একজন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে গেলেন। চিকিৎসক প্রথমেই ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ করে দিলেন। রক্তপাত আপাতত বন্ধ হলো। কিন্তু চিকিৎসা কি সেখানেই শেষ? নিশ্চয়ই নয়। ক্ষত সারাতে ওষুধ লাগবে, সংক্রমণ ঠেকাতে অ্যান্টিবায়োটিক লাগবে, প্রয়োজনে অস্ত্রোপচারও লাগতে পারে। কারণ শুধু ব্যান্ডেজ ক্ষত ঢেকে রাখতে পারে, ক্ষত সারাতে পারে না।
বাংলাদেশে অপরাধ দমনে আমাদের বহু বছরের কার্যক্রমের দিকে তাকালে বারবার এই দৃশ্যটিই মনে পড়ে। মাঝেমধ্যে বড় অভিযান হয়, কিছু মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার হয়, সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়, কিছুদিন পর পরিস্থিতি আবার আগের জায়গায় ফিরে যায়। যেন আমরা ক্ষতের চিকিৎসা করছি না, শুধু ব্যান্ডেজ বদলাচ্ছি।
আগেও আমি বহুবার বলেছি যে, একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু উঁচু সেতু, দৃষ্টিনন্দন মহাসড়ক কিংবা প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়নের মানদণ্ড হলো—মানুষ কতটা নিরাপদ, আইন কতটা কার্যকর, সমাজ কতটা নৈতিক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কতটা সুস্থ। কিন্তু আজ বাংলাদেশের বাস্তবতা বলছে, মাদক আমাদের সমাজ, অর্থনীতি, পরিবার এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরে এমনভাবে প্রবেশ করেছে যে এটি এখন শুধু একটি আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সংকট।
আজ হত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই, ডাকাতি, কিশোর গ্যাং, পারিবারিক সহিংসতা, চাঁদাবাজি কিংবা সন্ত্রাস—অসংখ্য অপরাধের ঘটনায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদকের উপস্থিতি দেখা যায়। অবশ্যই সব অপরাধের একমাত্র কারণ মাদক নয়, এবং সব মাদকাসক্ত মানুষ অপরাধীও নন। কিন্তু এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই যে মাদক মানুষের বিচারবোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নৈতিক সংযমকে দুর্বল করে গুরুতর অপরাধের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড গোটা দেশকে শোকাহত করেছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার সময় মাদকাসক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছে। এই একটি ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্যও একটি কঠিন সতর্কবার্তা।
কয়েক বছর আগেও অনেকেই মনে করতেন, মাদক শুধু সীমান্তবর্তী এলাকা কিংবা বড় শহরের সমস্যা। কিন্তু বাস্তবতা আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামেও ইয়াবা, আইস, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ নানা ধরনের মাদক পৌঁছে গেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, কোথাও কোথাও ব্যক্তি নয়, পুরো পরিবারই এই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
সম্প্রতি কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম প্রকাশিত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনার জন্ম দেয়। সেখানে দেখা যায়, একটি মাদক ব্যবসায়ী পরিবারের প্রধানকে গ্রেপ্তারের পর কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর স্ত্রী ও এক নিকট আত্মীয় একই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এ ঘটনা দিয়ে পুরো দেশের চিত্র আঁকা যায় না, কিন্তু এটি স্পষ্ট করে যে অনেক ক্ষেত্রে মাদক ব্যবসা এখন পারিবারিক ও সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রে রূপ নিচ্ছে।
ক'দিন আগে কুমিল্লায় মাদকবিরোধী একটি মানববন্ধনে অংশ নিয়ে ফেরার পথে একজন স্কুল শিক্ষার্থীকে গুলি করা হয়েছে। এই বাস্তবতায় কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে তিনি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে গোলাবাড়িতে লং মার্চ করবেন, প্রয়োজনে সংসদ সদস্য পদ থেকেও পদত্যাগ করবেন।
অন্যদিকে ঢাকা-৩ আসনের সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় জাতীয় সংসদে বলেছেন, আইন থাকলেই হয় না; আইন কার্যকর করতে সাহস, সততা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার। এই দু'জন সরকার দলীয় সংসদ সদস্যের বক্তব্য প্রমাণ করে যে—মাদক এখন জাতীয় সংকট।
বাংলাদেশে মাদকবিরোধী কঠোর আইন রয়েছে। নিয়মিত অভিযানও পরিচালিত হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এত অভিযান সত্ত্বেও মাদক কেন কমছে না? কেন নতুন নতুন সিন্ডিকেট তৈরি হচ্ছে? কীভাবে সীমান্ত পেরিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক দেশে প্রবেশ করছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের বুঝতে হবে, আমরা এখনও মূল রোগের পরিবর্তে উপসর্গের চিকিৎসা করছি।
খুচরা বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। কারণ সে পুরো ব্যবস্থার ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। প্রকৃত শক্তি থাকে অর্থদাতা, পাচারকারী, সিন্ডিকেট, সরবরাহকারী এবং প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের হাতে। তারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে গেলে একজনের জায়গায় আরেকজন চলে আসে।
চরম সত্য হলো, মাদক একটি বিশাল অবৈধ অর্থনীতি। এই অর্থনীতির সঙ্গে যারা যুক্ত, তারা শুধু অবৈধ মুনাফাই অর্জন করে না; তারা সেই অর্থ ব্যবহার করে সামাজিক প্রভাবও তৈরি করে।
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতার আরেকটি নির্মম চিত্র এখানে উল্লেখ করতে চাই। আমরা এমন একটি সমাজে বাস করছি, যেখানে কেউ হঠাৎ বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে গেলে খুব কম মানুষ প্রশ্ন করেন—এই অর্থ কোথা থেকে এলো? কীভাবে কয়েক বছরের মধ্যে বিলাসবহুল গাড়ি, অট্টালিকা, ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে উঠল?
বরং দেখা যায়, সেই ব্যক্তিকেই বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, এতিমখানা কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে স্থান দেওয়া হচ্ছে। তাকে সম্মানিত অতিথি বানানো হচ্ছে, ফুল দিয়ে বরণ করা হচ্ছে, সমাজের নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হচ্ছে।
এটি শুধু একটি নৈতিক সংকট নয়; এটি অপরাধ অর্থনীতির সামাজিক বৈধতা অর্জনের প্রক্রিয়া।
যে সমাজে অর্থই সম্মানের একমাত্র মানদণ্ড হয়ে যায়, সেখানে বৈধ-অবৈধ উপার্জনের পার্থক্য ধীরে ধীরে মুছে যেতে থাকে। তখন তরুণদের একটি অংশও মনে করতে শুরু করে—যেভাবেই হোক অর্থ উপার্জন করাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।
এই সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে শুধু আইন দিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব হবে না।
যারা অবৈধ সম্পদের মালিক, তাদের সামাজিক মর্যাদা নয়; জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। অবৈধ অর্থকে সম্মান নয়, সামাজিক ঘৃণার কারণ বানাতে হবে। সমাজের নৈতিক অবস্থান পরিবর্তন না হলে অপরাধ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সমাজে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে যে কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কিংবা প্রশাসনিক প্রভাব অপরাধীদের রক্ষা করে। এসব অভিযোগ যেখানে রয়েছে, সেখানে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। কারণ অপরাধীর কোনো দল নেই। আইনের চোখে তার একটাই পরিচয়—সে অপরাধী।
এখানে আরেকটি নির্মম বাস্তবতা হলো,পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার আমলে দেশে মাদকের অবাধ বিস্তার ঘটেছে। সীমান্তে নতুন রুট তৈরি হয়েছে, নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদক বাজারে এসেছে, অপরাধচক্র আরও সংঘবদ্ধ হয়েছে। ফলে এক-দুই দশক আগের কৌশল দিয়ে বর্তমান সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
বিশ্বের কিছু দেশ আমাদের জন্য শিক্ষণীয় উদাহরণ তৈরি করেছে। সিঙ্গাপুর কঠোর আইন, দ্রুত বিচার, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। জাপান কমিউনিটি-ভিত্তিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা ও আইনের কার্যকর প্রয়োগকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়েছে। আইসল্যান্ড আবার তরুণদের খেলাধুলা, সংস্কৃতি, পরিবার ও সামাজিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে মাদকাসক্তি নাটকীয়ভাবে কমিয়েছে।
এই অভিজ্ঞতাগুলো প্রমাণ করে যে—শুধু গ্রেপ্তার নয়; প্রতিরোধ, শিক্ষা, পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান, সুশাসন এবং দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান—সবকিছুর সমন্বয় ছাড়া স্থায়ী সফলতা আসে না।
সুতরাং বাংলাদেশেও এখন সময় এসেছে মাদকবিরোধী কার্যক্রমকে একটি সর্বাত্মক জাতীয় আন্দোলনে রূপ দেওয়ার।
সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। মাদক পাচারের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হবে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। মাদকাসক্তদের জন্য চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়াতে হবে। তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, এই লড়াইকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে তুলতে হবে।
সরকার, বিরোধী দল, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষক, অভিভাবক, ধর্মীয় নেতা, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ—সবার মধ্যে একটি জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। সংসদে বিশেষ আলোচনা, দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা এবং নিয়মিত মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।
আজ যে শিশুটি মাদকের প্রভাবে উন্মত্ত এক অপরাধীর হাতে প্রাণ হারায়, আগামীকাল সেই তালিকায় আরেকটি নাম যুক্ত হতে পারে। আজ যে তরুণটি মাদকাসক্ত, সে আগামী দিনের একজন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, উদ্যোক্তা কিংবা রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার সম্ভাবনা হারাচ্ছে।
মাদক শুধু একজন মানুষকে ধ্বংস করে না; এটি একটি পরিবারকে ভেঙে দেয়, একটি সমাজকে দুর্বল করে এবং ধীরে ধীরে একটি জাতির ভবিষ্যৎকে গ্রাস করে।
তাই প্রশ্ন হচ্ছে—আমরা কি শুধু অভিযানের ছবি, বক্তৃতা আর দিবস পালনে সন্তুষ্ট থাকব, নাকি সমস্যার গোড়ায় হাত দেব?
পরিশেষে বলতে চাই, শুধু ব্যান্ডেজ নয়, ক্ষতের চিকিৎসা করতে হবে। শুধু খুচরা বিক্রেতা নয়, পুরো সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। শুধু আইন নয়, নৈতিকতাকেও পুনর্গঠন করতে হবে। শুধু সরকারের নয়, পুরো জাতির সম্মিলিত লড়াই দরকার।
মাদক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কারণ মাদক অপরাধের একমাত্র কারণ না হলেও এটি অপরাধের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। আজ যদি আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে চাই, মানবসম্পদকে বাঁচাতে চাই এবং একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও সভ্য বাংলাদেশ গড়তে চাই, তবে এখনই মাদকের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক, সমন্বিত, নিরপেক্ষ এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অভিযান শুরু করতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল: [email protected]