চারিদিকে শিক্ষা, প্রযুক্তি, অবকাঠামো আর দৃশ্যমান উন্নয়নের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক অনেক এনজিও দেশ ব্যাপী দারিদ্র বিমোচন কিংবা অবহেলিত গ্রুপের ক্ষমতায়ন অথবা পিছয়ে পড়া শিশুদের শিক্ষার জন্য বড় বড় প্রোগাম নিয়ে মাঠে নামছেন। কিন্তু এই বাহ্যিক সব ব্যবস্থা আর জৌলুসের সমান্তরালে প্রায় প্রতিটি সমাজে প্রতিনিয়ত বাড়ছে জঘন্য সব অপরাধ, পরশ্রীকাতরতা, পারস্পরিক অবিশ্বাস আর সীমাহীন অস্থিরতা। প্রশ্ন জাগে, সভ্যতার এত অগ্রগতির পরেও মানুষের ভেতরে এই অবক্ষয় কেন? ব্যর্থতা আসলে ঠিক কোথায়?
একটু গভীর ভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, এই সংকটের মূলে কোনো অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সংকট নয়; এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক সংকট। আধুনিক সমাজ 'সম্মান' এবং 'আত্মসম্মান' এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণাকে গুলিয়ে ফেলেছে। মানুষ সামাজিক মর্যাদার এক মরীচিকার পেছনে অন্ধের মতো ছুটছে, অথচ সম্পূর্ণ উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে 'আত্মসম্মান' বা ভেতরের নৈতিক শক্তির চাষাবাদ। এই মোহের চোরাবালিই হলো বর্তমান মানব সভ্যতার মূল সংকট।
সংকটের গভীরতা বুঝতে হলে প্রথমে 'সম্মান' এবং 'আত্মসম্মান' এর মধ্যকার মৌলিক অনুভবের পার্থক্যটি বুঝতে পারা দরকার। 'সম্মান' হলো একটি সম্পূর্ণ বাহ্যিক বিষয়; এটি সমাজ, পারিপার্শ্বিকতা বা অন্য মানুষের মূল্যায়নের ওপর নির্ভরশীল। সমাজে কার কতটা অর্থ আছে, কার সামাজিক বা রাজনৈতিক ক্ষমতা কতখানি, কে কতটা চটকদার লাইফস্টাইল প্রদর্শন করতে পারছে, তার ওপর ভিত্তি করে সমাজ মানুষকে 'সম্মান' বা মর্যাদা দেয়। অর্থাৎ, সম্মানের চাবিকাঠি সবসময় থাকে অন্যের হাতে। এর বিপরীতে, 'আত্মসম্মান' হলো একটি সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ ও মনস্তাত্ত্বিক সংগঠন। এটি অন্য কোনো মানুষের হাততালি বা নিন্দার ওপর নির্ভর করে না। এটি হলো নিজের ভেতরকার সততা, নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের প্রতি নিজের অবিচল আস্থা। নিজের বিবেকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একজন মানুষ যখন নিজেকে অপরাধী মনে করে না, যখন সে জানে যে সে কোনো অন্যায়ের সাথে আপস করেনি, তখন তার ভেতরে যে প্রশান্তি ও শক্তির জন্ম হয়, তা-ই হলো আত্মসম্মান। সম্মানের উৎস যেখানে সমাজ, আত্মসম্মানের উৎস সেখানে নিজের শুদ্ধ বিবেক।
চারিদিকে আজ আমরা যে তীব্র প্রতিযোগিতা, ক্ষমতার লড়াই, সামাজিক মারামারি এবং অপরাধের বিস্তার দেখছি, তার সিংহভাগেরই জন্ম হচ্ছে এই বাহ্যিক সম্মান বা মর্যাদা বৃদ্ধির অন্ধ আকাঙ্ক্ষা থেকে। একে বলা যায় 'সম্মানের ইলুশন' বা মর্যাদার ধাঁধা। ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন সমাজে বড় দাতা বা সফল উদ্যোক্তার 'সম্মান' পাওয়ার জন্য। সরকারি কর্মকর্তা কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছেন যাতে বিপুল বিত্ত-বৈভবের মাধ্যমে সমাজে একচ্ছত্র আধিপত্য ও 'মর্যাদা' লাভ করা যায়। এলাকায় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের মধ্য দিয়ে বিপুল পরিমান অবৈধ অর্থ উপার্জন, সরকারী কিংবা বেসরকারি দপ্তরগুলোতে ঘুষ আর কমিশনের সংস্কৃতি সবই কেবল টাকার বৃদ্ধির মাধ্যমে সামাজিক মর্যাদা সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা। সোশ্যাল মিডিয়ার একজন ইনফ্লুয়েন্সার সস্তা ও কুরুচিপূর্ণ কন্টেন্ট তৈরি করছেন শুধু কিছু লাইক, কমেন্ট আর ভার্চুয়াল দুনিয়ার 'স্বীকৃতি' বা সম্মানের লোভে।
এই 'সম্মানের ইলুশন'-এর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এর কোনো শেষ নেই। এটি মানুষকে এক অন্তহীন এবং বিধ্বংসী প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দেয়। অন্যের চেয়ে নিজেকে বড় প্রমাণ করার এই আদিম প্রবৃত্তি থেকেই জন্ম নেয় অহংকার, হিংসা এবং পরমতঅসহিষ্ণুতা। সমাজ তখন আর নিরাপদ আশ্রয় থাকে না, তা হয়ে ওঠে একে অপরকে টপকে যাওয়ার এক বিষাক্ত অপরাধের রাজ্য। কারণ এই ইলুশনে আক্রান্ত মানুষগুলো মনে করে, যেকোনো মূল্যে, তা হোক অন্যায় বা নৃশংস উপায়ে, সামাজিক মর্যাদা টিকিয়ে রাখাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।
যখন একটি সমাজ এই বাহ্যিক সম্মানের মোহে অন্ধ হয়ে যায়, তখন সেখানে 'আত্মসম্মান' রক্ষার সংস্কৃতি আর থাকে না। আত্মসম্মান হলো মানুষের মনের ক্যানভাস যেখানে নৈতিকতা, রুচিবোধ এবং নাগরিক দায়িত্বের চাষাবাদ করতে হয় অত্যন্ত সযত্নে এবং সময় নিয়ে। কিন্তু আজকের যুগে প্রতিনিয়ত চারিদিকে পরিকল্পিত কিংবা অজান্তে যার চাষাবাদ করা হচ্ছে তা আসলে মর্যাদার নামে নির্লজ্জতার প্রচার।
আত্মসম্মান মানুষকে ভেতর থেকে আলোকিত এবং পরিতৃপ্ত করে। যার ভেতরে প্রকৃত আত্মসম্মানবোধ আছে, সে কখনোই সস্তা জনপ্রিয়তার পেছনে ছোটে না। সে জানে, গোপনে করা অন্যায় কাজ দিয়ে হয়তো অনেক টাকার মালিক হওয়া যাবে; সমাজের চোখ এড়িয়ে সেই টাকা হয়ত তাকে বাহ্যিক 'সম্মান' এনে দিতে পারে, কিন্তু তার নিজের অন্তরের সামনে তাকে ছোট করে দেবে। আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন একজন মানুষ আইনের ভয়ে নয়, বরং নিজের বিবেকের ভয়ে অপরাধ থেকে দূরে থাকে। লজ্জা এবং পাপবোধের যে দেয়াল মানুষকে পশুর স্তরে নেমে যাওয়া থেকে রক্ষা করে, সেই দেয়ালটি মূলত তৈরি করে এই আত্মসম্মানের অনুভব।
অথচ আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা, আমাদের মিডিয়া এবং আমাদের সামাজিক কাঠামো আজ কেবল 'সার্টিফিকেট' এবং 'বাহ্যিক সফলতা' উদযাপনে ব্যস্ত। আমরা ছোটবেলা থেকেই শিশুদের শেখাচ্ছি কীভাবে প্রতিযোগিতায় জিততে হয়, কীভাবে বড় ডিগ্রি নিয়ে সমাজে উচ্চ মর্যাদা বা 'সম্মান' কামাই করতে হয়। কিন্তু আমরা তাদের এটি শেখাচ্ছি না যে, শত প্রতিকূলতার মাঝেও কীভাবে নিজের নৈতিকতা ও আত্মসম্মানকে অক্ষুণ্ণ রাখতে হয়। ফলে আমরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করছি যারা ডক্টরেট ডিগ্রিধারী, নামকরা শিল্পী কিংবা সফল ব্যবসায়ী হয়েও অবলীলায় নিজের বিবেককে বিক্রি করে দিতে পারছে। কারণ তাদের বাহ্যিক 'সম্মান' আছে, কিন্তু অভ্যন্তরীণ 'আত্মসম্মান' শূন্য।
আমরা আজ যে ডিজিটাল গোলকধাঁধায় বাস করছি, সেখানে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদমগুলো মানুষের এই বাহ্যিক সম্মানের আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজী করেই তৈরি। আমরা যা কিছু বেশি দেখছি, যা কিছু বেশি শুনছি, তা আমাদের অবচেতন মনে এই ধারণাই ঢুকিয়ে দিচ্ছে যে, দৃশ্যমান জৌলুসই মুল কথা। যখন একজন কিশোর দেখে যে সমাজে একজন সৎ, নির্লোভ ও আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মানুষ অবহেলিত, আর একজন দুর্নীতিবাজ বা সস্তা কন্টেন্ট ক্রিয়েটর রাজকীয় মর্যাদায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন তার ভেতরের যৌক্তিক মনটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। মানুষের মনস্তত্ত্ব তখন 'আগাছার মতো শক্তিশালী' নির্লজ্জতা ও কুরুচিকে আপন করে নেয়, কারণ ওখানেই বাহ্যিক সম্মানের শর্টকাট রাস্তা লুকিয়ে আছে। এই মনস্তাত্ত্বিক দূষণই আমাদের সমাজকে ভিতর থেকে পচিয়ে দিচ্ছে।
এই গভীর সংকট থেকে মুক্তি কি সম্ভব?
এর একমাত্র সমাধান হলো, ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে 'আত্মসম্মানের সংস্কৃতি'কে পুনরায় ফিরিয়ে আনা। প্রতিটি পরিবারে সন্তানকে কেবল ক্লাসে প্রথম হওয়ার বা বড় চাকরি পাওয়ার মন্ত্র না শিখিয়ে, তাকে নিজের আত্মমর্যাদা ও সততা রক্ষা করার শিক্ষা দিতে হবে। সন্তান যখন বুঝবে যে অন্যায় করে পাওয়া 'সম্মান'-এর চেয়ে সৎ থেকে মাথা উঁচু করে বাঁচার 'আত্মসম্মান' অনেক বড়, তখন সে আর অপরাধে জড়াবে না। আমাদের শিক্ষালয়গুলোকে কেবল সার্টিফিকেটের কারখানা থেকে মুক্ত করে মানুষের মন গঠনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা যেন মানুষের অহংকার না বাড়িয়ে তাকে বিনয়ী করে, তাকে অন্যের অধিকারের প্রতি সংবেদনশীল করে তোলে। সমাজ হিসেবে আমাদেরও দায় রয়েছে। চোরকে 'চোর' বলে ঘৃণা করা এবং সৎ মানুষকে 'আদর্শ' হিসেবে সম্মান জানানোর সাহস অর্জন করতে হবে। বিত্তের চেয়ে চরিত্রের মূল্যায়ন যেদিন বাড়তে থাকবে, সেদিনই এই ভ্রান্ত সম্মানের ইলুশন ভেঙে পড়বে।
গণতন্ত্র, আইন, আদালত কিংবা পুলিশ দিয়ে একটি সমাজকে সাময়িকভাবে শান্ত রাখা যেতে পারে, কিন্তু তাকে ভেতর থেকে অপরাধমুক্ত ও নিরাপদ করা অসম্ভব। একটি সুস্থ সমাজ তখনই সম্ভব, যখন নাগরিকেরা বাহ্যিক মর্যাদার পেছনে না ছুটে নিজেদের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক পরিচ্ছন্নতার আন্দোলনে শামিল হবে।
সম্মানের মরীচিকা মানুষকে লোলুপ, হিংস্র ও অপরাধী করে তোলে; আর আত্মসম্মানের আলো মানুষকে করে তোলে মানবিক, তৃপ্ত ও পরোপকারী। আসুন, আমরা বাহ্যিক সম্মানের এই আত্মঘাতী মোহ থেকে নিজেদের মুক্ত করি। আগাছা উপড়ে ফেলে মানুষের মনের উর্বর জমিনে আমরা সম্মিলিতভাবে আত্মসম্মান ও আলোর চাষাবাদ শুরু করি। তবেই রক্ষা পাবে আমাদের আগামী প্রজন্ম, সমাজ আর দেশ; তবেই বেঁচে থাকবে আমাদের সভ্যতা।
(মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)