থা না নেয় তাহলে আগামীতে সরকারে এরা বড় বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইসলামিক ব্যাংক নিয়ে সরকার এবং প্রধান বিরোধী দল এখন মুখোমুখি। সরকার চাইছে ইসলামি ব্যাংককে নতুন করে ঢেলে সাজাতে। আর বিরোধী দলের আকাক্সক্ষা ৫ আগস্টের পরবর্তী ব্যাংক যে অবস্থায় ফিরে এসেছে তা বহাল রাখতে। এ ব্যাপারে কেউ কাউকে ছাড় দিতে ইচ্ছুক নয়। তবে এই ইসলামী ব্যাংক সমস্যা যদি সমাধান না হয় আর্থিক খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় আসতে পারে। এই বিপর্যয় স্থানীয় নয় আন্তর্জাতিকভাবে আসতে পারে। আর্থিক খাতে অব্যবস্থাপনা দেখিয়ে বাইরের বিনিয়োগে অনাগ্রহ দেখা যেতে পারে।
বিরোধী দলের অভিযোগ, সরকারের গৃহীত ব্যবস্থার মধ্য আওয়ামী সরকার আমলের সুবিধা প্রাপ্তি গোষ্ঠী আবারো ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ নেবে। যদি তাই হয়, যখন আওয়ামী সময়ে ব্যাংক দখল হয়ে থাকে, ব্যাংকের গ্রাহকরা নিশ্চুপ ছিল কেন। আজ তারা যে আন্দোলন করছে সেদিন করেনি। কিংবা গ্রাহক সুবিধা প্রত্যাহার করেনি কেন! এটা বোধগম্য নয়। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে জনমনে এই ধারণা রয়েছে, ব্যাংকটি একটি দলের লোকদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে থাকে। এই যদি হয় পৃথিবীর কোনো দেশের সরকার চাইবে না কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীন কোনো ব্যাংক তার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে। সরকারের সুযোগ থাকলে তা ব্যবহার করবে। বিরোধী দল যে এত কথা বলছে, তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সময়ে এর বিশেষ সুবিধাভোগী কারা ছিল। কখনোই সাধারণ মানুষের ছিল না। ছিল একটা নির্দিষ্ট দলের নেতা-কর্মীদের সুবিধার্থে। চাকরি থেকে সব কিছুতেই দলীয় লোকদের সুবিধা বিবেচনা করা হতো। এই যে কর্ম শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে ব্যাংকের কর্মচারি, কর্মকর্তার আন্দোলন করছেন। এটা কি ঠিক হচ্ছে। আপনাদের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন হলে আপনারা কি করতেন। হলফ করে বলতে পারি এক জনকেও চাকরিতে বহাল রাখতেন না।
আপনারা ভালো করেই জানেন, ব্যাংকটি আপনাদের নিয়ন্ত্রণ না থাকলে কি হবে? অডিট হলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে, নিয়মের বাইরে কাদের অতিরিক্ত সুবিধা দেয়া হয়েছে এবং সেই সঙ্গে এও প্রমাণিত হবে বাইরে কে বা কারা টাকা পাঠিয়েছে। তবে যাই হোক রাজনৈতিক দৃষ্টিতে না দেখে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ বিবেচনা করে একটা সমঝোতায় আসা জরুরি। তা না হলে বাইরের বিশ্বে বাংলাদেশের আর্থিক খাত নিয়ে নেতিবাচক ধারণা জন্ম নেবে।
১৯৮১ সালেও ব্যাংক কর্মচারিদের নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। সিবিএ নেতারা অযৌক্তিক সুবিধার জন্য আন্দোলন করে। কোনোভাবেই তাদের সঙ্গে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সমঝোতায় আসতে পারছিল না। সিবিএ নেতারা তাদের দাবিতে অনড় থাকে এবং সব প্রকার ব্যাংক সেবা দেয়া বাদ দিয়ে কর্মচারিরা আন্দোলনে অংশ নেয়। এ অবস্থায় প্রয়াত রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল। অবশেষে তিনি সময় বেধে দেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কর্মক্ষেত্রে অংশ না নিলে চাকরিচ্যুত করা হবে। রাষ্ট্রপতির আদেশ না মানার খেসারত দিতে হয়েছিল কর্মচারিদের একটা বড় অংশের।
পরিশেষে আবারো রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হবসের কথাই বলতে হচ্ছে, রাজনীতি যখন নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে, তখন রাজনৈতিক দলগুলো তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য পেশিশক্তি, সন্ত্রাস ও উগ্র জাতীয়তাবাদের আশ্রয় নেয়। এর ফলে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা বাধাগ্রস্ত হয় এবং সামগ্রিক শাসন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
শাহীন রাজা : সিনিয়র সাংবাদিক।