আপাতদৃষ্টিতে সম্পূর্ণ আলাদা অনুভবের দুটি বিন্দু কীভাবে একই সমতলে এসে একটি জাতিসত্তাকে আমূল বদলে দিতে পারে, আজকের আলোচনায় সেই ইঞ্জিনিয়ারিং এর কথা তুলে ধরব।
প্রথম বিন্দু: সুরের পাঠশালা থেকে পপ-সংস্কৃতির দাপট
‘ওকি গাড়িয়াল ভাই...’, ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস...’ কিংবা, দেখ না মন ঝাকমারি এই দুনিয়াদারি’—বিগত আশির দশকের আগে বাঙালি জীবনের প্রতিটি স্পন্দনে মিশে ছিল এমন সব সুর আর সংগীত। তখন আমাদের এই বাংলাভূমি যেন ছিল এক শান্ত সুরের পাঠশালা। নাটক, সিনেমা কিংবা বিনোদনের নানা আয়োজনে একতারা, দোতারা আর বাঁশির সুরের সঙ্গে ভাটিয়ালি, মারফতি, বাউল সংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি ও লালনগীতির মতো ধীর লয়ের ছন্দে সমৃদ্ধ ছিল বাংলার সংস্কৃতি। ‘সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান’ - কথাটির মানেই ছিল ডুগি-তবলা, একতারা, বাঁশি, সারিন্দা, তানপুরা, সেতার আর হারমোনিয়ামের মেলোডি। কৃষক তার লাঙ্গল চালানোর সাথে সাথে কিংবা রাখাল বালক তার মহিষের পিঠে বসে মনের আনন্দে গলা ছেড়ে গাইত জীবনের সংগীত। এ ছিল বাংলার অকৃত্রিম পরিচয়। সেই সুরগুলো ছিল নিখাদ মায়ার বাঁধনে জড়ানো। রেডিওতে যখন ভক্তিমূলক সংগীত বাজত, তখন সেই সুরের ঢেউ প্রতিবেশীদের হৃদয়েও মায়ার বন্ধন সৃষ্টি করত। সংগীত ও ছন্দের মাঝে যেন ছিল এক সম্মোহনী শক্তি, যা হৃদয়ের গভীরতম স্তরে স্পর্শ করত। তখন সংগীতকে কেবল বিনোদন হিসেবেই জানতাম; সুর ও ছন্দ যে মস্তিষ্কের গভীরতম ইঞ্জিনিয়ারিং এর বিল্ডিং ব্লক, সে সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না আমাদের।
তবে নব্বইয়ের দশকের পর থেকেই এই চিত্রে দ্রুত পরিবর্তন আসে। বড় শহর ছাড়িয়ে গ্রামগঞ্জেও ঝড়ের বেগে ধেয়ে আসে মেটালিক ও রক মিউজিকের দাপট। ‘আধুনিক’ নামক জাদুকরী শব্দের মোড়কে এই নতুন ধারার সংগীত তরুণ প্রজন্মের কাছে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে বাঙালির হাজার বছরের সুর ও সংগীতের স্বকীয়তা বদলাতে শুরু করে। রবীন্দ্রনাথের ধ্রুপদী সুর, নজরুলের বিদ্রোহ কিংবা বাউলের আধ্যাত্মিক সাধনার মেলোডি সময়ের স্রোতে পিছিয়ে পড়তে থাকে; আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে হাই-বিট ড্রাম, মেটাল ও রক মিউজিকের উত্তাল ঝংকার জায়গা করে নেয়।
প্রযুক্তির প্রসারে মানুষের হাতের মুঠোয় চলে আসা এই বিনোদনের তালিকায় বিগত প্রায় তিন দশক জুরে প্রাধান্য পাচ্ছে রক, মেটাল, হাই-ভোল্টেজ হিপ-হপ বা ইলেকট্রনিক ড্যান্স মিউজিক। সুরের এই বিবর্তনকে অনেকে নিছক শৈলীর পরিবর্তন মনে করলেও, এর সঙ্গে যে একটি জাতির সামগ্রিক মূল্যবোধ, জীবনপদ্ধতি, দয়া-মায়া ও সহমর্মিতার মতো মানসিক সম্পদের গভীর যোগসূত্র রয়েছে, তা আমরা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি। আমরা বুঝতে পারিনি যে, সুরের এই পরিবর্তন আসলে মানুষের হৃদয়ের স্থানাঙ্কগুলোকেই বদলে ফেলেছে।
দ্বিতীয় বিন্দু: সামাজিক রূপান্তর ও মূল্যবোধের সংকট
পাঁচ দশক আগে বাংলার মানুষ আজকের মতো এতটা স্বচ্ছল ছিল না। ১৯৭১ সালের রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ শুনতে আসা মানুষের ছবিগুলো আমাদের সামনে এক জীবন্ত দলিল; সেই ছবিগুলোতে মা-বোন কিংবা দাদা-নানাদের পোশাক এবং শরীরী গঠন দেখলেই বোঝা যায়, প্রতিটি মানুষের জীবনে পুষ্টির ঘাটতি কতটা প্রকট ছিল। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্তও মানুষ চরম অভাব ও দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ করেছে। তবে সেই দরিদ্র সমাজব্যবস্থায় কিন্তু একটি অদ্ভুত ইতিবাচক দিক ছিল; প্রতিবেশীরা একে অপরকে ভালোবাসত এবং দুঃখ-কষ্ট ও দুর্ভোগে সমাজের সবাই যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিত। ধর্ম বা বংশপরিচয় তখন ছিল একেবারে গৌণ; প্রতিবেশীর সন্তানকে নিজের সন্তানের মতো এবং প্রতিবেশীর সম্মানকে নিজের সম্মানের মতো করে দেখা ছিল সেই যুগের মানুষের মূল জীবনবোধ। বছরে হয়তো দু-একবার দূর কোনো গ্রামে সিঁদ কেটে চুরি কিংবা ডাকাতির খবর পাওয়া যেত, যা ছিল তৎকালীন সময়ের অতি ব্যতিক্রমী ঘটনা।
কিন্তু নব্বইয়ের দশকের পর থেকে বাংলার সমাজজীবনে কিছু বিচিত্র ও ভয়াবহ অপরাধ বাড়তে শুরু করে। এমন সব অপরাধ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, যা আগে শত বছরেও হয়েছে কি না সন্দেহ। কিশোর গ্যাংয়ের মতো অবিশ্বাস্য অপরাধী চক্রের খবর আসতে শুরু করল। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা অত্যন্ত মেধাবী সহপাঠীকে কেবল তার ভিন্নমতের কারণে নির্মমভাবে খুন করার মতো ঘটনাও প্রত্যক্ষ করল সমাজ। সন্তান পরিকল্পিত ভাবে নিজ মা-বাবাকে হত্যা করল; বাবা-মায়ের উপদেশকে অগ্রহণযোগ্য মনে করে তাদেরকে বিচারকের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর মতো ঘটনাও আমরা দেখলাম। আর আজ আমার প্রানপ্রিয় শিশুরা ইতিহাসের জঘন্যতম অপরাধের শিকার হচ্ছে।
অবারিত আনন্দ আর উপভোগের এই যুগে সামাজিক জীবন কেবল দ্রুতগতি এবং আত্মকেন্দ্রিকতায় বন্দী হয়ে পড়েছে। নব্বইয়ের দশকের আগের সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে যে সম্মিলিত অংশগ্রহণ বা অন্যের দুঃখ কষ্টে তাদের প্রতি সহানুভূতির চর্চা ছিল, আজ সেখানে ব্যক্তি-স্বার্থ ও তাৎক্ষণিক প্রাপ্তিই মুখ্য হয়ে উঠেছে। গত এক দশকে স্কুল-কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পরিমাণ অসহিষ্ণুতা ও সামাজিক নৃশংসতা এবং সহমর্মিতার ঘাটতি আমরা দেখছি, তা বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে বিরল।
মনবিজ্ঞান প্রমান করেছে যে, মানব আচরণের প্রতিটি স্তরে রয়েছে হাজারো ক্যাটালিস্ট। তাই প্রশ্ন জাগে, কেন আমাদের সমাজ ব্যবস্থা তার মজবুত সেই শান্তিপুর্ণ মানসিক কাঠামো ভেঙ্গে এমন অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠল? তবে কি সুর আর ছন্দের পরিবর্তনের সাথে সামগ্রিক সামাজিক আচরণের সত্যিই কোনো গভীর সম্পর্ক আছে?
তৃতীয় বিন্দু: ব্রেইন ইঞ্জিনিয়ারিং এ সুরের প্রভাব
সাধারণভাবে লক্ষ্য করলেও বুঝতে পারা যায় যে, সুর আর ছন্দের সাথে মানুষের আচরণের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। ধীর লয়ের সুরের মাধ্যমে অস্থির মন শান্ত হয়; সুমধুর সুর মানুষকে আবেগে ভাসিয়ে নিয়ে চোখের জল ঝরায়। সুরের সাথে মানুষের এই বন্ধন আদিম; তাই দেখা যায় প্রাচীনকাল থেকেই ধর্মীয় শিক্ষাকে সুমধুর সুরের সাথে যুক্ত করে উপস্থাপনের যে পদ্ধতি শুরু হয়েছিল, তা আজও বিদ্যমান। ধর্মীয় প্রার্থনা, যোদ্ধাদের পদক্ষেপ, জনতার দেশপ্রেম কিংবা শোকের মুহূর্ত, আসলে জীবনবোধের প্রতিটি বাঁকে সুরের সংযোগ রয়েছে। টাইটানিক জাহাজ ডুবে যাওয়ার চরম মুহূর্তেও বাদকদের বেহালা বাজানো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সুরের সাথে গভীর জীবনবোধ ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আজ মনবিজ্ঞানের নানা গবেষণা থেকে জানা গেছে সংগীত ও মানব আচরণের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর এবং এর প্রভাব মস্তিষ্কের জটিল স্নায়বিক প্রক্রিয়ার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সংগীত আসলে বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি আমাদের মস্তিষ্কের নিউরনগুলোকে বিশেষ দিকে চালিত করে সামাজিক আচরণ, নৈতিক মূল্যবোধ ও নিউরোপ্লাস্টিসিটি নির্ধারণের কৌশল। যে কোন সুরের প্রতি আকর্ষণের মূলে রয়েছে মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’। দ্রুত লয়ের উদ্দীপক বাজনাতে মস্তিষ্কের ভেন্ট্রাল স্ট্রাইয়াটাম অঞ্চল সক্রিয় হয়ে অধিক মাত্রায় ডোপামিন নিঃসরণ ঘটায়, যা আমাদের অন্তরে তাৎক্ষণিক আনন্দ ও উত্তেজনার অনুভূতি সৃষ্টি করে (সালিম্পর, ২০১১)। কিন্তু এই ডোপামিন-নির্ভর উত্তেজনার অভ্যাস মস্তিষ্কে এক ধরনের আসক্তির কারণ হয়ে ওঠে। গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘমেয়াদে কেবল ডোপামিন-নির্ভর সংগীতের সংস্পর্শে থাকলে আনন্দ পাওয়ার অসীম ক্ষুধা তৈরি হয়, যা মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক আচরণের দিকে ঠেলে দেয়। ডোপামিনের উচ্চ মাত্রায় অভ্যস্ত ব্যক্তি অন্যের কষ্ট বা দুর্ভোগের দৃশ্য দেখলে তা সহ্য করতে পারে না। এর কারণ এতে ব্রেইন ডোপামিনের সাট-ডাউন হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়, তাই ব্রেইন কৌশলে এমন মানুষদের অন্তরে দুঃখ বিরোধী অনুভব জাগিয়ে রাখে। এরই ফলে ব্যক্তির হৃদয়ে দীর্ঘমেয়াদে সহমর্মিতা, সহানুভূতি, মমতা, দয়া ও ত্যাগের মতো গুণাবলি দুর্বল হতে থাকে।
এর বিপরীত অবস্থানে রয়েছে ধীর লয়ের সুর, যা মস্তিষ্কে ‘অক্সিটোসিন’ বা ভালোবাসার হরমোন নিঃসরণে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই হরমোন মানুষের অন্তরে মায়া, দয়া, মমতা, বিশ্বাস এবং পরমতসহিষ্ণুতার মতো ইতিবাচক মানবিক গুণাবলি বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব সৃষ্টি করে (উডা, ২০১৫)। আসলে সুর মানুষের মস্তিষ্কের অভিজ্ঞতা অর্জন ও সংরক্ষনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ‘ইঞ্জিনিয়ারিং টুল’ হিসেবে কাজ করে, যেখানে আমাদের মস্তিস্কে স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার আধারে যে ধরনের অনুভবের চর্চা বেশি জমা থাকে, আমাদের আচরণ সেই পথেই ধাবিত হয়। গবেষণায় দেখা যায়, নিয়মিত শান্ত সুর শোনার অভ্যাস মস্তিষ্কের সেই অংশগুলোকে শক্তিশালী করে, যা সামাজিক ও নৈতিক গুণাবলিকে বিকশিত করে (কয়েলস, ২০১৪)। অন্যদিকে উচ্চ-তীব্রতা ও আক্রমণাত্মক মিউজিক মস্তিষ্ককে দীর্ঘ সময় ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ মোডে আটকে রাখে। এর ফলে ব্রেইনের অ্যামিগডালা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং সহানুভূতি ও সহমর্মিতার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ‘অ্যান্টিরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্স’ ও ‘ইনসুলা’র কার্যকারিতা দুর্বল হতে শুরু করে (জাস্লিন ও ভাস্টফেইল, ২০০৮)।
আলোচনার এই স্তরে এসে তাই বলা অনুচিত হবে না যে, খাবার যেমন স্বাদের জন্য নয়, বরং তা আমাদের শরীর গঠনের মূল উপাদান; ঠিক তেমনি সংগীতও বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি আমাদের ব্যক্তিত্ব গঠনের 'বিল্ডিং ব্লক'। আমরা প্রতিদিন যে ধরনের সুর ও ছন্দের সাথে সময় কাটাই, তা আমাদের অবচেতন মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলে এবং আমাদের জীবনবোধকে গড়ে তোলে। তাই শিল্পী, গীতিকার, লেখক বা সাংবাদিক, সবাই পরোক্ষভাবে ‘শান্তির ইঞ্জিনিয়ার’। আমাদের তৈরি করা প্রতিটি সুর, প্রতিটি শব্দ ও প্রতিটি বার্তা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে। আমরা সমাজে কী ধরনের সুরের বিচ্ছুরণ ঘটাচ্ছি, তা শুধু বিনোদন হিসেবেই শেষ হয়ে যায় না, বরং তা সামাজিক জীবনের মমতা, সহমর্মিতা, সহানুভূতি, ধৈর্য এবং মানবিক মূল্যবোধের মানদণ্ড নির্ধারণ করে। যখন কোনো শিল্পী বা লেখক শান্ত সুরের চর্চাকে উৎসাহিত করেন, তখন তিনি মূলত মায়া, মমতা ও পরমতসহিষ্ণুতার বীজ বপন করেন। যে ধরনের সংগীতকে আধুনিকতার নামে প্রচার করা হয়, তার সাথে প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সৃষ্টি হয়।
তাই, আমরা যদি ডোপামিন-নির্ভর কেবল সাময়িক উত্তেজনার মিউজিকের চেয়ে মানবিক ও গভীর জীবনবোধসম্পন্ন সুরের চর্চা ও তার প্রচার করি, তবে আমরা একটি মানবিক সমাজ বিনির্মাণের হাজারো ক্যটালিস্টের মধ্যে একটিকে মজবুত করলাম। কারণ আমরা যা শুনি এবং যে সুরকে ধারণ করি, আমাদের জীবনবোধ ঠিক সেই সুরেই প্রতিধ্বনিত হয়।
আপনি কি মনে করেন বর্তমানে আমাদের গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সুর ও শান্তির প্রকৌশল' সম্পর্কে যথেষ্ট আলোচনা হওয়া প্রয়োজন?
লেখক ও মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষক