ঢাকা | মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বনাশা মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে সরকারি এবং সামাজিক প্রতিরোধ জরুরি

author
এ এইচ এম ফারুক

প্রকাশিত : ২৬ জুন, ২০২৬ বিকেল ৫:৩০
ad003
একটি দেশের মেরুদণ্ড হলো তার তরুণ সমাজ। তরুণদের মেধা, শ্রম আর উদ্দীপনার ওপর ভর করেই রাষ্ট্র তার সমৃদ্ধির সোপানে আরোহণ করে। কিন্তু সেই তরুণ সমাজ যদি মাদক আর জুয়ার দ্বৈত ছোবলে ক্ষতবক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে, তবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হতে বাধ্য। বর্তমান বাংলাদেশে মাদক ও অনলাইন জুয়া কেবল সাধারণ কোনো সামাজিক ব্যাধি নয়; এটি এখন একটি গুরুতর জাতীয় নিরাপত্তা সংকট এবং অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণের অন্যতম প্রধান কারণ। 

সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮২ লাখে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, প্রযুক্তির অপব্যবহারের সুযোগ নিয়ে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সর্বনাশা অনলাইন জুয়া। শত-শত জুয়ার সাইট ও অ্যাপের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত দেশের কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। 

মাদকের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের নীলনকশা এবং অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করার এই জোড়া বিপদের বিরুদ্ধে এখন সরকারি ও সামাজিক পর্যায়ের সমন্বিত এবং কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা এবং ইন্টারনেটের প্রসারের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশে অনলাইন জুয়া এক মহামারীর আকার ধারণ করেছে। এটি এখন কেবল নির্দিষ্ট কোনো ক্লাবে সীমাবদ্ধ নেই, বরং চলে এসেছে যুবসমাজের হাতের মুঠোয়।

সাইট ও অ্যাপের বিস্তার: দেশে শতাধিক আন্তর্জাতিক ও দেশীয় অনলাইন জুয়ার সাইট এবং মোবাইল অ্যাপ সক্রিয় রয়েছে। বিভিন্ন চটকদার বিজ্ঞাপনের ফাঁদে ফেলে সাধারণ তরুণ, শিক্ষার্থী এবং নিম্ন আয়ের মানুষদের এই জুয়ার মোহগ্রস্ত জালে জড়ানো হচ্ছে।
হুন্ডি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে টাকা পাচার: অনলাইন জুয়ার এই বাজি ধরা ও লেনদেনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, রকেট, নগদ) চ্যানেল। পরবর্তীতে এই অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সি কিংবা অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে নিমেষেই দেশ থেকে বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে দেশ এক বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা হারাচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতিকে ভেতর থেকে সম্পূর্ণ ফাঁপা করে দিচ্ছে।

ভূ-রাজনৈতিক নীলনকশা ও মাদকের প্রবেশপথ:
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান মাদকের আন্তর্জাতিক চোরাচালান রুটের অত্যন্ত কাছাকাছি হওয়াতে একে বড় বাজার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশসমূহ থেকে সুপরিকল্পিতভাবে আসা মাদকের ঢল আমাদের যুবসমাজকে অলস ও কর্মবিমুখ করে তুলছে।

মিয়ানমার (বার্মা) সীমান্ত ও ইয়াবা-আইস: টেকনাফ ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে প্রতিনিয়ত আসছে ইয়াবা এবং ক্রিস্টাল মেথ বা 'আইস'। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং সীমান্ত সংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চলগুলোকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। আরকান আর্মির মতো আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধেও এই মাদক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ও অর্থায়নের অভিযোগ রয়েছে।

ভারত সীমান্ত ও ফেনসিডিল-হেরোইন: অন্যদিকে, প্রতিবেশী ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত ব্যবহার করে দেশে ঢুকছে ফেনসিডিল, হেরোইন এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর ইনজেকশন।

এটি কেবল সাধারণ অপরাধ নয়; বরং একটি সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। কোনো দেশের তরুণ সমাজকে মাদকাসক্ত ও জুয়াড়ি বানিয়ে দিতে পারলে সেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এমনিতেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়। বাংলাদেশকে ঠিক এই ফাঁদেই ফেলার চেষ্টা চলছে।

মাদক এবং জুয়া—উভয়ই মানুষের চিন্তাশক্তি ও নৈতিক মূল্যবোধকে অবশ করে দেয়। একজন আসক্ত ব্যক্তি যখন তার জুয়ায় হারা টাকা বা মাদকের অর্থ জোগাড় করতে পারে না, তখন সে যেকোনো জঘন্য অপরাধ করতে দ্বিধাবোধ করে না।

পারিবারিক সহিংসতা ও নিঃস্ব পরিবার: জুয়ায় সবকিছু হারিয়ে কিংবা মাদকের টাকার জন্য সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতাকে হত্যা, কিংবা স্বামীর হাতে স্ত্রী খুনের মতো লোমহর্ষক ঘটনা এখন প্রতিনিয়ত ঘটছে। হাজার হাজার পরিবার আজ এই দুই ব্যাধির কারণে পথে বসেছে।
কিশোর গ্যাং ও পাড়া-মহল্লার সন্ত্রাস: শহরের পাড়া-মহল্লায় গড়ে ওঠা 'কিশোর গ্যাং' বা তরুণ অপরাধী চক্রগুলোর মূল চালিকাশক্তি হলো মাদক এবং দ্রুত বড়লোক হওয়ার জুয়াড়ি মানসিকতা। স্থানীয় অপরাধী চক্রগুলো এদের ফ্রন্টলাইনার হিসেবে ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও দখলবাজি চালায়।

মামলার জট ও বিচার ব্যবস্থার ওপর চাপ: রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের আদালতগুলোতে লাখ লাখ মাদক মামলা ঝুলে রয়েছে। মাদক ও জুয়া সংক্রান্ত মামলার এই বিশাল জটের কারণে বিচার ব্যবস্থার গতি শ্লথ হয়ে পড়ছে এবং অন্যান্য গুরুতর অপরাধের বিচার বিলম্বিত হচ্ছে।

সামাজিক প্রতিরোধের কার্যকর পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক শুদ্ধি:
বিশেষজ্ঞরা বলছেন- এই দ্বৈত সংকট নিয়ন্ত্রণে সরকারের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি), পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি এবং বিটিআরসিকে কিছু কঠোর নীতি ও আইনগত সংস্কার গ্রহণ করতে হবে। 

১. অপরাধীদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বহিষ্কার: জুয়া ও মাদককার্বারের সাথে জড়িত ব্যক্তি যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি দেখাতে হবে। সম্প্রতি মাদক কারবারে জড়িত থাকার অপরাধে জেলা পরিষদের সদস্য পদ থেকে বহিষ্কারের মতো দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপগুলো প্রমাণ করে যে, সরকার এখন অপরাধীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক আশ্রয় কেড়ে নিতে বদ্ধপরিকর। এই ধারা স্থানীয় পর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত বজায় রাখতে হবে।

২. জুয়ার সাইট ও অ্যাপ শতভাগ ব্লক করা: বিটিআরসির মাধ্যমে দেশে সক্রিয় সকল দেশী-বিদেশী অনলাইন জুয়ার ডোমেইন, সাইট এবং অ্যাপগুলোকে স্থায়ীভাবে ব্লক করতে হবে। মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতাদের লেনদেনে কঠোর নজরদারি বসাতে হবে যেন জুয়ার এজেন্টের কাছে টাকা পৌঁছাতে না পারে।

৩. জিরো টলারেন্স ও সীমান্ত সিলড করা: মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকাগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি, থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা এবং ড্রোন নজরদারি বাড়াতে হবে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্ট গার্ডের সক্ষমতা দ্বিগুণ করতে হবে।
৪. স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল ও কঠোর শাস্তি: মাদক ও অনলাইন জুয়ার গডফাদার, ল্যাপটপ-মোবাইল ভিত্তিক মূল এজেন্ট ও অর্থদাতাদের জন্য মৃত্যুদণ্ড বা আমৃত্যু কারাদণ্ডের বিধান কঠোরভাবে কার্যকর করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা জরুরি।

সামাজিক প্রতিরোধ: 
কেবল আইন প্রয়োগ বা রাষ্ট্রীয় শক্তি দিয়ে এই মহামারী পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়, যদি না এর বিরুদ্ধে একটি সামাজিক বিপ্লব গড়ে তোলা যায়।

পারিবারিক সচেতনতা ও ডিজিটাল নজরদারি: সন্তান স্মার্টফোনে বা কম্পিউটারে কী করছে, কোনো জুয়ার সাইটে আসক্ত হচ্ছে কি না, কিংবা কার সাথে মিশছে—পিতা-মাতাকে তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সন্তানকে সাইবার নিরাপত্তা ও নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা: স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত মাদক ও জুয়াবিরোধী সেমিনার ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। ডোপ টেস্ট প্রথা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।

ধর্মীয় ও নৈতিক অনুশাসন: ইসলামসহ সকল ধর্মে জুয়া ও মাদককে সম্পূর্ণ 'হারাম' বা নিষিদ্ধ ও মহাপাপ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। মসজিদ, মন্দিরসহ সকল ধর্মীয় উপাসনালয়ে জুয়া ও মাদকের কুফল এবং এর সামাজিক ক্ষতি নিয়ে নিয়মিত আলোচনা ও জুমা'র খুতবায় ইমামদের জোরালো ভূমিকা রাখার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। 

মহল্লায় যুবসমাজ ও সচেতন নাগরিকদের কমিটি: প্রতিটি পাড়া ও মহল্লায় "মাদক ও জুয়া প্রতিরোধ কমিটি" গঠন করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এই কমিটি এলাকায় কোনো নতুন মাদক বিক্রেতা, জুয়ার ডিজিটাল এজেন্ট বা সন্দেহভাজন জমায়েত দেখলে সামাজিক বয়কট গড়ে তুলবে এবং প্রশাসনকে জানাবে।

সর্বোপরি মাদক ও অনলাইন জুয়া কোনো একক ব্যক্তির বা পরিবারের সমস্যা নয়, এটি পুরো রাষ্ট্রের সামাজিক ও অর্থনীতির ওপর এক মারাত্মক আঘাত। ৮০ লাখেরও বেশি মাদকাসক্তের সংখ্যা এবং ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়া অনলাইন জুয়ার আসক্তি আমাদের সতর্ক করছে যে, আমরা যদি এখনই জেগে না উঠি, তবে আগামী দিনে এক মেধাহীন, পঙ্গু ও দেউলিয়া প্রজন্মের মুখোমুখি হতে হবে। মাদকের এই মরণকামড় এবং জুয়ার এই ডিজিটাল ফাঁদ থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক শক্তির এক অভূতপূর্ব সমন্বয় প্রয়োজন। সরকারের কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ (যেমন অপরাধীদের জনপ্রতিনিধিত্ব বা পদ থেকে অপসারণ) এবং আমজনতার সামাজিক প্রতিরোধের ইস্পাতকঠিন প্রাচীর দিয়ে এই সর্বনাশা সিন্ডিকেটকে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। তবেই নিশ্চিত হবে একটি নিরাপদ, সমৃদ্ধ, সুস্থ এবং সার্বভৌম বাংলাদেশ।

লেখক: এ এইচ এম ফারুক (A H M Faruk)
সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
ইমেইল: [email protected]





সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT