"জান দেবো, তবু মান নয়" - প্রবাদটি আমরা সবাই শুনেছি। সভ্যতার ইতিহাস এটাই যে, আমরা সম্মান আর মর্যাদাকেই সর্বোচ্চ মূল্য দিয়ে এসেছি সবসময়। মানুষ তার জীবনের অর্থ, সম্পদ, সুখ, শান্তি, এমনকি নিজের জীবনকেও বিসর্জন দিতে পারে, কিন্তু এই সম্মানটুকু সে জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করতে চায়। আমাদের অবচেতন মনে সম্মানের অনুভবটুকু যেন হিরের চেয়েও দামী।
মানুষেরা আমাদের ভালো বলুক, আমাদের গুরুত্ব দিক, একটু আলাদা মর্যাদার চোখে দেখুক, সমাজ আমাদের সমীহ করে চলুক, এমন তীব্র তৃষ্ণা নিয়েই দিন যাপন করি আমরা। সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে মাঝরাত পর্যন্ত আমরা যা কিছু করি, যে অর্থ, যে খ্যাতি, যে পদবি কিংবা পদক, তার সবই আসলে এই সম্মান আর মর্যাদা বৃদ্ধির এক অন্তহীন প্রচেষ্টা। কিন্তু এখানেই সম্ভবত মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ভ্রান্তিটি লুকিয়ে আছে।
পর্যাপ্ত টাকা আমাদের নেই, এমন অনুভব থেকেই তো আমরা টাকার পেছনে ছুটতে থাকি। আমার কোনো গাড়ি নেই, এই না থাকার অনুভবই তো আমাকে গাড়ি কেনার জন্য আগ্রহী করে তোলে। খাবার নেই তাই খাবারের জন্য হাহাকার। জ্ঞানের অপর্যাপ্ততা মেটাতেই আমরা শিক্ষকের কাছে ছুটে যায়। অর্থাৎ, যা কিছু আমাদের মধ্যে 'নেই' বলে আমরা তীব্রভাবে অনুভব করি, আমাদের মন সবসময় সেটাই বাইরে থেকে পাওয়ার চেষ্টা করে।
তাহলে, আমরা দিন রাত যে সম্মান আর মর্যাদার পেছনে ছুটছি, এটা কি এই জন্য নয় যে সেটার বড্ড অভাব রয়েছে আমাদের অন্তরে? এটা কি এই জন্য নয় যে, নিজেদের ভেতরে সম্মানের এক চরম দুর্ভিক্ষ চলছে? এটা কি এই জন্য নয় যে, আমাদের ভেতরে যথেষ্ট মর্যাদা নেই বলেই আমরা বাইরের মানুষের হাততালির জন্য এতটা ক্ষুধার্ত হয়ে থাকি?
ঠিক এখানেই কাজ কাজ করেছে 'সম্মানের ইলুশন' যা দিয়ে আজ পুরো জগতকে বোকা বানিয়ে এক অদৃশ্য শিকলে বন্দি করে রাখা হয়েছে। এই ইলুশনের মাঝেই জগতকে প্রতিনিয়ত এক অন্তহীন ইঁদুরদৌড়ে ছুটিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন, আজ যারা আপনাকে বা আমাকে ফুল দিয়ে, তোরণ বানিয়ে বিশাল সম্মান দেখাচ্ছেন, তারা কি সত্যিই আমাদের ভেতরটাকে সম্মান করতে পারছেন? তারা কি সত্যিই জানেন যে আমরা কেমন মানুষ? আমরা রাতের অন্ধকারে যখন একা থাকি, আমাদের অবদমিত চিন্তা আর বিবেক ঠিক কী করে, তা কি তারা কোনোদিন জানতে পারেন? না, তারা তা জানেন না। তাহলে মানুষেরা আমাদের দেখে যে সম্মান জানাচ্ছেন, সেটা তো আসলে এক ধরণের মিথ্যাচার! এই 'ভেজাল' সম্মান দেখে আমরা এত আহ্লাদিত এবং আনন্দিত হচ্ছি কেন?
এর বিপরীত দিকটাও সত্য। যারা আজ আমাকে কিংবা আপনাকে সম্মান দেখাচ্ছেন না, তারা কি সত্যিই সম্পূর্ণটা জানেন? আপনি ভেতর থেকে কতটা সৎ বা মানবিক, তার খবর কি তারা রাখেন? না, তাও রাখেন না। তাহলে তাদের দেওয়া বা না-দেওয়া সম্মানের মূল্যের ওপর ভিত্তি করে আমাদের জীবনের সুখ-দুঃখ কেন নির্ধারিত হবে?
লক্ষ্য করে দেখুন, আজ পৃথিবীতে যত অশান্তি, যত অপরাধ, কোন্দল, হিংসা আর গলাকাটা প্রতিযোগিতা, তার মূল মনস্তাত্ত্বিক জ্বালানি কিন্তু এই বাহ্যিক সম্মান পাওয়ার অন্ধ আকাঙ্ক্ষা। মর্যাদার তীব্র লোভই আমাদের ভেতরের শান্তিকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে তাড়া করে বেড়ায়, যেন আমরা আরও বড় কোনো চেয়ার পেতে পারি, যেন সমাজের বাকিদের চেয়ে আরও উঁচুতে পা রাখতে পারি, যেন আমরা সেরা ধনী কিংবা সেরা সেলিব্রেটি হতে পারি। এই যে সেরা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, এই সেরা হওয়ার কি কোন শেষ আছে? সেরা হওয়ার প্রতিযোগিতা কি মানুষকে সত্যিই প্রশান্তি দিতে পারে? সুখি হওয়া কিংবা প্রশান্তি পাওয়াই যদি জীবনের চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষা হয় তবে অন্যদের থেকে মিথ্যা মর্যাদা পাওয়ার এই আধুনিক জীবনের প্রতিযোগিতা কি সেই প্রশান্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না?
জান দেব মান নয় – এটা কি তাহলে মিথ্যা? এর মানে কি এই যে, আমি সম্মান পেতে চাই না?
নিঃসন্দেহে আমি সম্মান আর মর্যাদা পেতে চাই। এটাই আমার জীবনের অন্যতম সেরা অর্জন। কিন্তু অবশ্যই আমি এমন মানুষের নিকট থেকে সেই সম্মানটুকু পেতে চাই, যিনি আমাকে সম্পূর্ণ রূপে চেনেন, যিনি আমার জীবনের প্রতিটি অন্ধকার ও আলোর দিক সম্পর্কে জানেন এবং আমার প্রকৃত মূল্য শতভাগ সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে সক্ষম। এমন মানুষের দেওয়া সম্মানই হবে আমার জগতের সবচেয়ে খাঁটি অর্জন, আর এটিই হওয়া উচিত আমাদের জীবনের সঠিক আকাঙ্ক্ষা।
কিন্তু কে সেই ব্যক্তি, যিনি আমাকে এত গভিরভাবে জানেন, বোঝেন এবং আমার আত্মার কদর করতে পারেন? তিনি কি আমার প্রতিবেশী? আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু? নাকি আমার মা-বাবা কিংবা আমার জীবনসঙ্গী?
না, জগতের কেউই আমাদের শতভাগ জানতে পারেন না। কিন্তু এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ডে মাত্র একজন মানুষই আমাদের সত্যিকার অর্থে এবং সম্পূর্ণ নগ্নরূপে চেনেন; তিনি হলেন, প্রতিদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়ালে যার ছবিটি আমরা দেখতে পাই, সেই আমি নিজেই!
আমিই আমাকে সবচেয়ে খাঁটি সম্মানটুকু দেওয়ার সামর্থ্য রাখি, আমিই পারি নিজেকে সবচেয়ে নির্ভেজাল মর্যাদা দিতে। তাহলে কেন আমরা নিজেদের ভেতরের সেই শাশ্বত সত্তাকে সম্মান করার চেয়ে, বাইরের হাজারো মানুষের মেকি সম্মানের পেছনে বন্য প্রানির মতো ছুটছি?
যখন কোনো মানুষ নিজেকে সত্যি সত্যি সম্মান করতে শেখেন, তখন তার আচরণে এক অদ্ভুত পরিবর্তন আসে; তখন তার আচরণ হয়ে ওঠে গভীর ভাবে দায়িত্বশীল। যখন কেউ নিজেকে প্রকৃত মর্যাদা দিতে অভ্যস্ত হন, তখন তার প্রতিটি কাজ হয় বিশুদ্ধ সততার দলিল। কারণ তিনি জানেন, বাইরের মানুষ তার অন্যায় না দেখলেও, আয়নার ভেতরের মানুষটি কিন্তু সবই দেখছে। নিজের চোখে নিজে ছোট হয়ে যাওয়ার লজ্জার চেয়ে বড় কোনো শাস্তি একজন আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মানুষের কাছে আর নেই। মানুষের মনে যখন এই আত্মসম্মানবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠে, তখন সে দয়াশীল, মমত্ববোধসম্পন্ন এবং একটি সুন্দর সমাজের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মানুষে রূপান্তরিত হয়।
এখন একবার চোখ বন্ধ করে ভেবে দেখুন, আত্মসম্মানের চাষাবাদে যখন একটি জাতির প্রতিটি নাগরিক নিজেকে নিজে সম্মান করতে অভ্যস্ত হবে, তখন আমাদের সমাজের মানচিত্র, আমাদের সভ্যতার অর্জন ঠিক কেমন হবে? সেটা হবে এমন সমাজ যেখানে অন্যায়, অপরাধ, জুলুম, নির্লজ্জতা এই শব্দগুলির স্থান হবে যাদুঘরে। সেখানে প্রতিটি মানুষের জীবন হবে নিরাপদ ও শান্তিময়। কিন্তু নির্মম সত্য হল এই যে, কোন এক অভিশাপের ফাঁদে পড়ে আজ জগত ব্যাপি আমরা বাহ্যিক সম্মান আর মেকি মর্যাদার চাষ করছি; এই মিথ্যা সম্মানের পেছনে জীবন দিচ্ছি, যার নির্মম পরিনতি হলো বিশ্বব্যাপী মারামারি, সমাজব্যাপী নির্লজ্জতা, অপরাধ, অসহিষ্ণুতা এবং হিংস্র প্রতিযোগিতা।
তাই যদি আমরা আজ হতে এই মরীচিকার পেছনে না ছুটে আত্মসম্মানের চাষাবাদ শুরু করি; যদি আমাদের স্কুল –কলেজ , মিডিয়া, সিনেমা, নাটক, সংগীত সব কিছুতেই আত্মসম্মানবোধের বীজ ছড়িয়ে দেয়া যায় তবে দেশ ব্যাপী এক পরম শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করবে। সেই সুবাতাসে ছড়িয়ে পড়বে মানবিকতার এক অনুপম সুগন্ধ। আর কেবল তখনই আমরা বুক ফুলিয়ে বলতে পারব, আমরা সত্যিই এক সভ্য এবং মানবিক রাষ্ট্রের মানুষ ছিলাম!
কিন্তু সমাজ জীবনে আত্মসম্মানবোধের চাষাবাদ করবেন কীভাবে, সেই পদ্ধতি নিয়ে লিখব পরের পর্বে।
(লেখক: মাইন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)