ঢাকা | বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উন্মাদনার সীমা কোথায়: বিশ্বকাপে বাংলাদেশের আবেগ বনাম ল্যাটিন সংযম

author
আরিফুর রহমান খাদেম, সিডনি থেকে

প্রকাশিত : ১৯ জুন, ২০২৬ দুপুর ১:০৩
ad003
এক সময় শুনতাম যে ফুটবলের রাজা পেলে, আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ম্যারাডোনা ও ম্যাসি অথবা ব্রাজিলের নেইমার বাংলাদেশের নামই কোনোদিন শুনেনি। ফুটবলের রাজা পেলের উপর প্রাথমিক পাঠ্যবইয়ে বিশদ অধ্যায় পর্যন্ত ছিল। তাদেরকে প্রশ্ন করা হলে তারা বলত 'বাংলাদেশ' আবার কি বা কোন দেশ? অথচ প্রতিবার বিশ্বকাপের সময় আমরা অধিকাংশ বাংলাদেশীরা এমন ভাব করি যেন বিশ্বকাপ বাংলাদেশেই হচ্ছে। সম্ভবত বাংলাদেশের ক্রিকেট দলকে নিয়েও এমন উন্মাদনা তৈরি হয় না। বাংলাদেশ থেকে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার দূরত্ব প্রায় ১৫,৯০০ কিলোমিটার এবং যাতায়াতে সময় লাগে ২০ ঘণ্টার অধিক—তবুও এই দূরত্ব যেন আবেগের কাছে তুচ্ছ।

অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে গিয়ে এখন পর্যন্ত কয়েকশত দক্ষিণ আমেরিকার শিক্ষার্থী পাই। তাদের মধ্যে ব্রাজিল, কলম্বিয়া, চিলি ও আর্জেন্টিনা, এবং উত্তর আমেরিকার মেক্সিকো অন্যতম। তারাও সাম্প্রতিক বছরে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের উন্মাদনা সম্পর্কে জানতে শুরু করেছে। অনেক সময়ই ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের আকাশচুম্বী সমর্থন অসীম প্রশংসা কুড়ালেও, তাদের অনেকের কাছেই বাংলাদেশের ফ্যানদের অতিরিক্ত উল্লাস বা আবেগপ্রবণতা হাস্যরসে পরিণত হয়।

ল্যাটিন পত্রিকায় এসব নিয়ে আজকাল ফানি সংবাদ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়। আমি প্রায়শই তাদের জিজ্ঞাসা করি তাদের দেশে সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি হয় কিনা, পারিবারিক সম্পর্ক বা বন্ধুত্বে প্রভাব পড়ে কিনা, বিশ্বকাপ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কয়জন সমর্থক মারা যায়, খুন হয় বা আত্মহত্যা করে ইত্যাদি। এমন প্রশ্ন শুনতেই পুরো ক্লাসই হাসিতে ফেটে পড়ে। অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থী যারা এমন আজব প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না, তখন কোনও ব্রাজিলিয়ান বা আর্জেন্টাইন শিক্ষার্থী বাংলাদেশের অন্ধ সমর্থকদের উদাহরণ টেনে বিষয়টি বুঝিয়ে দেয়। কারণ তারা বেশ ভাল করেই অবগত আছে যে বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে এমন ঘটনা অহরহ ঘটে। আমার শিক্ষার্থীদের কেহই বলতে পারেনি যে তাদের দেশে খুন হয় বা কেউ আত্মহত্যা করে। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও ঘটতে পারে। এর বেশি কিছু নয়।

বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে বাংলাদেশের মানুষের উন্মাদনা যতটা আবেগঘন, ততটাই অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা ও অন্ধ সমর্থনে রূপ নেয়। এদের মধ্যে পারিবারিক দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত আক্রমণ, উস্কানিমূলক মন্তব্য বা কথোপকথন, পতাকা নিয়ে বিরোধ ও হামলা এবং সমর্থকদের সংঘর্ষে হতাহত ও মৃত্যু ঘটে। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বা ছাদ থেকে পড়ে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে। অতিরিক্ত আবেগ ও উত্তেজনার কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও শোনা যায়। এছাড়া, দলীয় সমর্থনকে কেন্দ্র করে বন্ধুত্ব, আত্মীয়তায় এমনকি নিজ গৃহের পারিবারিক সম্পর্কেও ফাটল দেখা যায়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও হয় চরম দ্বন্দ্ব। হালকা মজা বা তর্ক একসময় রূপ নেয় তিক্ততায়। সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে তর্ক-বিতর্ক ক্রমেই বিষাক্ত হয়ে ওঠে, যা শেষ পর্যন্ত বাস্তব জীবনের সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে বেট বা জুয়া খেলার প্রবণতাও দেখা যায়, যা পরবর্তীতে সংঘর্ষে রূপ নেয়।

বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে ৪-৫ দিন আগে। তবে শুরুর কয়েকদিন আগে থেকেই বিগত বিশ্বকাপের মতই এখন পর্যন্ত কয়েক ডজন হানাহানি, মৃত্যু ও দুর্ঘটনাজনিত ঘটনা ঘটেছে। প্রায় প্রতি বিশ্বকাপের মত এবারও পতাকা টাঙ্গাতে গিয়ে উঁচু গাছের ডালে বিদ্যুৎ-স্পৃহায় মানিকগঞ্জে এক তরুণের তৎক্ষণাৎ মৃত্যু ঘটে। এছাড়া ভোলায় এক ব্রাজিল সমর্থক বিশ্বকাপ মিছিলে যোগ দিতে যাওয়ার পথে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়। হবিগঞ্জে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের সংঘর্ষে ডজন খানেক মানুষ আহত হয়েছে। লক্ষ্মীপুরে পতাকা টাঙানো নিয়ে দ্বন্দ্বে এক সমর্থকের মাথা ফাটার ঘটনা ঘটেছে এবং পতাকা লাগাতে গিয়ে মৌমাছির আক্রমণে আহত হয়েছে। শরীয়তপুর জেলায় একদল তরুণ ঘোষণা দিয়েছে যে ব্রাজিল ট্রফি না জেতা পর্যন্ত তারা বিয়েই করবে না।

অন্যদিকে, ৭২ বছরের বৃদ্ধ আমজাদ হোসেন নিজের জমির একাংশ বিক্রি করে জার্মানির সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পতাকা তৈরি করে সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন। এমন উদাহরণগুলো প্রশ্ন তোলে—উন্মাদনারও কি কোনো সীমা থাকা উচিত নয়? গবেষণা অনুযায়ী, বিগত বিশ্বকাপগুলোর ধারাবাহিকতায়, ২০২২ বিশ্বকাপেই বিভিন্ন কারণে মোট প্রায় ২৩ জনের মৃত্যু হয়, যার বড় অংশ পতাকা টাঙানো বা বিভিন্ন উঁচু স্থান থেকে পড়ে যাওয়ার কারণে হয়েছিল। জানিনা এবারও ফাইনাল হওয়ার পর পর্যন্ত কত অঘটন হজম করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চরম আচরণের মূল কারণ হলো অতিরিক্ত আবেগ নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং খেলাকে বিনোদন হিসেবে না দেখে জীবনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। প্রিয় দলের জয়-পরাজয়কে কেন্দ্র করে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, এমনকি নিজের জীবন নিয়েও হতাশাজনক সিদ্ধান্ত নেন। নিজের প্রিয় দেশ হারলেও মানুষের মাথায় এমন কুচিন্তা আসা উচিৎ নয়। মনে রাখতে হবে যে- প্রথমত, এটি একটি খেলা, যেখানে জয়-পরাজয় থাকবেই। দ্বিতীয়ত, এদের কোনটিই আমাদের দল নয়। এধরনের কার্যক্রম মানসিক প্রতিবন্ধকতার শামিল। তাই আমাদের উচিত খেলাকে খেলার জায়গায় রাখা, এবং সুস্থ প্রতিযোগিতা ও আনন্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা।

এধরনের অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতার আরেকটি প্রধান কারণ হচ্ছে আমাদের প্রিয় দলের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্যের অভাব। বাংলাদেশ যদি ভারত বা পাকিস্তানের মত ক্রিকেট বা হকিতে সফলতা অর্জন করতে পারত, তাহলে ফুটবল নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে ভালবাসা থাকত ঠিকই, হয়তো অন্য দেশের প্রতি এমন অন্ধ সমর্থন তৈরি হতো না। কারণ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো কিন্তু অন্য দেশ নিয়ে এভাবে মেতে উঠে না। জীবনও দেয় না।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত এসব ঘটনার উপর কঠোর নজরদারি ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উচিৎ দেশের খেলাধুলাকে স্বজনপ্রীতি থেকে মুক্ত করে তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভা গড়ে তোলে জাতীয় দলকে শক্তিশালী করা, যাতে বাংলাদেশের মানুষ নিজের দেশকে নিয়েই গর্ববোধ করতে পারে।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি—নিয়মিত বিরতি নেওয়া, অন্য কাজে মনোযোগ দেওয়া, সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় কমানো এবং সহনশীল মনোভাব গড়ে তোলা প্রয়োজন। সুস্থ বিনোদনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, উত্তেজনার মুহূর্তে নিজেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে নেওয়া এবং পরিস্থিতি শান্তভাবে বিশ্লেষণ করার অভ্যাস গড়ে তুললে সহিংসতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। সর্বোপরি, মনে রাখতে হবে, ফুটবল একটি খেলা মাত্র; অতিরিক্ত আবেগ নয়, বরং সংযম ও সচেতন আচরণই পারে এই উন্মাদনাকে সুস্থ বিনোদনে পরিণত করতে।

লেখক: শিক্ষাবিদ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর
ইউটিউব: Arif.com
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT