ঢাকার আশুলিয়ায় ব্রাজিল ও জাপানের মধ্যকার ফুটবল ম্যাচের খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে নাহিদ হাসান (১৫) নামের এক কিশোর গত ছয় দিন ধরে নিখোঁজ রয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, খেলার বিরোধের জেরে তাকে খুন করে লাশ গুম করা হয়েছে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে তল্লাশি চালিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
নিখোঁজের চাচার আহাজারি, "আমার ভাইস্তাডা বাইচ আছে কিনা জানিনা। অন্তত লাশটা উদ্ধার কইরা দিলে আমরা ঝুইলা থাকতাম না। এখন তো কিছুই বুঝতাছি না বাইচা আছে না মইরা গেছে"।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিখোঁজ নাহিদ হাসান লালমনিরহাটের বড়বাড়ী-পঞ্চগ্রাম এলাকার রামদাস গ্রামের মোস্তাক আলীর ছেলে। সে গ্রামে থেকে সপ্তম শ্রেণীতে পড়াশোনা করত। গত কোরবানি ঈদের আগে আশুলিয়ার সাধুপাড়া এলাকায় বাবার কাছে বেড়াতে আসে সে। তার বাবা মোস্তাক আলী পেশায় একজন কসাই। ঘটনার কিছুদিন আগে বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লে নাহিদ আশুলিয়া বাজারের একটি কসাইয়ের দোকানে বাবার পরিবর্তে কাজ শুরু করে।
পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, গত ২৯ জুন (সোমবার) রাতে আশুলিয়ার নামাপাড়া এলাকার একটি দোকানে ব্রাজিল ও জাপানের মধ্যকার ফুটবল ম্যাচ নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে তীব্র কথাকাটাকাটি ও বিরোধের সৃষ্টি হয়। নাহিদ নিজে আর্জেন্টিনার সমর্থক ছিল। অভিযোগ রয়েছে, খেলা শেষে রাত আনুমানিক ১২টার দিকে প্রতিপক্ষ ব্রাজিল সমর্থক আমির হামজা, রাকিব, মেহেদী ও সিয়ামের সাথে নাহিদকে যেতে দেখে এলাকাবাসী। এরপর থেকেই সে নিখোঁজ রয়েছে।
নাহিদ নিখোঁজ হওয়ার পর তার স্বজনরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে গত ১ জুলাই (বুধবার) রাতে ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে আমির হামজা নামের এক কিশোরকে ধরে আশুলিয়া থানায় সোপর্দ করেন তারা।
ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে থাকা একটি অডিও রেকর্ডে এবং থানা হেফাজতে থাকা অবস্থায় হামজাকে বলতে শোনা যায়, "আমি কোইতাছি, খেলা লোইয়া মেহেদী, বঙ্গবন্ধু রোডের রাকিব আর মাঝিপাড়ার সিয়াম লগে নাহিদের ঝগড়া হোইছে। এইডা আমি দেখছি। পরে রাইত সাড়ে ১২ টার দিকে বালুচরে নিয়া গেছে। আমি তহন ছিলাম না। রাকিব আমারে কোইছে ওরে মাইরা বালুর নিচে চাপা দিয়া রাখছে"। তবে পুলিশ জানায়, পুলিশ হামজাকে নিয়ে ঘটনাস্থলে গেলে সে সঠিক জায়গা দেখাতে পারেনি। এছাড়াও পুলিশকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছিল বলেও জানায় পুলিশ।
নাহিদের চাচা ফারুক যায়যায়দিনকে বলেন, "আমার ভাইস্তাডা বাইচ আছে কিনা জানিনা। অন্তত লাশটা উদ্ধার কইরা দিলে আমরা ঝুইলা থাকতাম না। এখন তো কিছুই বুঝতাছি না বাইচা আছে না মোইরা গেছে"। 'ওর বাবার অসুস্থতার কারণে ওর বাবার পরিবর্তে অল্প কিছু দিন ধরে কসাইয়ের দোকানে কাজ করতেছিল । ২৯ তারিখ রাত ৮টার পর থেকে সে নিখোঁজ। আমির হামজা নামের ওই ছেলেটি নিজেই স্বীকার করেছিল যে ২৯ তারিখ রাইতে তার তিন বন্ধু মিলে নাহিদকে মেরে বালুর চরে পুঁতে রাখছে। আমাদের কাছে এর অডিও রেকর্ডও আছে। কসাই এর দোকানদারের সাথে আমার ভাইয়ের এর আগে কথা কাটাকাটি হয়েছিল। আর এই পোলাপানের সাথে কসাই এর দোকানদারের যোগস থাকতে পারে। আমাদের সন্দেহ দোকানের কসাই ও আমির হামজাকে। এই ঘটনায় আমরা বারবার মামলা করতে চাইলেও পুলিশ মামলা নিতেছে না'।
কিশোর নিখোঁজের ঘটনায় ১ জুলাই আশুলিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে নাহিদের পরিবার। সেখানে চারজনকে অভিযুক্ত করা হয়। জিডি দায়েরের পর আশুলিয়া থানা পুলিশ অভিযুক্ত আমির হামজাকে সাথে নিয়ে সাধুপাড়ার বালুর চরে সারারাত ও পরদিন সকাল পর্যন্ত তন্নতন্ন করে অনুসন্ধান চালায়।
এ বিষয়ে আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোঃ আজগর হোসেন যায়যায়দিনকে বলেন, "আমাদের এখানে গতকাল একটি মিসিং জিডি হয়েছিল। পরে তথ্য আসে যে ভিকটিমের লাশ বালু চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। আমরা আমাদের টিম এবং ওসি স্যারসহ তথ্য প্রদানকারীকে সাথে নিয়ে সারারাত ওই এলাকায় তল্লাশি চালিয়েছি। তবে এ ধরনের কোনো মরদেহের সত্যতা বা প্রমাণ মেলেনি। গুজব ছড়িয়েছে যে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থক নিয়ে মারামারিতে লাশ গুম হয়েছে, তবে যেহেতু আমরা এখনো কিছু পাইনি, তাই মন্তব্য করা ঠিক হবে না। বিষয়টি নিয়ে আমরা আরও যাচাই-বাছাই ও কাজ করছি।"
মরদেহ না মেলায় এবং প্রধান তথ্য প্রদানকারী কিশোর বক্তব্য পরিবর্তন করায় পুলিশি তৎপরতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ভুক্তভোগী পরিবার। তারা বলেছ অভিযুক্ত হামজার দেয়া তথ্য মতে বাকি তিনজনকে ও কসাই এর দোকানিকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেনি। এবং অভিযুক্ত হামজা প্রথমে বালুরচরে লাশ আছে বললেও পুলিশকে সাথে নিয়ে সে অন্য জায়গায় দেখিয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ জানিয়েছে, আইনের গতিতে তদন্ত চলছে এবং নিখোঁজ কিশোরকে উদ্ধারে সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।