হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ হলেও ওখানকার শিক্ষার্থীদের ডাক্তার হবার স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে প্রায় সাড়ে তিনশ’ শিক্ষার্থী একবছরের মাথায় দ্বিতীয় দফায় আন্দোলনে নেমেছে। এবার শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ করে আন্দোলনে নেমেছে শিক্ষার্থীরা।
আজ মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকালে ক্যাম্পাস ছেড়ে সামনের সুনামগঞ্জ—দিরাই সড়ক মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। এসময় আশপাশের স্থানীয় বাসিন্দারাও তাদের আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করেন।
এর আগে সোমবার সকাল থেকে একই কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। ২য় দিনের মত মঙ্গলবার ও চলছে তাদের কর্মসূচি।
সুনামগঞ্জে একটি আইকোনিক প্রজেক্ট হিসেবে ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্প (তখনকার সময়ে নাম ছিল বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল) একনেকে অনুমোদিত হয়। মেডিকেল কলেজ এবং ৫০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের জন্য ১১০৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। পরে এই ব্যয়ের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। ইতোমধ্যে এই প্রকল্পে সবমিলিয়ে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কাঠইর মৌজায় ‘সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, সুনামগঞ্জ’—এর জন্য সুনামগঞ্জ—সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক ঘেঁষে মদনপুর—দিরাই সড়কের উভয়পাশেই মদনপুর পয়েন্ট এলাকায় ২০২০ সালের মার্চ মাসে ৩৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এরমধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় ছিল ২৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ভবন, মেডিকেল কলেজ ভবন, অডিটোরিয়াম, ছাত্রাবাস, ডক্টরস ডরমিটরি, ডক্টরস আবাসিক ভবন ইত্যাদিসহ প্রায় ২০ টি ভবনের কাজ শেষের দিকে। ২০২১ সাল থেকে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে এই মেডিকেলের পাঠদান শুরু হয়। এক পর্যায়ে ২০২৪ সালে নতুন ক্যাম্পাসে স্থানান্তর হয় শিক্ষা কার্যক্রম। আধুনিক এই ক্যাম্পাসে অবকাঠামোর সংকট না থাকলেও পাঁচটি ব্যাচের প্রায় ৩৫০ জন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করার মত শিক্ষক নেই। নেই ক্লিনিক্যাল ক্লাসের ব্যবস্থা। এই অবস্থায় অসহায় শিক্ষার্থীরা গেল বছরও ক্লাস বর্জন করে দাবি দাওয়া আদায়ের জন্য লাগাতার আন্দোলনে নামে। ওই সময় শিঘ্রই ৫০০ শয্যার হাসপাতাল চালুসহ সকল সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিলেও কাজের কাজ হয় নি কিছুই। এই অবস্থায় আবারও আন্দোলনে নেমেছে শিক্ষার্থীরা। রোববার থেকে শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ রেখে আন্দোলনকারীরা সোমবার ক্যাম্পাস ছেড়ে পাশের সড়কমোড়ে চলে আসে।
মেডিকেলের নতুন পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম সাকী বললেন, ‘আমাদের ডাক্তার হবার স্বপ্ন অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। শিক্ষক শূন্যতার কারণে আমাদের আগের অর্থাৎ পুরাতন পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থীদের সিলেবাসের অনেক কিছুই পড়ানো হয় নি। অথচ সেপ্টেম্বরে পরীক্ষায় বসতে হবে তাদেরকে। অন্যান্য মেডিকেলে প্রতিদিন তিনটি ক্লাস হয়। আমাদের হয় একটি। অন্য মেডিকেলে শিক্ষার্থীরা দুইবার ওয়ার্ড করে, আমরা একবার করি, তাও সুনামগঞ্জ সদরের হাসপাতালে আসতে যেতে সকল সময় চলে যায়। এই অবস্থায় নিরুপায় হয়ে পড়াশোনার চাপ থাকার পরেও পথে নেমেছি আমরা।’
মেডিকেলের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আজহারুল ইসলাম বললেন,‘আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকেছে। ক্যাম্পাসের হাসপাতাল চালু হচ্ছে না। ক্লিনিক্যাল ক্লাস না হলে ডাক্তার হব কীভাবে, আন্দোলন করে দুটি বাসের ব্যবস্থা হয়েছে, প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে ক্লিনিক্যাল ক্লাসে যেতে হয়। তিন ব্যাচের ১৭৫ জন শিক্ষার্থী আমরা দুই বাসে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে যাই। ওখানে ডাক্তার স্বল্পতায় শেখানোর কেউ থাকে না। মেডিকেলেও ডার্মাটোলজি, অর্থপেডিক্স, গাইনিসহ অনেক বিষয়ের শিক্ষকের পদ শূন্য। এভাবে থাকলে আমরা কীভাবে ডাক্তার হব।’
হাসপাতালের একজন শিক্ষক নিজের পরিচয় উল্লেখ না করার অনুরোধ জানিয়ে বললেন, মেডিকেলে গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ের শিক্ষক নেই। ৭৮ জন শিক্ষকের মধ্যে আছেন ৩৮ জন। এখানেও বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। ক্লিনিক্যাল ক্লাসের জটিলতায় ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তারা বলে মন্তব্য করেন ওই শিক্ষক।
কলেজের অধ্যক্ষ মোস্তাক আহমেদ ভূঁইয়া বললেন, হাসপাতালের অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শেষ পর্যায়ে। অক্সিজেন প্লান্টের কাজ বাকী ছিল। এটি এক মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। ইকুইপমেন্ট ক্রয়ে আপত্তি ছিল। নতুন করে ক্রয়ের কার্যক্রম চলমান আছে। যেখানে আমরা আটকা আছি, সেটি হচ্ছে জনবল সৃজনের অনুমোদন আসে নি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বাস্তবায়ন অধিশাখায় ফাইলটি আটকা আছে। জনবল সৃজন হলে হাসপাতাল চালু করতে এখন সমস্যা হবার কথা নয়।
সুনামগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোল্লা রবিউল ইসলাম বললেন, সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সকল ভবনের কাজ শেষ। অক্সিজেন প্লান্টের কাজ চলমান রয়েছে। অক্সিজেন প্লান্ট ও গ্যাসের লাইনের কাজ ১৫—২০ দিনের মধ্যে শেষ হবে। কেবল অডিটেরিয়ামের কাজ চলমান রয়েছে। অডোটোরিয়াম ছাড়া অন্য সকল ভবন চাইলেই হস্তান্তর করা যাবে।
সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. কামরুজ্জামান বললেন, ‘ডাক্তার—কর্মচারীসহ ৩৯৫ জনের লোকবলের চাহিদা দিয়ে ফেব্রুয়ারিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ৭৪ জনের জনবলের অনুমোদন দিয়েছে। তাও আবার সংশোধনের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বেতন ও জনবল ব্যবস্থাপনা শাখায় ফাইল পাঠিয়েছে। এখন ওখানেই আছে ফাইল। তিনি জানালেন, ভৌত অবকাঠামোর কাজ শেষ হলেও, জনবল না পেলে ভবন সমঝে নেবার পর কে দেখবে। হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কেনার টেন্ডার প্রক্রিয়াও চলমান বলে জানালেন এই কর্মকর্তা।’ তার মতে জনবল পেলেই এখন হাসপাতাল চালু করা সম্ভব।