জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ বিভাগের একমাত্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়৷ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের ভাবনা উঠে এসেছে প্রতিবেদনটিতে৷ বিস্তারিত লিখেছেন মুসলিম ইবনে রবি ৷
লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি মুক্ত ছাত্র সংসদ নির্বাচন প্রয়োজন
মোঃ নিরব হোসাইন, শিক্ষার্থী, ইইই বিভাগ, জাবিপ্রবি
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর ভেবেছিলাম লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি মুক্ত ক্যাম্পাস হবে৷ সেটার ক্ষীণ সম্ভাবনা দেখা গেলেও বর্তমান দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দেখে সেটা আর সম্ভব নয় বললেই চলে। তবে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর ছাত্ররাজনীতি বরাবরই শিক্ষার্থীবান্ধব ছিল না। জোর পূর্বক দলীয় মিটিং-মিছিল, গেস্টরুম, গণরুম ইত্যাদি ইত্যাদি। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দলীয়করণের কারনে বিভাজিত হয়ে যায়। যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতির পরিবর্তে তারা নিজেদের মধ্যেই রেষারেষিতে লিপ্ত থাকে। তবে নিরপেক্ষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিনিধি বাছাই করে নিতে পারবে যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব।
রিসার্চ ও ল্যাবের সুযোগ সুবিধা বাড়াতে হবে
ফাইজুর রহমান ফাহিম, শিক্ষার্থী, সিএসই বিভাগ, জাবিপ্রবি
জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়৷ যা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যই ছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অগ্রগতি। এই অগ্রগতির পথে প্রধান বাধা হচ্ছে রিসার্চ এ পর্যাপ্ত বাজেট ও ল্যাবে সুযোগ সুবিধা না থাকা। বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে এবং দেশের অগ্রগতির লক্ষে, রিসার্চ করার জন্য বিভিন্ন ধরনের তথ্য প্রয়োজন হয় যা অধিকাংশ সময়ই অর্থ ব্যয় করে কিনতে হয়। এই অর্থাভাবের কারণে আমরা অনেক সময় ভালো ডাটা পাই না৷ পাশাপাশি তথ্য জোগাড় করার পর রিসার্চ এর বাস্তবিক রূপ দান করতে প্রয়োজন হয় একটি উন্নত মানের ল্যাব। আমরা যদি এই বিশ্ববিদ্যালয় তথা সমগ্র বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে চাই তাহলে রিসার্চ এর জন্য আরও অর্থ বরাদ্দ এবং ল্যাবে পর্যপ্ত সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করার কোন বিকল্প নেই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করা৷ সেই সাথে গবেষণার প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবস্থা করা৷
শুধু ক্লাসরুম নয়, চাই একটি জীবন্ত ক্যাম্পাস
তাসনিম ইউসরা, শিক্ষার্থী, ফিশারিজ বিভাগ, জাবিপ্রবি
বিশ্ববিদ্যালয় মানে শুধু ক্লাস পরীক্ষা আর একাডেমিক জ্ঞান নয়। বিশ্ববিদ্যালয় নিজেকে প্রকাশ ও বিকাশের অন্যতম স্থান। কিন্তু জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শুধু একটা লুপের মধ্যে আছে, বাস> ক্লাস> পরীক্ষা >বাস। এ যেন Rat Race. কারণ একটাই চাইলে আমরা সময় কাটাতে পারিনা ক্যাম্পাসে। সেই পরিবেশ, বসার জায়গা কোনো কিছুই নাই। বাস মিস হলেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে রোদে অথবা ক্যান্টিনে যেখানে পর্যাপ্ত খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পর্যন্ত পাওয়া যায় না। অথচ ৮০% শিক্ষার্থী থাকে শহরে এবং টিএসসি বলতে একটি গাছ ও গাছের পাশের দেয়াল। টিএসসি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। যেখানে জ্ঞান চর্চা হবে, সংস্কৃতি চর্চা হবে, আড্ডা হবে, প্রেম হবে, হবে কোনো এক বিপ্লব এর সুচনা, হবে তর্ক-বিতর্ক। আমি আমার কম্পাসে অতি দ্রুত একটি সুষ্ঠু বসার মত পরিবেশ ও টিএসসি আশা করি।
সম্ভাবনার দিগন্তে সংকটের ঘনঘটা
কাজী মোঃ ইসমাঈল হোসেন, শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, জাবিপ্রবি
প্রবাদে আছে, "গোড়া কেটে আগায় জল ঢালা।" আজ জাবিপ্রবির বাস্তবতা যেন সেই প্রবাদেরই প্রতিচ্ছবি।উদ্বেগজনক হলো ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের অবাধ বিচরণ।স্থানীয়দের দৌরাত্ম্যে যদি শিক্ষাঙ্গনের স্বাতন্ত্র্যতা ক্ষুণ্ন হয়, তবে জ্ঞানের পরিবেশ দ্রুত দূষিত হয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক। শিক্ষাঙ্গন কখনো ক্ষমতার প্রদর্শনী কিংবা ব্যক্তিস্বার্থের করিডর হতে পারে না। যেখানে মুক্তচিন্তার প্রতিধ্বনি শোনা যাওয়ার কথা, সেখানে যদি অনাকাঙ্ক্ষিত বহিরাগতদের উপস্থিতি,মাদক আড্ডা হয় তাহলে শিক্ষার পরিবেশ হয় জল্লাদখানার চেয়েও হুমকিস্বরূপ। এজন্য অনতিবিলম্বে পুলিশ বক্স স্থাপন ও ক্যাম্পাসের বাউন্ডারি দেওয়াই স্থায়ী সমাধান। এছাড়াও জাবিপ্রবিতে একাডেমিক আলোচনার পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে অপ্রাসঙ্গিক ইস্যুই প্রাধান্য পাচ্ছে। ঠিক যেন"ধান ভানতে শিবের গীত।" তাছাড়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ট্যাগিং, তকমাবাজি শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশে স্থমিত করছে। বিশেষ করে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতির কারনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকেই প্রধান্য দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাকস্বাধীনতা খর্ব করছে। তাই লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে ছাত্র সংসদ চালু করা সময়ের দাবি। বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক সংকট হলো শিক্ষক-সংকট। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৮ বছর অতিবাহিত হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল মসজিদ নেই। ছাত্র হলে পাঞ্জেগানা মসজিদ থাকলেও ইমাম নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি তার শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ। কিন্তু বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো যে বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন, অর্থনৈতিক প্রত্যাশা এবং সামাজিক অগ্রগতির আকাঙ্ক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্রতা ক্ষুন্ন করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত
আইনুন নাহার, শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ
বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের সুরক্ষা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন কঠোর নীতিমালা, আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা এবং মেয়েদের নিজেদের সচেতনতা দিকে বিশেষ খেয়াল রাখা উচিত। যেহেতু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে , তাই তাদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার। বিশেষ করে শহর থেকে আমরা মেয়েরা যারা বাসে যাতায়াত করি আমাদের জন্য বাসে সুবিন্যস্ত আসনের ব্যবস্থা অত্যাবশকীয়। আসন সংকটের দিকেও জোরালো ব্যবস্থা করা উচিত। এছাড়াও নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা দরকার। কেননা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যথেষ্ট সিকিউরিটির ব্যবস্থা না থাকার জন্য নারীদের বিভিন্ন সময় বহিরাগত বখাটে ছেলেদের দ্বারা উক্তত্যের শিকার হতে হয়। তাই প্রশাসনের উচিত এই দিকটাতে নজরদারি করা। এছাড়াও বিশেষভাবে নারীদের জন্য বিদেশি কিছু সংগঠনের বিভিন্ন এক্টিভিটিতে কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া প্রয়োজন৷ যাতে তারা নারীর ক্ষমতায়নের সাথে সুপরিচিত হয়ে নিজেদের জীবনের সফলতা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
হল সংকট ও পরীক্ষার ফলাফল যথাসময়ে দেওয়া প্রয়োজন
মো: আকাশ ইসলাম, শিক্ষার্থী, গনিত বিভাগ, জাবিপ্রবি
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর আবাসন সুবিধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ হলের অপর্যাপ্ততার কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থী জামালপুর শহরে বিভিন্ন মেছে থাকে। যেখানে পর্যাপ্ত পড়াশুনা করার পরিবেশ নাই। এছাড়াও ইতোপূর্বে দুইবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর বহিরাগতদের সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছিল৷ তাই আবাসন ও নিরাপত্তা এখন মূল বিষয়৷ এই যেমন, জামালপুর রিক্রিয়েশন ক্লাবেটিকে আবাসিক হলে রূপান্তর করা যেতে পারে৷ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো পরীক্ষার রেজাল্ট প্রদানে কালবিলম্ব৷ কাল দীর্ঘায়নের এই চর্চা শিক্ষার্থীদের দ্বিধা দ্বন্দ্বের মধ্যে রাখে৷ সময়মতো রেজাল্ট পেলে শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা হবে৷
ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের উদ্বেগ
মাধূর্য সরকার বর্ষ, শিক্ষার্থী, ভূতত্ত্ব বিভাগ, জাবিপ্রবি
বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের কাছে শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি আস্থার জায়গা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, ইদানীং আমাদের প্রিয় ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের উপদ্রব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণে তাদের অবাধ বিচরণ এবং অসংলগ্ন ও আপত্তিকর কর্মকাণ্ডে আমরা শিক্ষার্থীরা চরম অস্বস্তি ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। সবচেয়ে হতাশাজনক ব্যাপার হলো, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের অবহেলা। তাদের দেখে বোঝার উপায় নেই যে তারা দায়িত্ব পালন করছেন কি না। ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং নিরাপত্তাকর্মীদের জন্য ইউনিফর্ম ও আইডি কার্ড বাধ্যতামূলক করতে হবে। সর্বোপরি একটি নিরাপদ ক্যাম্পাস আমাদের অধিকার, আর এই অধিকার আদায়ে আমরা প্রশাসনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।