ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৪ জুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবস

রক্তদানের পর দাতার সচেতনতা: সুস্থতায় করণীয় বর্জনীয়

author
ডা. সারওয়াত আনযুম শৈলী

প্রকাশিত : ১৩ জুন, ২০২৬ সকাল ৯:১৩
ad003
মুমূর্ষকে রক্তদান মানবতার এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেবা। একজন স্বেচ্ছা রক্তদাতার দেওয়া এক ব্যাগ রক্ত ও রক্ত উপাদান একাধিক মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। তবে রক্তদানের পাশাপাশি নিজের শরীরের যত্ন নেওয়াটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রক্তদানের সময় শরীর থেকে সাময়িকভাবে কিছু রক্ত ও রক্ত উপাদান কমে যায়; যা শরীর স্বাভাবিক নিয়মেই পূরণ করে নেয়। এই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও নিরাপদ রাখতে রক্তদানের পর রক্তদাতার কিছু বিষয়ে সচেতনতা প্রয়োজন।

তাৎক্ষণিক সচেতনতা: রক্তদানের প্রথম এক ঘণ্টা

রক্তদানের পর শরীরের রক্তচাপ স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগে। তাই এ সময় তাড়াহুড়ো না করে অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট বিশ্রাম নেওয়া উচিত। হঠাৎ উঠে দাঁড়ালে মাথা ঘোরা বা দুর্বল লাগতে পারে। রক্তদানের পর পানি, জুস, স্যালাইন বা হালকা খাবার গ্রহণ করা জরুরি। এটি শরীরের শক্তি ও রক্তে শর্করার ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। এ ছাড়া রক্তদানের পর অন্তত ১-২ ঘণ্টা ধূমপান থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ এতে মাথা ঘোরা বা অস্বস্তির ঝুঁকি বাড়তে পারে।

প্রথম ২৪ ঘণ্টার বিশেষ যত্ন
রক্তদানের পরের দিনটি শরীরের জন্যে পুনর্গঠনের সময়। তাই এই সময় পর্যাপ্ত তরল খাবার গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেশি পরিমাণে পানি, ডাবের পানি, ঘরে তৈরি ফলের রস বা স্যালাইন পান করলে শরীর দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
রক্তদানের দিন ভারী কাজ, অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম, জিম কিংবা ভারী ওজন তোলা থেকে বিরত থাকা উচিত। এতে দুর্বলতা বা অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।
রক্তদানের আগে বা সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত ভারী খাবার খাওয়া ঠিক নয়। বিরিয়ানি বা অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার অনেক সময় বমি ভাব সৃষ্টি করতে পারে। বরং কিছু সময় পর স্বাভাবিক ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করাই ভালো। অ্যালকোহল বা যেকোনো মদ্যপান থেকেও এসময় দূরে থাকা উচিত।


দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা ও পুষ্টি

রক্তের তরল অংশ দ্রুত পূরণ হলেও লোহিত রক্তকণিকা ও আয়রনের ঘাটতি পূরণ হতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে। তাই রক্তদাতার খাদ্যতালিকায় আয়রনসমৃদ্ধ খাবার রাখা প্রয়োজন। গরুর মাংস, কলিজা, ডিম, পালং শাক, কচুশাক, ডালিম, ডাল ও কাঁচকলা শরীরে আয়রনের ঘাটতি পূরণে সহায়ক। পাশাপাশি লেবু, আমলকি বা ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ খাবার খেলে আয়রন সহজে শোষিত হয়।

সুঁচ ফোটানোর জায়গায় কালচে দাগ বা হালকা ফোলা দেখা দিলে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। প্রথম দিন বরফ এবং পরবর্তী দিনগুলোতে হালকা গরম সেঁক দিলে সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যেই তা ঠিক হয়ে যায়।

স্ক্রিনিং টেস্ট ও দাতার নৈতিক দায়িত্ব

রক্তদাতার নিরাপত্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি গুরুত্বপূর্ণ রক্তগ্রহীতার নিরাপত্তাও। তাই রক্ত সংগ্রহের পর সাধারণত এইচআইভি, হেপাটাইটিস বি ও সি, সিফিলিস এবং ম্যালেরিয়াসহ কয়েকটি সংক্রামক রোগের পরীক্ষা করা হয়। রক্তদাতার উচিত নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজনে স্ক্রিনিং পরীক্ষার ফলাফল সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া।

পরবর্তী রক্তদানের সঠিক বিরতি

নিরাপদ রক্তদানের জন্য দুইবার রক্তদানের মাঝে নির্দিষ্ট বিরতি রাখা জরুরি। পুরুষদের ক্ষেত্রে সাধারণত ন্যূনতম ৩-৪ মাস এবং নারীদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৪ মাস বিরতি দিয়ে পুনরায় রক্তদান করা নিরাপদ।

জরুরি অবস্থায় করণীয়

রক্তদানের পর অতিরিক্ত দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা অসুস্থ বোধ করলে দ্রুত বসে পড়তে হবে এবং আশপাশের মানুষের সহায়তা নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। রক্তদানের পরপরই গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালানো থেকেও বিরত থাকা ভালো। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- রক্তদান নিয়ে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে ভূমিকা রাখতে পারার অপার্থিব আনন্দের অনুভূতিই একজন রক্তদাতার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়ে ওঠে।
মূলত রক্তদান কোনো দুর্বলতার কারণ নয় বরং এটি একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও মানবিক এক প্রক্রিয়া। একজন সচেতন রক্তদাতা নিজের সুস্থতা বজায় রেখে নিয়মিত রক্তদানের মাধ্যমে সমাজকে মানবতায় এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। রক্তদানের পর সামান্য কিছু নিয়ম মেনে চললেই দ্রুত সুস্থ থাকা সম্ভব এবং ভবিষ্যতেও নিরাপদভাবে রক্তদান করা যায়। রক্ত দিন। জীবন বাঁচান। মানবতার পাশে দাঁড়ান। সবাইকে বিশ্ব রক্তদাতা দিবসের শুভেচ্ছা।

লেখক:

ডা. সারওয়াত আনযুম শৈলী
মেডিকেল কাউন্সেলর 
কোয়ান্টাম স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT