গাজীপুরের শ্রীপুরে একটি পোশাক কারখানায় রাতের শিফটে কর্মরত অবস্থায় লিজা আক্তার নামের এক নারী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় কারখানার কর্মকর্তাদের দায়ী করে বিচার দাবিতে ওই কারখানাসহ আশপাশের ৪টি কারখানার সামনে বিক্ষোভ করে ভাংচুর করেছেন শ্রমিকরা। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালের দিকে উপজেলার টেপিরবাড়ি গ্রামে কালার এন্ড কোং পোশাক কারখানায় প্রথমে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। পরে দুপুরের দিকে আশপাশের আরও ৪টি কারখানায় হামলা ও ভাংচুর চালানো হয়।
নিহত শ্রমিক লিজা আক্তার (৩৬) পিরোজপুর জেলার নাজিরাপুর উপজেলার হোগলা গ্রামের বিদ্যুৎ মিয়ার স্ত্রী। তিনি শ্রীপুরের আনসার রোড এলাকয় একটি ভাড়া বাসায় থেকে ওই কারখানায় চাকরি করতেন।
স্থানীয় লোকজন ও আন্দোলনকারী শ্রমিকদের দেওয়া তথ্য জানা যায়, কালার কোং লিমিটেড কারখানায় বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে লিজা আক্তার কর্মরত অবস্থায় হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে দ্রুত শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে সেই রাতেই সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এর আগেই তিনি অসুস্থতার কারণে কারখানার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ছুটি চেয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন তার সহকর্মীরা। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সেই আবেদন নামঞ্জুর করেছিলেন। একই রাতে মোসা. শোভা নামের আরেক নারী শ্রমিকও অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে মাওনা চৌরাস্তার আল হেরা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন আছেন।
নিহতের সহকর্মী রাজিয়া খাতুন বলেন,'আগেও অসুস্থতার কারণে ১৫ দিনের ছুুুটি কাটিয়েছিলেন লিজা আক্তার । ছুটি শেষে বুধবার তিনি কারখানায় কাজে যোগ দেন। পরে আবারো অসুস্থ্যতা অনুভব করায় তিনি পুনরায় ছুটি চেয়েছিলেন। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ তাকে ছুটি দেয়নি।'
আন্দোলনকারী শ্রমিকদের মধ্যে আমিনুল ইসলাম নামে একজন অভিযোগ করে বলেন, এই কারখানায় সকাল ৮টায় কাজ শুরু হলেও রাত ১২টা, এমনকি কোনো কোনো দিন রাত ২টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য করা হয়। তার পরদিন আবার সকাল ৮টায় কাজে আসতে হয়। এই দীর্ঘ কর্মঘণ্টার ফলে শ্রমিকরা শারীরিকভাবে অসুস্থ্য হয়ে পড়েন।"
কারখানার প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সুপারভাইজারদের বিরুদ্ধে মানসিক নির্যাতনের অভিযোগও তুলে মরিয়ম খাতুন নামে আরেক শ্রমিক বলেন,' ওরা আমাদেরকে মানুষ মনে করে না। কেউ প্রতিবাদ করলে সিসিটিভি ফুটেজে তাকে শনাক্ত করে পরে চাকরিচ্যুত বা হয়রানি করা হয়। শ্রমিকরা জেলখানার মতো আছে।'
আল আমিন নামের আরেকজন বলেন, 'দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করানোর ফলে শ্রমিকরা অসুস্থ হয়ে পড়লেও কর্তৃপক্ষ তাদের ছুটি দিতে অনিহা দেখায়। অসুস্থতার কারণে লিজাও ছুটি পাননি। অবশেষে তার কারখানার ভেতরেই মৃত্যু হলো। তিনি এই ঘটনার বিচার দাবি করেন।'
শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার বিজন মালাকার বলেন, 'বুধবার রাতে লিজা নামের এক নারীকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। আমরা পুলিশকে অবগত করেছি।'
মাওনা চৌরাস্তার আল হেরা হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ও চিকিৎসক আবুল হোসেন বলেন,'শোভা আক্তার নামের এক নারী শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে তার হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।'
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে কারখানার কর্তৃপক্ষের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, লিজার মৃত্যুর খবরে বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। দুপুরে কয়েকশো শ্রমিক মাওনা-শ্রীপুর আঞ্চলিক সড়কে লাঠি-সোটা নিয়ে লিজা মৃত্যুর বিচার দাবি করে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এসময় তাদের সাথে আশপাশের কিছু ব্যক্তিও যোগ দেয়। মিছিলকারীরা ভাংনাহাটি গ্রামের সি আর সি এপারেলস্ লি, এম এইচ সি এপারেলস্ লি, কেওয়া গ্রামের ট্রিপল এপারেলস্ লি ও মাওনা চৌরাস্তার নোমান উইভিং লি. নামক কারখানাসহ চারটি কারখানায় হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে।
হামলাকারীরা ট্রিপল এপারেলস্ কারখানার প্রধান গেইট ও অফিস কক্ষ ও বিভিন্ন ভবনের কাঁচ ভাঙচুর করে। পরে হামলাকারীরা এম এইচ সি এপারেলস্ কারখানার প্রধান গেইট ভেঙে ভেতরে ঢুকে দুইটি বহুতল ভবনের কাঁচ, আসবাবপত্র, একটি প্রাইভেটকার, দুটি কাভারভ্যান ভাঙচুর করে। এ ছাড়া সি আরসি ও নোমান উইভিং কারখানাতেও হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। হামলার কারণে এসব কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
এসব বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার প্রয়োজনে ভাঙচুর করা কারখানাগুলোর দায়ীত্বশীল কাউকে পাওয়া যায়নি। তাই তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ শাহীনুর আলম জানান,' শ্রমিক মৃত্যুর খবর পেয়ে কালার কোম্পানিতে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়। এর সুযোগ নিয়ে দুষ্কৃতকারী চারটি পৃথক কারখানায় হামলা চালায়। পরে হামলাকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়। একটি মহল পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে এমন ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া নিবো।'
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: নাহিদ ভুঁইয়া যায়যায়দিনকে বলেন,' শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা সুষ্ঠু তদন্ত হবে এবং কারখানা কর্তৃপক্ষের অবহেলা থাকলে ব্যবস্থা হবে। কিন্তু লাঠিসোটা নিয়ে অন্যান্য কারখানায় হামলা এটা আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্বাভাবিক করার চেষ্টা। একটি ঘটনা কেন্দ্র করে কোনো মহল যাতে ভিন্নখাতে অপৎপরতা চালাতে না পারে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে।'