ঢাকা | রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ: গতি ফিরছে আমিনবাজার প্রকল্পে, ২০২৮ সালের নভেম্বরের নতুন লক্ষ্যমাত্রা

author
আসাদুজ্জামান খাইরুল, আশুলিয়া

প্রকাশিত : ২ জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:২৪
ad003
ঢাকার ফুসফুস খ্যাত সাভারের আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে দিতে শুরু হয়েছে নতুন কর্মযজ্ঞ। দেশের ইতিহাসে অন্যতম মেগা পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ ‘বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের কার্যক্রম গতি পেয়েছে। নানা জটিলতা পেরিয়ে প্রকল্পটির কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে এবার নতুন সময়সীমা ও চূড়ান্ত রূপরেখা ঘোষণা করেছে সরকার।

গত বুধবার (০১ জুলাই) সরেজমিনে বলিয়ারপুরের আমিনবাজার ল্যান্ডফিল পরিদর্শন শেষে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের জানান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশনায়, সাভার আমিন বাজার ল্যান্ডফিলের বর্জ্য, প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এই প্রকল্পের কাজ পাওয়া চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, "চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন" (সিএমইসি) -কে আবার সময় বাড়িয়ে ২০২৮ সালের নভেম্বর পর্যন্ত চূড়ান্ত ডেডলাইন দেওয়া হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মূলত জমি অধিগ্রহণ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ল্যান্ডফিলের স্থান সংকটের মতো বড় কিছু চ্যালেঞ্জের কারণে চুক্তিতে থাকা মেয়াদকাল থেকে প্রায় তিন বছর পিছিয়ে ছিল প্রতিষ্ঠানটি।

প্রকল্প শুরু করতে যে সকল জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়- 

১. এই প্রকল্পের জন্য বড় একটি জায়গার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমিনবাজার এলাকার জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল ছিল। জমির মালিকানা সংক্রান্ত কিছু আইনি জটিলতা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সময় লেগে যায়। জমি পুরোপুরি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিএমইসি (CMEC)-এর কাছে বুঝিয়ে দিতে দেরি হওয়ার কারনে প্রকল্পের প্রাথমিক গতি ধীর করে দেয়।

২. বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল প্ল্যান্ট বা কারখানা স্থাপনের জন্য এই জমে থাকা বর্জ্য অপসারণ করে মাটির উপরিভাগ প্রস্তুত করা একটি বিশাল টেকনিক্যাল চ্যালেঞ্জ। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক যন্ত্রপাতি বসানোর আগে মাটিকে স্থিতিশীল করতে হচ্ছে। প্রতিদিনের নতুন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু রেখেই এই কাজ করতে হচ্ছে।

৩. প্রকল্পটির প্রাথমিক চুক্তি এবং পরিকল্পনা যখন করা হয়েছিল, এর পরপরই বৈশ্বিক কিছু সংকট (যেমন করোনা মহামারীর পরবর্তী ধাক্কা এবং আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইন সমস্যা) মালামাল আমদানিতে ব্যাঘাত ঘটায়। চীনের প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞদের সাইটে আসা এবং ভারী যন্ত্রপাতি সময়মতো চীন থেকে শিপমেন্ট করার ক্ষেত্রে যে বেগ পেতে হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন।

৪. বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন (Waste-to-Energy) প্রযুক্তি বাংলাদেশে নতুন। এখানে মূলত বর্জ্য ভস্মীকরণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে, যা থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪২.৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। এই ধরনের প্ল্যান্ট স্থাপনে পরিবেশগত ছাড়পত্র, কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং গ্রিড লাইনের সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য অত্যন্ত নিখুঁত ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রয়োজন হয়, যার প্রক্রিয়াকরণে সময় লেগে যায়।

দীর্ঘদিনের স্থবিরতা পেরিয়ে প্রকল্পে সবুজ সংকেত -

আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের এই বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বিগত দিনে বেশ কয়েকবার সময় ও রূপরেখা পরিবর্তনের সম্মুখীন হয়। এর আগে ২০২৩ সালের শেষভাগে কাজ শুরু করে ২০২৬ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও ভূমি অধিগ্রহণ, স্থান জটিলতা এবং পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণের কারণে প্রকল্পটি ধীরগতিতে চলে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের কঠোর তদারকিতে এই জট খুলেছে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, ইতিমধ্যে সবচেয়ে বড় বাধাটি দূর হয়েছে। বিদ্যুৎ প্ল্যান্টের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের চূড়ান্ত ছাড়পত্র (ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট) পাওয়া গেছে। ফলে এখন আইনগত ও পরিবেশগত কোনো বাধা আর অবশিষ্ট নেই। তাই আগামী ২০২৮ সালের নভেম্বরের মধ্যেই জাতীয় গ্রিডে এই পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।

২৫ বছরের চুক্তি, যেভাবে চলবে এই মেগা প্রকল্প -

চুক্তি অনুযায়ী, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (ঈগঊঈ) একটি স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদক বা আইপিপি (ওচচ) হিসেবে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ও ব্যবস্থাপনায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। বিগত দিনের সমীক্ষা অনুযায়ী, এই পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে ৪২.৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এবং ২৫ বছর মেয়াদে এই প্ল্যান্টটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে চীনা প্রতিষ্ঠানটি। তাদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) চুক্তিভিত্তিক মূল্যে সরাসরি ক্রয় করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবে। এছাড়াও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এই প্রকল্পের সহযোগি মূল অংশীদার হিসেবে এই চীনা প্রতিষ্ঠানকে ৩০ একর জমি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল কাঁচামাল বা 'বর্জ্য' সরবরাহ করবে। প্রতিদিন ল্যান্ডফিলে জমে থাকা এবং নতুন সংগৃহীত বর্জ্য থেকে অন্তত ৩,০০০ মেট্রিক টন কঠিন বর্জ্য চীনা প্রতিষ্ঠানটিকে সরবরাহ করতে হবে। এর মাধ্যমে একদিকে ঢাকার বর্জ্য সংকটের স্থায়ী ও বৈজ্ঞানিক সমাধান হবে, অন্যদিকে দূর হবে সাভারবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্গন্ধ ও পরিবেশ দূষণের অভিশাপ।

এ সকল কার্যক্রম দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিতে প্রতিনিয়ত সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পরিদর্শন ও তদারকি করছেন ‌। এর ধারাবাহিকতায় বুধবার বিকেলে আমিনবাজার ল্যান্ডফিল পরিদর্শনের সময় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনসহ বিদ্যুৎ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

পরিদর্শনকালে কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, আধুনিক পরিবেশবান্ধব ইনসিন্যারেশন (ওহপরহবৎধঃরড়হ) প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ তৈরির এই প্রকল্প চালুর পর আমিনবাজারের চিরচেনা দূষিত চিত্র পুরোপুরি বদলে যাবে। ২০২৮ সালের নভেম্বরকে কেন্দ্র করে এখন পুরোদমে চলছে অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তুতি। ঢাকার আবর্জনা এখন আর পরিবেশের বোঝা নয়, বরং সম্পদে পরিণত হওয়ার চূড়ান্ত অপেক্ষায়।
সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SHA.AZH

SHA.AZH

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT