ঢাকা | শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ইং | ১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সরকারের সময়োচিত সিদ্ধান্তে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের স্বস্তি

author
এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান

প্রকাশিত : ৫ জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:১১
ad003
নিরাপদ বিনিয়োগ ও মুনাফার হার বেশি হওয়ায় সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত ও অবসরপ্রাপ্তদের পছন্দের তালিকায় অগ্রভাগে রয়েছে সঞ্চয়পত্রের নাম। বিশেষ করে শেয়ারবাজারের ওঠানামার অস্থিরতায় বা ব্যাংক খাত নিয়ে অনিশ্চয়তা ও আস্থার সংকটের মধ্যেও সঞ্চয়প্রবণ মানুষ সংসার খরচের ছোট্ট একটি অংশের বন্দোবস্ত করেন সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকেই। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে লড়াইয়ে নিশ্চিত আয়ের মাধ্যম হওয়ায় অনেক পরিবারের আশা ভরসা বিনিয়োগের জনপ্রিয় এই খাতই। অন্তত এখানে মূলধনের নিরাপত্তা নিয়েও ন্যূনতম কোন ঝুঁকি নেই। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের জামানায় সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার কমানোর মধ্যে দিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জীবনে বড় এক ধাক্কা লেগেছিল। আয়ের এই উৎসও সংকুচিত হওয়ার চাপে অনেকেই কমিয়েছিলেন ভোগব্যয়। 

এবার নতুন সরকারের সময়ে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর করের হার একলাফে দ্বিগুণ করার খবর ছড়িয়ে পড়লে মধ্যবিত্তের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে। যদিও বিএনপি সরকার একই পথে হাঁটেনি। আস্থার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত এই মাধ্যমটিতে আর করের হার বাড়ায়নি। ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর থাকা মুনাফার হারই বহাল রেখেছে সরকার। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত সঞ্চয় কর্মসূচিতে চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরা আগের হারেই মুনাফা পাবেন। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) অর্থ মন্ত্রণালয়ের সরকারি ঋণ ও আর্থিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে- আগামী ছয় মাস সঞ্চয়পত্রের মুনাফার বিদ্যমান হার অপরিবর্তিত থাকবে।

সঞ্চয়পত্র নিয়ে সুসংবাদ দিয়ে এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘মধ্যবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় বর্তমান মুনাফার হার বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ তাঁর ভাষ্য, মধ্যবিত্তের অনেক পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভর করে সংসার চালায়। তাই নতুন করে হার পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, হার কমাতে পারলে সরকারের প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতো। কিন্তু মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় আমরা সেই সিদ্ধান্ত নিইনি।’ 

অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ছয় মাস অন্তর সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার পর্যালোচনা করে পুনর্নির্ধারণ করা হয়। স্কিমভেদে সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত থাকবে। এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতেও নতুন সরকার সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার কমানোর ঘোষণা দিলেও পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে আগের হারই বহাল রাখে। সরকার সময়োচিত এক সিদ্ধান্তে তাদের আর্থিক স্বস্তি নিশ্চিত করেছে। 

সীমিত আয়ের মানুষের কাছে এক থেকে দুই হাজার টাকা কম পাওয়া মানেই সংসার জীবনে নতুন করে চাপের মুখোমুখি হওয়া। তবে সরকারের ইতিবাচক এক পদক্ষেপে নিশ্চিত আয়ের সুযোগ হাতছাড়া না হওয়ায় বড় রকমের ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছেন সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারী লাখো মধ্যবিত্ত পরিবার। বিশেষভাবে উপকৃত হয়েছেন অর্ধকোটির বেশি অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, গৃহিণী, বিধবা ও পেনশনভোগীরাও। 

গত দু’মাসে ৯ শতাংশের ওপর মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির সব খাতেই বিস্তৃত হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে স্বাভাবিকভাবেই ক্রয় ক্ষমতা কমেছে সাধারণ মানুষের। সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষ। জীবন যুদ্ধে টিকে থাকতে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো তাদের সঞ্চয়ে হাত দিয়েছেন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে সরকার। তাঁরা এই গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে চায়। নিজেদের এই লক্ষ্য পূরণে সরকার নতুন করে আর মধ্যবিত্তের আয়ের এই নিরাপদ পথে সমস্যা তৈরি করেনি। 

বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের অধীনে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু রয়েছে—পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। সঞ্চয়পত্রে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক বেশি মুনাফা পান। এর বেশি বিনিয়োগে মুনাফার হার কিছুটা কম প্রযোজ্য হয়। পরিবার সঞ্চয়পত্রে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে মেয়াদ শেষে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এর বেশি বিনিয়োগে তা ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ। পেনশনার সঞ্চয়পত্রে প্রথম ধাপে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ধাপে ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ মুনাফা মিলছে।

পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং এর বেশি বিনিয়োগে ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ। তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ও ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের তিন বছর মেয়াদি হিসাবেও একইভাবে ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা বহাল রয়েছে।

সঞ্চয়পত্র থেকে প্রাপ্ত মাসিক আয় কমিয়ে দিলে মধ্যবিত্তের ঘরে ঘরে অর্থনৈতিক হাহাকার তৈরি হতো। সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার কমালে সরকার নিজেদের ২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করতে পারতো, যা অর্থমন্ত্রী আগেই বলেছেন। কিন্তু বর্তমান সরকার যে সাধারণ মানুষের ওপর ভোগান্তি নিরসন করতে চায় এবং মূল্যস্ফীতির চাপ দ্রুত কমাতে চায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্য থেকেই সেটি স্পষ্ট বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। 

তাঁরা বলছেন, মধ্যবিত্তের কষ্টার্জিত অর্থ থেকে বেশি কর আদায়ের পথে যায়নি সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরশীল মানুষদের কথা ভেবেছেন। তিনি মুনাফার হার অপরিবর্তিত রেখে মধ্যবিত্তের মন জয় করেছেন। সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষাও নিশ্চিত হয়েছে। তাই সঞ্চয়পত্রের মুনাফা অপরিবর্তিত রাখা ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের জন্য নি:সন্দেহে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। সরকার নিজেদের পদক্ষেপের মাধ্যমেই সেটি আরও একবার প্রমাণ করেছে। 

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সন্ধানী বার্তা; অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো.কম। 

সংবাদটি শেয়ার করুন :
প্রতিবেদকের তথ্য
SH.AL

SH.AL

© স্বত্বাধিকারঃ যায়যায়দিন
কারিগরী সহযোগিতায় MULTISOFT