ঢাকা | মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কোটি টাকার সড়কে হাত দিলেই উঠছে পিচ, এলজিইডির তদারকি নিয়ে প্রশ্ন; জনরোষে বন্ধ কাজ

author
যাযাদি ডেস্ক

প্রকাশিত : ২৪ জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৪
ad003
কাজ শেষ হওয়ার আগেই নতুন সড়কের পিচ উঠে যাচ্ছে হাতের টানেই। কোথাও কোথাও আঙুলের সামান্য চাপেই খসে পড়ছে কার্পেটিংয়ের আস্তরণ। কোটি টাকার সরকারি প্রকল্পে এমন চিত্র দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, নিয়ম মেনে কাজ না করে দায়সারাভাবে সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। আর এ অনিয়মের পুরো সময়জুড়ে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কার্যকর তদারকির দায়িত্ব কতটা পালন করেছে, তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিকেলে খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের উত্তর মাদারবাড়ী সীমানা থেকে রোনবাগ কেয়ার পর্যন্ত উন্নয়নাধীন সড়কে পিচ ঢালাইয়ের কাজ চলাকালে স্থানীয় বাসিন্দারা বাধা দেন। তাঁদের অভিযোগ, প্রাইম কোট যথাযথভাবে প্রয়োগ না করেই পিচ ঢালাই করা হচ্ছিল। প্রতিবাদের মুখে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখে এলাকা ত্যাগ করেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের প্রায় ৫০০ মিটার অংশে পিচ ঢালাই করা হয়েছে। তবে একাধিক স্থানে নতুন পিচের স্তর আলগা হয়ে গেছে। কয়েক জায়গায় হাত দিয়ে টান দিতেই উঠে আসছে বিটুমিনের আস্তরণ। সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে স্থানীয়রা সেই পিচ তুলে দেখাচ্ছিলেন। তাঁদের দাবি, মাত্র কয়েক দিন আগে দেওয়া ঢালাইয়ের এমন অবস্থা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, কাজ শুরুর আগে সড়কের ওপর জমে থাকা ধুলাবালু ও ময়লা যথাযথভাবে পরিষ্কার করা হয়নি। কোথাও কোথাও প্রয়োজনীয় পরিমাণ বিটুমিন ব্যবহার করা হয়নি। ফলে পাথরের সঙ্গে বিটুমিনের বন্ধন তৈরি না হওয়ায় পিচ দ্রুত উঠে যাচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, “রাস্তার যে অংশে কয়েক দিন আগে পিচ দেওয়া হয়েছে, সেখানে এখন হাত দিলেই উঠে যাচ্ছে। কাজের মান নিয়ে শুরু থেকেই সন্দেহ ছিল। এখন সেই সন্দেহ সত্যি হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।”

আরেক বাসিন্দা আজিজুল হকের ভাষ্য, “সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করছে মানুষের চলাচলের সুবিধার জন্য। কিন্তু যদি কাজের কয়েক দিনের মধ্যে এমন অবস্থা হয়, তাহলে বর্ষা মৌসুম পার হওয়ার আগেই রাস্তা নষ্ট হয়ে যাবে।”

সড়কের পাশের একাধিক বাসিন্দা জানান, কয়েক মাস আগেও নিম্নমানের ইটের খোয়া ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল। স্থানীয়দের আপত্তির মুখে কিছু উপকরণ সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকার পর আবার কাজ শুরু হলেও এবারও নির্মাণমান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

সরেজমিনে আরও দেখা যায়, প্রকল্পের আওতায় নির্মিত গাইডওয়ালের কয়েকটি স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। সড়কের মাঝামাঝি অংশে নতুন একটি আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। তবে তার পাশেই ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে রয়েছে পুরোনো কালভার্টের অংশবিশেষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরোনো কাঠামো সম্পূর্ণ অপসারণ না করেই কিছু জায়গায় কাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার বিকেলে যখন সড়কের অবশিষ্ট অংশে পিচ ঢালাইয়ের কাজ চলছিল, তখন তাঁরা নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রতিবাদ জানান। একপর্যায়ে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে সড়কের বিভিন্ন অংশের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় উত্তর মাদারবাড়ী সীমানা থেকে রোনবাগ কেয়ার সড়ক এবং হড্ডা-বেদকাশী সড়কের উন্নয়নকাজ একই প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে প্রায় ২ কোটি ৬৪ লাখ টাকার কাজটি পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স কামরুল অ্যান্ড ব্রাদার্স। প্রকল্প অনুযায়ী ২০২৪ সালের ৩ এপ্রিল কাজ শুরু হয়ে একই বছরের ১৪ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পরে প্রকল্পটি সংশোধন (রিভাইজ) করা হয়। হড্ডা-বেদকাশী সড়কের অংশ বাদ দিয়ে উত্তর মাদারবাড়ী থেকে রোনবাগ পর্যন্ত এক কিলোমিটার সড়কের কাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে সংশোধিত ব্যয় ও বর্ধিত সময়সীমা সম্পর্কে স্থানীয় পর্যায়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, প্রকল্প এলাকায় কোনো তথ্যফলক বা সাইনবোর্ড দেখা যায়নি। ফলে প্রকল্পের ব্যয়, কাজের ধরন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম, বাস্তবায়নকাল কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য সম্পর্কে সাধারণ মানুষ কিছুই জানতে পারছেন না। স্থানীয়দের মতে, এতে প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কাজ তদারককারী মো. হাসান বলেন, “প্রাইম কোট দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টির কারণে কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে যে স্তর দেখা যাচ্ছে সেটিই চূড়ান্ত নয়। আরও কাজ বাকি আছে। কোথাও কোনো ত্রুটি থাকলে তা সংশোধন করা হবে।”

অন্যদিকে এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী আফজাল হোসেন বলেন, “বিটুমিনের রাস্তা পুরোপুরি শক্ত হতে অন্তত সাত দিন সময় লাগে। কিছু স্থানে প্রাইম কোট কম হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেসব অংশ পুনরায় প্রাইম কোট দিয়ে ঠিক করার কথা রয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।”

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন ভিন্ন। তাঁদের মতে, কাজ শেষ হওয়ার আগেই যদি পিচ উঠে যেতে শুরু করে এবং গাইডওয়ালে ফাটল দেখা দেয়, তাহলে প্রকল্পের মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। একই সঙ্গে তাঁরা জানতে চান, কাজ চলাকালে এলজিইডির নিয়মিত তদারকি থাকলে এমন অভিযোগ কেন বারবার সামনে আসছে।

এলাকাবাসীর দাবি, প্রকল্পের পুরো কাজ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে নির্মাণমান যাচাই করা হোক। প্রয়োজন হলে কারিগরি বিশেষজ্ঞদের দিয়ে নমুনা পরীক্ষা করে প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ করা হোক। অন্যথায় জনগণের করের টাকায় বাস্তবায়িত এই সড়ক অল্প সময়ের মধ্যেই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়বে এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের আরেকটি উদাহরণ হয়ে থাকবে।
বর্তমানে সড়কটির কাজ বন্ধ থাকলেও স্থানীয়দের নজর এখন এলজিইডি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, নাকি অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে পুরো ঘটনা—সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে কয়রাবাসীর মনে।
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT