জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পৌর শহরের হাসপাতালের পশ্চিম প্রান্তসংলগ্ন ব্যস্ত মেইন সড়ক। প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদচারণা, যানবাহনের কোলাহল ও জমজমাট বেচাকেনায় মুখর থাকে পুরো এলাকা। অথচ সেই ব্যস্ততার মাঝেই প্রায় আড়ালে পড়ে আছে মাত্র দেড় ফুট প্রস্থ ও পাঁচ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি ছোট্ট দোকান। দোকান নয়, যেন একটি বাক্স। সেখানেই গত তিন দশক ধরে তালা-চাবি মেরামত করে জীবিকা নির্বাহ করছেন পৌর এলাকার একমাত্র তালা-চাবি কারিগর মো. আব্দুল মতিন (৫৬)।
সরেজমিনে দেখা যায়, দোকানের ঠিক সামনে আড়াই ফুট পর মেইন সড়ক, তার ডান পাশে একটি বিদ্যুতের খুঁটি এবং অন্য পাশে অন্য প্রতিষ্ঠানের বড় সাইনবোর্ড এর খুঁটি থাকায় দূর থেকে দোকানটি প্রায় চোখেই পড়ে না। ক্রেতাদের দাঁড়ানোর মতোও পর্যাপ্ত জায়গা নেই। ফলে দোকান খুঁজে না পেয়ে অস্বস্তিতে পড়েন অনেক ক্রেতা।
মো. আব্দুল মতিনের বাড়ি জয়পুরহাটের জামালপুর ইউনিয়নের খেজুরতলী গ্রামে। পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দেন তিনি। অন্যর দোকানে থেকে দেখে শিখেই তালা-চাবি মেরামতের কাজ শুরু হয় তার । ১৯৯৬ সালে আক্কেলপুর হসপিটাল পশ্চিম এরিয়ার সামনে ছোট্ট এই দোকান নিয়ে শুরু করেন নিজের ব্যবসা।
মতিন বলেন, শুরুতে বাজারে পাঁচ-ছয়জন তালা-চাবির কারিগর ছিল। এখন সবাই অন্য পেশায় চলে গেছে। এই পৌরসভায় আমি একাই এখন এই কাজ করি। এই ছোট্ট দোকান থেকেই স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে সংসার চালিয়েছি আসছি গত ৩০ বছর ধরে। কারও আগ্রহ নাই এই কাজ শেখার, তবে আমি মরে গেলে হয়তবা এই পেশা হারিয়ে যাবে।
দোকানের ভেতরে একজন মানুষ বসলে আর নড়াচড়া করার মতো জায়গা থাকে না। চারদিকে তালা, চাবি, কাটিং মেশিন, ফাইল, প্লায়ার্স, স্ক্রু-ড্রাইভারসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি গাদাগাদি করে রাখা। তিনি বলেন, অনেক ক্রেতা ফোন করে দোকান খুঁজে না পেয়ে ফিরে যান। কেউ কেউ কয়েকবার খুঁজে তারপর আসেন। সামনে যদি একটু জায়গা থাকত, তাহলে অন্তত একজন মানুষ দাঁড়িয়ে কাজ করাতে পারতেন।
একসময় প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হলেও বর্তমানে গড়ে ৪০০ থেকে ৭০০ টাকার বেশি আয় হয় না। কোনো কোনো দিন মাত্র ২০০ টাকায় দিন শেষ করতে হয়। বিদ্যুৎ বিল, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও কাঁচামাল কিনতে মাসে আরও প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা ব্যয় হয়।
মতিন বলেন আরও বলেন, আগে মানুষ তালা মেরামত করাতো। এখন নষ্ট হলে নতুন তালা কিনে নেয়। আবার ডিজিটাল লক আসায় কাজ আরও কমে গেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী তুফান বলেন, একসময় আক্কেলপুর বাজারে অন্তত পাঁচজন তালা-চাবির কারিগর ছিলেন। সময়ের পরিবর্তনে সবাই অন্য পেশায় চলে গেছেন। নতুন প্রজন্মও এ পেশায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না। কম আয়, দীর্ঘ সময়ের শ্রম, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এই ঐতিহ্যবাহী পেশা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, রাতে বা ছুটির দিনে তালার সমস্যা হলে মতিন ভাই ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যায় না। তিনি না থাকলে অনেক দূরে যেতে হবে। দোকানটা সামনে থেকে দেখা যায় না। পৌরসভা চাইলে একটু জায়গা করে দিলে তার ব্যবসা আরও ভালো চলতে পারত।
আক্কেলপুর কলেজ বাজার বণিক সমিতির আহবাক মোঃ আলমগীর চৌধুরী বাদশা বলেন, মতিন ভাই দীর্ঘদিন ধরে আক্কেলপুর বাজারে তালা-চাবির কাজ করে আসছেন। এখন বাজারে এ ধরনের দক্ষ কারিগর প্রায় নেই বললেই চলে। তার দোকানের অবস্থান এমন যে অনেক ক্রেতাই সহজে খুঁজে পান না। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আক্কেলপুর জোনাল অফিসের ডিজিএম মো: আব্দুল রহমান সরদার বলেন, বিদ্যুতের খুঁটি স্থানান্তরের বিষয়টি কারিগরি ও নিরাপত্তাজনিত দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কেউ লিখিত আবেদন করলে আমরা সরেজমিনে পরিদর্শন করে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করব।
জয়পুরহাট বিসিক শিল্পীনগরীর উপব্যবস্থাপক লিটন চন্দ্র ঘোষ বলেন, ঐতিহ্যবাহী ক্ষুদ্র ও কারিগরি পেশাকে টিকিয়ে রাখতে দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তার বিষয়ে বিসিক কাজ করে থাকে। কেউ সহযোগিতা বা প্রশিক্ষণের জন্য আবেদন করলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।