কিছু ভূখণ্ড আছে, যেগুলো মানচিত্রের চেয়ে বড়। প্রশাসনিক সীমানার চেয়ে বড়। কক্সবাজার তেমনই একটি ভূখণ্ড । এটি কেবল একটি জেলা নয়। এটি একটি সামুদ্রিক সীমান্ত। একটি পরিবেশগত ফ্রন্টিয়ার। একটি ভূরাজনৈতিক সংযোগস্থল। একটি সভ্যতাগত প্রশ্ন। এবং সম্ভবত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগার।
সমুদ্রেরও বিশ্ববিদ্যালয় লাগে ?
হাঁ ! একটি জাতি রাস্তা দিয়ে আধুনিক হয় না। বন্দর দিয়েও না। বিদ্যুৎকেন্দ্র দিয়েও না। একটি জাতি আধুনিক হয় তার জ্ঞানব্যবস্থা দিয়ে। তার বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়। এটি একটি সভ্যতার চিন্তাকেন্দ্র। একটি জাতির মস্তিষ্ক। একটি ভবিষ্যৎ নির্মাণ কারখানা। পৃথিবীর ইতিহাসে বড় পরিবর্তনগুলো প্রায়ই বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ঘটেছে। যুক্তরাজ্যের University of Oxford শুধু ছাত্র তৈরি করেনি। আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তা, অর্থনীতি, দর্শন, বিজ্ঞান ও প্রশাসনের ভাষা নির্মাণ করেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অক্সফোর্ড ব্রিটিশ রাষ্ট্রের জ্ঞানভিত্তি তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের Massachusetts Institute of Technology শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়। এটি আধুনিক প্রযুক্তি সভ্যতার অন্যতম জন্মস্থান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কম্পিউটিং, ইঞ্জিনিয়ারিং, মহাকাশ প্রযুক্তি—বিশ্ব অর্থনীতির বহু স্তম্ভের পেছনে এমআইটির গবেষণা কাজ করেছে।
সিঙ্গাপুরের National University of Singapore একটি ছোট দ্বীপরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক জ্ঞান অর্থনীতিতে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। একটি শহর-রাষ্ট্র কীভাবে গবেষণা, উদ্ভাবন ও মানবসম্পদ দিয়ে বিশ্বে প্রভাব তৈরি করতে পারে, তার অন্যতম উদাহরণ এই বিশ্ববিদ্যালয়। এই তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি সাধারণ বিষয় আছে। তারা কেবল শিক্ষার্থী তৈরি করেনি। তারা একটি জাতীয় কল্পনা তৈরি করেছে। একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক জাতি তৈরি করেছে। বাংলাদেশেরও সেই প্রয়োজন আছে। আর কক্সবাজার সেই প্রয়াসের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ভূখণ্ড। কারণ কক্সবাজারে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো একসঙ্গে উপস্থিত। সমুদ্র আছে। জলবায়ু পরিবর্তন আছে। দুর্যোগ আছে। সীমান্ত আছে। রোহিঙ্গা সংকট আছে। ব্লু ইকোনমি আছে। গভীর সমুদ্রবন্দর আছে। ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতি আছে।
কিন্তু এটি কোনো প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয়ের পুনরাবৃত্তি হবে না। এটি হবে Ocean and Civilization University। এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে Artificial Intelligence, Cloud Computing, Data Center Engineering, Marine Science, Oceanography, Environmental Science and Disaster Management, Blue Economy, Climate Studies এবং Geopolitics , film , Cultural Studies, Anthropology একই বৌদ্ধিক কাঠামোর মধ্যে অবস্থান করবে।
সমুদ্রকে রক্ষা করতে হবে ; সমুদ্র রক্ষা নীতি প্রণয়ন করুন
সমুদ্রকে রক্ষা করতে হবে এবং এই তৎপরতা এখনই শুরু করতে হবে । এই মুহূর্তে। কারণ সমুদ্র কোনো খালি জমি নয়। কোনো বাণিজ্যিক প্লট নয়। কোনো সীমাহীন মুনাফার ক্ষেত্রও নয়। সমুদ্র একটি জীবন্ত পরিবেশগত ব্যবস্থা। একটি চলমান জৈব-সভ্যতা। একটি পরিবেশগত বুদ্ধিমত্তা, যা হাজার বছর ধরে উপকূল, মানুষ, জীববৈচিত্র্য এবং জলবায়ুর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে এসেছে।
দ্বিতীয় দাবী,
সমুদ্রকে রক্ষার জন্যে সর্বাত্মক একশ্যান জারি রাখতে হবে । কক্সবাজারের উপকূলে আজ যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কেবল পরিবেশগত নয়; এটি নৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সভ্যতাগত সংকটও। অবৈধ দখল, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ, সর্বগ্রাসী পর্যটন বিস্তার, উপকূলীয় ভূমির বাণিজ্যিকীকরণ এবং দ্রুত মুনাফা লাভের সংস্কৃতি সমুদ্রকে তার স্বাভাবিক অস্তিত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। সমুদ্রকে আমরা প্রকৃতি হিসেবে নয়, সম্পদ হিসেবে দেখছি; জীবন্ত সত্তা হিসেবে নয়, ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখছি।
ফলাফল ভয়াবহ। উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য বিলুপ্ত হচ্ছে। সামুদ্রিক কচ্ছপের আবাস সংকুচিত হচ্ছে। প্রবাল, ম্যানগ্রোভ, মাছের প্রজননক্ষেত্র এবং উপকূলীয় ইকোসিস্টেম ক্রমাগত চাপের মুখে পড়ছে। যে সমুদ্র হাজার বছর ধরে জীবন সৃষ্টি করেছে, সেই সমুদ্রের জীবনচক্রকেই আমরা ভেঙে দিচ্ছি।
প্রশ্ন হলো উন্নয়ন কি প্রকৃতি ধ্বংসের আরেক নাম? উত্তর হলো ‘না’ । উন্নয়ন প্রয়োজন। কিন্তু উন্নয়ন কখনো আত্মবিনাশের অন্য নাম হতে পারে না। যে উন্নয়ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার নষ্ট করে, যে উন্নয়ন জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে, যে উন্নয়ন সমুদ্রকে দেয়ালের মধ্যে বন্দি করতে চায়, তা উন্নয়ন নয়; তা একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ঋণ, যার মূল্য একদিন পুরো জাতিকেই দিতে হবে। আজ কক্সবাজারের সমুদ্রকে ঘিরে মুনাফার সর্বগ্রাসী দৃষ্টি তৈরি হয়েছে। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে দখলদার। জল্পনাকারী। ভূমি-ব্যবসায়ী। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন শিল্প। কিন্তু সমুদ্রকে প্রথমে দেখতে হবে একটি জাতীয় উত্তরাধিকার হিসেবে। একটি পরিবেশগত নিরাপত্তা বলয় হিসেবে। একটি সভ্যতার ভিত্তি হিসেবে। সমুদ্রকে রক্ষা করা মানে শুধু পরিবেশ রক্ষা করা নয়। খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষা করা। উপকূলীয় অর্থনীতি রক্ষা করা। জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা। রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। সমুদ্রের মহত্ত্ব অনুধাবন করার সময় এখনই। এখন না হলে, হয়তো আর কখনোই নয়। তাই একটা ভবিষ্যদর্শী সমুদ্র রক্ষা নীতিই আমাদের আগামীর স্থিতিস্থাপক । এই নীতি জরুরী এবং অনিয়ার্য । দ্রুতই তা প্রয়ণ করুন ।
সীমান্তে মাদক, রাষ্ট্রের ভেতরে ক্ষয়
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে নির্ধারিত হবে না। শুধু সমুদ্রতটের সংরক্ষণেও নয়। এটি নির্ধারিত হবে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে মাদক থেকে আমরা কতটা রক্ষা করতে পারি, তার ওপরও। মাদক কেবল একটি অপরাধ নয়। এটি একটি অন্ধকারের অর্থনীতি। একটি নীরব আগ্রাসন। একটি জাতির ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ। আমরা প্রায়ই মাদককে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন হিসেবে দেখি। অথচ এটি মূলত মানবসম্পদের প্রশ্ন। সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।
তৃতীয় দাবী, মাদক ও সীমান্তভিত্তিক অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে একটি সর্বাত্মক জাতীয় অবস্থান।
মাদক কেবল আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়। এটি মানবসম্পদের প্রশ্ন। এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ মূলত তার তরুণদের বুদ্ধিবৃত্তিতে নির্মিত হয়। ফলে যে শক্তি তরুণদের ধ্বংস করে, সে শক্তি মূলত রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকেই আক্রমণ করে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সিন্থেটিক ড্রাগের বিস্তার একটি নীরব যুদ্ধের মতো। এই যুদ্ধ বন্দুকের শব্দে নয়, মানুষের সম্ভাবনা ধ্বংস করে এগোয়। এটি স্বপ্নকে আক্রমণ করে। মেধাকে আক্রমণ করে। পরিবারকে আক্রমণ করে। একটি প্রজন্মকে দুর্বল করে। একটি সমাজকে ক্ষয় করে। একটি রাষ্ট্রকে ভিতর থেকে আঘাত করে। মাদকের অর্থনীতি মূলত মৃত্যুর অর্থনীতি। এখানে মুনাফা জন্ম নেয় মানুষের পতনের ভেতর থেকে। এখানে ব্যবসা দাঁড়িয়ে থাকে আসক্তির ওপর। এখানে অপরাধ সংগঠিত হয় মানুষের দুর্বলতাকে পুঁজি করে। ফলে মাদকবিরোধী সংগ্রাম কেবল অপরাধ দমনের প্রশ্ন নয়; এটি মানবমর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন। একটি জাতির আত্মাকে রক্ষা করার প্রশ্ন।
তাই মাদকবিরোধী লড়াইকে কেবল অভিযানের ভাষায় নয়, রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের ভাষায় দেখতে হবে। কঠোর আইন প্রয়োগ প্রয়োজন। প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে প্রয়োজন শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, কর্মসংস্থান এবং তরুণদের জন্য বিকল্প স্বপ্ন নির্মাণ। রাষ্ট্র যদি তরুণদের জন্য স্বপ্ন তৈরি না করে, মাদক তাদের জন্য বিভ্রম তৈরি করবে।
সমীপে, মাননীয় প্রধান মন্ত্রী,
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি যখন কক্সবাজারে আসবেন, তখন কেবল একটি জেলার উন্নয়ন প্রকল্প দেখবেন না। আপনি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের একটি পরীক্ষাগার দেখবেন। এখানে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তার প্রতিধ্বনি বহু দশক ধরে শোনা যাবে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় একটি অঞ্চলের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। একটি সমুদ্ররক্ষা নীতি একটি সভ্যতাকে রক্ষা করতে পারে। একটি কার্যকর মাদকবিরোধী কৌশল একটি প্রজন্মকে রক্ষা করতে পারে।
তাই মাহমুদ দিদারের তিনটি দাবির প্রতি সদয় হোন। একটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করুন।সমুদ্রকে রক্ষা করুন; সমুদ্র নীতি প্রণয়ন করুন। মাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী করুন। কক্সবাজারকে পর্যটন নগরী থেকে জ্ঞাননগরীতে উন্নীত করুন।কারণ আমরা কক্সবাজারকে এতদিন পর্যটনের ভূগোল হিসেবে পড়েছি। এখন সময় এসেছে একে সভ্যতার ভূগোল হিসেবে পড়ার। ভবিষ্যৎ আর শুধু রাজধানীতে লেখা হচ্ছে না। ভবিষ্যৎ লেখা হচ্ছে উপকূলে। সমুদ্রের ধারে। যেখানে জলবায়ু, প্রযুক্তি, অভিবাসন, নিরাপত্তা এবং মানবতার প্রশ্ন প্রতিদিন একে অপরের সঙ্গে দেখা করে। কক্সবাজার বাংলাদেশের প্রান্ত নয়। কক্সবাজার বাংলাদেশের আগামী শতাব্দীর প্রথম অধ্যায়।
এই কারণেই আমার তিনটি দাবি বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো একই দর্শনের তিনটি স্তম্ভ। একটি বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান তৈরি করবে। একটি সমুদ্ররক্ষা নীতি ভূখণ্ড রক্ষা করবে। একটি কার্যকর মাদকবিরোধী রাষ্ট্রনীতি মানুষকে রক্ষা করবে। রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত এই তিনটি জিনিসই রক্ষা করে—জ্ঞান। ভূখণ্ড। মানুষ। আর এই তিনটির সমন্বয় ছাড়া কোনো সভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় না। রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত এই তিনটি জিনিসই রক্ষা করে—জ্ঞান, ভূখণ্ড এবং মানুষ।
মাহমুদ দিদার , ফীল্ম মেকার , এক্টিভিস্ট, কৃষক ।