ঢাকা | বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঘুম বেঁচে সংসার চালান আক্কেলপুরের শামীম ‎

author
আক্কেলপুর (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ২০ জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৫৭
ad003
রাত ১টা।  আক্কেলপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন দুই ডজন যাত্রী।  কেউ বেঞ্চে বসে মোবাইল দেখছেন, কেউবা মালপত্র পাহারা দিচ্ছেন।  স্টেশনের নীরবতা ভেঙে মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে চায়ের কাপে চামচের শব্দ।  রাত নামলে স্টেশনের আলো-আঁধারিতে ভেসে ওঠে এক ভিন্ন দৃশ্য, দূরে ট্রেনের হুইসেল শোনা যায়।  সেই নীরবতার মধ্যেই কেতলিতে ফুটতে থাকে চা, যাত্রীদের আড্ডায় জমে ওঠে শামীমের ছোট্ট দোকান।  আর সেই চায়ের দোকানের পেছনে ব্যস্ত মানুষটি প্রায় ১২ বছর ধরে আক্কেলপুর রেলস্টেশনে চা বিক্রি করে জীবনের চাকা ঘুরিয়ে চলছেন।

‎২০১৪ সালে মাত্র অতি সামান্য পুঁজি নিয়ে স্টেশন ক্যান্টিনে একটি ছোট দোকান। দৈনিক ভাড়া দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন শামীম।  তখন দোকানে ছিল শুধু চা, বিস্কুট আর পান। সময়ের সঙ্গে দোকানের পরিধি কিছুটা বেড়েছে, তবে পরিশ্রম কমেনি একটুও।  বর্তমানে প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখেন তিনি। ট্রেন বিলম্বিত হলে কখনো কখনো ভোর ৭টা পর্যন্তও জেগে থাকতে হয়। দিনে গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ কাপ চা বিক্রি হয়। শীতকালে সেই সংখ্যা ৪০০ কাপ পর্যন্ত পৌঁছে যায় বলে জানান শামীম।

‎শামীম আরও বলেন ২০১৪ সালে প্ল্যাটফর্মে পর্যাপ্ত আলো ছিল না, বসার ব্যবস্থাও সীমিত ছিল। রাতে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করা যাত্রীদের সংখ্যা এখনকার তুলনায় আগে বেশি দেখা যেত।  আগে ট্রেন ধরতে মানুষ অনেক আগেই স্টেশনে চলে আসত।  এখন মোবাইলে ট্রেনের অবস্থান দেখে আসে। ফলে স্টেশনে মানুষের আড্ডা ও অপেক্ষার সময় কমে গেছে। যাত্রী থাকলেও আগের মতো দীর্ঘক্ষণ স্টেশনে অবস্থান করেন না। আমি সারা রাত জেগে কাজ করি, সকালে বাড়ি গিয়ে ঘুমাই।  কষ্ট হয়, কিন্তু সংসারের কথা চিন্তা করলেই আবার শক্তি পাই।  প্রতিদিন ভোর ৬টার দিকে দোকান ভাই ও বাবা আসলে বাড়ি যাই। খাওয়া-দাওয়া শেষে সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা বা ২টা পর্যন্ত ঘুমাই। সব মিলিয়ে দিনে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার বেশি ঘুম হয় না।

‎একটানা রাত জেগে কাজ করার কারণে মাঝে মাঝে মাথাব্যথা, চোখ জ্বালাপোড়া ও শরীর দুর্বল লাগে। চিকিৎসক বিশ্রাম নিতে বললেও সংসারের কথা চিন্তা করে নিয়মিত দোকানে আসতে হয়।  শীতের রাতে চায়ের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। অনেক যাত্রী দুই-তিন কাপ করে চা খান। তখন বসার জায়গাও পাওয়া যায় না। গরমে তুলনামূলক অনেকটা কম।

‎রেলস্টেশন সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন বিভিন্ন রুটের প্রায় ১২ থেকে ১৫টি ট্রেন আক্কেলপুর স্টেশনে যাত্রাবিরতি করে।  এসব ট্রেনের যাত্রী, পরিবহন শ্রমিক, হকার ও পথচারীরাই বেশিরভাগ তার দোকানের ক্রেতা। প্রতিদিন দোকানে ভাড়া দিতে হতো আগে ২৫০ টাকা এখন দিতে হয় ৫৫০ টাকা।

‎দৈনিক দোকানে প্রায় ৩ কেজি চিনি, ৮ থেকে ১০ লিটার দুধ এবং প্রায় ১ কেজি চা-পাতা ব্যবহার হয়। চায়ের পাশাপাশি বিস্কুট, কেক, পাউরুটি, কলা, সিগারেট ও কোমল পানীয়ও বিক্রি করেন তিনি।

‎তবে ব্যবসা আগের মতো সহজ নেই বলে জানান শামীম।  গত ১২ বছরে চা-পাতা, দুধ, চিনি ও গ্যাসের দাম কয়েকগুণ বেড়েছে।  ২০১৪ সালে যে কাপ চা ২ টাকায় বিক্রি করতেন, বর্তমানে সেটি ৫ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।  আগের তুলনায় এখন  শতকরা ৯৩ ভাগই খরচ হয়।

‎তিনি বলেন, আগে দিনে ৫০০ টাকার মাল কিনে দোকান চলত। এখন ৪ থেকে ৫ হাজার টাকার মাল তুলতে হয়। খরচ বেড়েছে, কিন্তু লাভ সেই তুলনায় অনেক কম।

‎স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, স্টেশনের পুরোনো ব্যবসায়ীদের মধ্যে শামীম ভাই অন্যতম। প্রায় ১২ ধরে একই জায়গায় তাকে ব্যবসা করতে দেখেছি।  রাতের ট্রেন ধরতে আসা অনেক মানুষ তার দোকানকে নির্ভরতার জায়গা মনে করেন।  মানুষের এমন একটি বিশ্বাস উপজেলার সব দোকান বন্ধ থাকলেও শামীম ভাইয়ের দোকান খোলা থাকবে।

‎নিয়মিত যাত্রী মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, রাতের ট্রেন ধরতে হোক কিংবা কাউকে ট্রেনে তুলে দিতে এলে তার দোকানে বসে চা খাওয়া যেন একটা অভ্যাস হয়ে গেছে। শুধু চা নয়, ট্রেনের খবরাখবরও অনেক সময় তার কাছ থেকেই জানা যায়।

‎১২ বছর ধরে রাত জেগে চা বিক্রি করা শামীম এখন শুধু একজন চা বিক্রেতা নন, তার পুরো পরিবারের জীবিকার উৎসও বটে।  স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের সব সদস্যের ভরণপোষণ, সন্তানের শিক্ষা ব্যয় এবং নিত্যদিনের খরচ চলে এই দোকানের আয় থেকেই। রাতভর জেগে চা বিক্রি করে উপার্জিত অর্থেই টিকে আছে তার সংসার।

‎
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT